আজ থেকেই পাঠ শুরু করে দিয়েছে যুগল। বিনু বলল, থাকবে।
লন, এইবার বাড়ি যাই।
বাড়ির দিকে সবে পা বাড়িয়েছে, হঠাৎ বিনু দেখতে পেল, ডান ধারে ঠিক খালের ওপারে অদ্ভুত ধরনের বড় বড় সাতখানা নৌকো দাঁড়িয়ে আছে। রাজদিয়ায় আসার পর অনেক রকম নৌকো দেখেছে বিনু-গাছি, শালতি, কোষ, মহাজনী ভর। কিন্তু এইরকম নৌকো প্রথম দেখল।
অপার বিস্ময়ে বিনু শুধলো, ওগুলো কিসের নৌকো যুগল?
একপলক দেখে নিয়ে যুগল বলল, উইগুলা বেবাইজা (বেবাজিয়া) বহর। অনেক কাল পরে বেবাইজারা রাইজদায় আইল। লন যাই, ওগো ডাইকা বাড়িত লইয়া যাই–বলেই ছুটল।
যুগলের পেছনে ছুটতে ছুটতে বিনু বলল, বেবাইজা কী?
গ্যালেই বুঝতে পারবেন।
খানিকটা ছুটবার পর ডান ধারে খালের ওপর দিয়ে বাঁশের সাঁকো। সেটা পেরুলেই ওপারে সারি সারি বেবাজিয়া নৌকোর বহর।
সাঁকোর কাছাকাছি এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে যুগল ডাকতে লাগল, বেবাইজা হে-এ-এ-এ—
ওপার থেকে কেউ সাড়া দিল, কিবা কও-ও-ও–
কার বহর?
আঞ্জুমান বেবাইজানীর।
মুখ ফিরিয়ে এবার বিনুর দিকে তাকাল যুগল, চিনা মানুষ। আঞ্জুমান বেবাইজানীরা বচ্ছরে একবার আমাগো এইহানে আসে–
সেই কৌতূহলটা মনের ভেতর টগবগ করছিল। বিনু আবার শুধলো, বেবাইজা কী বললে না তো–
ঈষৎ বিরক্ত হল যুগল, আপনের আর তর সয় না ছুটোবাবু। কইলাম, অগো বহরে গ্যালেই ট্যার পাইবেন। তা না–
বিনু কিছু বলল না, ঘাড় গোঁজ করে রইল।
বিনুর চোখমুখ দেখে হয়তো করুণাই হয়ে থাকবে। যুগল বলল, বাইদ্যা কারে কয় জানেন তো?
এতক্ষণে মনে পড়ে গেল। বেবাইজা শব্দটা আজই প্রথম শুনছে না বিনু, আগেও একবার শুনেছে। সেদিন রাত্রিবেলা সুজনগঞ্জের হাট থেকে ফেরার সময় মাঝনদীতে তাদের একটা বহরও দেখেছিল। ঢেঁড়াওলা হরিন্দ তার দুই সাকরেদ কাগা গাকে নিয়ে সেই বহরে উঠে কোন এক ইসলামপুরের দিকে পাড়ি জমিয়েছিল।
শব্দটা ঠিক বেবাইজা নয়, বেবাজিয়া। অর্থাৎ বেদে। এই জলের বেদেদের যে বেবাজিয়া বলে, বিনু কেমন করে জানবে? সেদিন হাট থেকে ফেরার সময় হেমনাথ তা কিছুটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
কলকাতায় ইরানী যাযাবরদের দেখেছে বিনু, ভূগোল বইতে আরব বেদুইনদের কথাও পড়েছে। তারা সব স্থলচর জীব, হেঁটে হেঁটে অথবা উটের পিঠে দেশদেশান্তরে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এই খাল বিল-নদীর রাজ্যে তা তো আর সম্ভব নয়, নৌকোয় নৌকোয় জলচর মাছের মতো এখানকার বেবাজিয়ারা ভেসে বেড়ায়।
বিনু বলল, তোমাকে আর বুঝিয়ে দিতে হবে না। বেবজিয়াদের আমি আগেও দেখেছি।
যুগল বলল, ‘আগে দেইখা থাকলে বেবাইজা কী’ ‘বেবাইজা কী’ কইরা আমারে পাগল কইরা মারতে আছিলেন ক্যান?
আমার মনে পড়ছিল না যে।
একটু নীরবতা।
কাউঠ্যা নিয়া আর বেবাইজা বহরে যামু না। শালারে এইহানে বাইন্ধ্যা রাইখা যাই। হাতের কচ্ছপটাকে সাঁকোর সঙ্গে দ্রুত বাঁধতে লাগল যুগল।
বিনু কিছু বলল না।
বাঁধাছাদা হয়ে গেলে যুগল শুধলো, সাঁকো পার হইতে পারবেন নি ছুটোবাবু?
সরু একখানা বাঁশের ওপর দিয়ে ওপারে যেতে হবে। দু’ধারে যদিও হাত তিনেক উঁচুতে ধরনি (ধরবার জন্য অন্য একটি বাঁশ) রয়েছে, তবু বুক কাঁপতে লাগল বিনুর। আগে আর কখনও সাঁকো পার হয় নি সে।
অন্য সব ব্যাপারে যুগলের কাছে প্রচুর বীরত্ব দেখিয়েছে বিনু, কিন্তু সাঁকো পারাপারের কথায় তার মুখখানা ভারি করুণ দেখাল। মাথা নেড়ে আস্তে করে সে বলল, না।
আপনে কুনো কামের না ছুটোবাবু। আসেন, আমার হাত ধইরা পার হইবেন।
যুগলের হাত ধরে খাল পেরুতে পেরুতে তলার দিকে তাকাল বিনু। সাঁকোর অনেক নিচে অথৈ জল। একবার যদি হাত ফসকে যায়? যদিও সাঁতার শিখেছে, বুকের ভেতরটা টিপ টিপ করতে লাগল তার।
ওপারে গিয়ে যুগল চেঁচামেচি জুড়ে দিল, কই গো বেবাইজা বেবাইজানীরা, কই গেলা হগল? বাইর হও দেখি–
যুগলের ডাকাডাকিতে নৌকোগুলোর ভেতর থেকে অদ্ভুত ধরনের জনাকয়েক মেয়ে পুরুষ বেরিয়ে এল।
সেদিন রাত্রিবেলা সুজনগঞ্জ থেকে ফেরার সময় মাঝনদীতে অন্য একটা বেদে-বহর সামনে পড়েছিল। একজন বেবাজিয়ার গলার আওয়াজও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু অন্ধকারে তাদের স্পষ্ট দেখা যায় নি। আজ দিনের আলোয় জগতের বিচিত্র এক মানবগোষ্ঠীর দিকে অসীম বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকল সে।
মেয়েগুলোর পরনে ইরানী নৌকোর পালের মতো চিত্রবিচিত্র ঘাঘরা এবং খাটো খাটো জামা। রুক্ষ চুলে কাঠের কাকুই, টানা চোখে ছুরির ধার। হাতে পায়ে মেহেদি মাখা। সারা গায়ে অঢেল উদ্দাম যৌবন। পুরুষগুলির পরনে হয় ডোরাকাটা লুঙ্গি, নতুবা কুঁচি-দেওয়া ঢোলা পা-জামা। মাথায় ধনেশ পাখির পালক গোঁজা। সারা গায়ে তাদের উল্কির আঁকিবুকি। পাখি সাপ গরু ছাগলকত রকমের ছবি যে আঁকা!
মেয়ে হোক পুরুষ হোক, সবাই অত্যন্ত নোংরা, অপরিচ্ছন্ন। তাদের চিটচিটে পোশাক থেকে দুর্গন্ধ উঠে আসছে। মুখটুখ ধোবার অভ্যাস নেই, দাঁতের ওপর এক ইঞ্চির মতো পুরু হলুদ রঙের সর পড়ে আছে। হাত-পায়ের নখ বড় বড়। সেগুলোর মাথা খানিক ভেঙেছে, খানিক ক্ষয়ে গেছে।
যুগল বলল, তোমরা রাইজদা আইলা কবে?
একটি বেদেনী উত্তর দিল, আইজ, বিহান বেলায়—
থাকবা কয় দিন?
চকিদারে (চৌকিদারে) যা বাইন্ধা দিছে হেই আড়াই দিন। হের বেশি তো থাকনের উপায় নাই।
