সবটা বলা হল না। আধাআধি শুনেই বিনু প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, তুমি কচ্ছপের কথা বলছ?
হ হ, কচ্ছম–
তাই বল। আমি ভাবলাম, না জানি কী। কাউঠা কাউঠ্যা করলে লোকে কখনও চিনতে পারে?
এবার বিব্রত হবার পালা যুগলের। হাত কচলাতে কচলাতে সে বলল, কী করুম ছুটোবাবু, আমরা তো আর এংরাজি-মেংরাজি শিখি নাই। আমরা কাউঠ্যাই কই–
ইংরেজি শেখার সঙ্গে ‘কাউঠ্যা’ বলার সম্পর্ক কী, বিনু ভেবে পেল না। এ ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে বলল, কচ্ছপ আমি ঢের দেখেছি, তবে তার মাংস খাইনি।
মাংস যদি খাইতে হয়, লন আমার লগে। এক শালারে জলের তলে উদ্দিশ কইরা এক-নাইলা (যার একটিমাত্র ফলা) টেটা নিতে আইছি। গিয়াই গাথুম। যুগল বলতে লাগল, টেটা নিতে আইসা আপনের কথা মনে পড়ল ছুটোবাবু। ভাবলাম ডাইকা নিয়া যাই–
মাংসের লোভ খুব একটা নেই। জলের তলায় কোথায় কচ্ছপ দেখে এসেছে যুগল, কিভাবে সেটাকে গেঁথে ওপরে তুলবে, তাই ভেবে উত্তেজনা বোধ করতে লাগল বিনু। উৎসাহের সুরে বলল, চল–
এটু খাড়ন, টেটাটা নিয়া আসি।
ছুটে গিয়ে নিজের ঘর থেকে এক ফলাওলা একটা টেটা এবং এক টুকরো চ্যাপ্টা ভারী লোহার পাত নিয়ে এল যুগল। বলল, লন যাই–
বইপত্তর দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় ছড়িয়েই রইল। যুগলের পিছু পিছু ছুট লাগায় বিনু। এই মুহূর্তে, কোথায় কোন অদৃশ্যে বসে জলতলের এক প্রাণী তাকে অবিরাম হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে যেন।
উঠোন বাগান পেরিয়ে রাস্তায় আসতেই হঠাৎ বিনুর মনে সন্দেহ দেখা দিল। আস্তে করে সে ডাকল, যুগল–
যুগল তক্ষুনি সাড়া দিল, কী ক’ন ছুটোবাবু?
সংশয়ের গলায় বিনু বলল, তুমি তো সেই কখন কচ্ছপটাকে দেখে এসেছ। সে কি এতক্ষণ আমাদের জন্যে বসে আছে! গিয়ে হয়তো দেখব, পালিয়ে গেছে।
বিজ্ঞের মতো একটু হাসল যুগল, কাউঠ্যার চরিত্তির আপনে জানেন না ছুটোবাবু—
যুগল ঠিক কী বলতে চায়, বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকল বিনু।
যুগল আবার বলল, শালারা অ্যামন আইলসা (অলস) যে সহজে লড়তে চায় না। দিনের পর দিন এক জাগায় শুইয়া থাকতে ভালবাসে। আমি যে কাউঠ্যাটারে ইট্র আগে দেইখা আইছি, হেইটা ঠিকই উইখানেই থাকব। তয়–
তবে কী?
আর কারোর নজরে পড়লে অন্য কথা।
বিনু শুধলো, আর কেউ দেখলে কী হবে?
যুগল হাতের অস্ত্রটা দেখিয়ে বলল, এইরকম টেটা দিয়া গাইথা নিয়া যাইব গা।
একটু চুপ।
তারপর যুগলই আবার শুরু করল, জানেন ছুটোবাবু, নানান জাতের কাউঠ্যা আছে। জউলা কাউঠা, কালি কাউঠা, সুন্দি কাউঠ্যা–
এক নাগাড়ে কত নাম যে বলে গেল যুগল! শুনতে শুনতে অবাক হয়ে গিয়েছিল বিনু। বলল, এত রকম কচ্ছপ!
হ।
আমাকে চিনিয়ে দেবে?
নিয্যস দিমু।
যুগল আরও যা বলল তা এইরকম। পূর্ব বাংলার জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে যত পশুপাখি ঘুরে বেড়ায়, উড়ে বেড়ায়, তাদের সবাইকে চেনে সে। কেমন তাদের স্বভাব, কোথায় তাদের বসতি, কিভাবে তাদের ধরতে হয়, এ সব সম্বন্ধে তার বিপুল জ্ঞান, বিশাল অভিজ্ঞতা। নিজের অভিজ্ঞতার সমস্তটুকুই অকাতরে সে ছোটবাবুর হাতে তুলে দেবে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিনুরা স্টিমারঘাটের দিকে হাঁটছিল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সেই কাঠের পুলটার ওপর এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল যুগল। দেখাদেখি বিনুও দাঁড়াল।
যুগল বলল, আমরা আইসা গ্যাছি ছুটোবাবু।
বিনু বলল, এখানেই তোমার কচ্ছপ আছে?
হ। দেখবেন আসেন–
পুলের তলা দিয়ে খাল গেছে। বিনুকে নিয়ে পুলের ডান দিকে একেবারে জলের ধারে এসে দাঁড়াল যুগল।
হেমন্তের মাঝামাঝি এই সময়টায় জল শান্ত, স্থির। কোথাও সামান্য ঢেউ পর্যন্ত নেই।
খালের দিকে আঙুল বাড়িয়ে যুগল বলল, উই দ্যাখেন ছুটোবাবু, শালার কাউঠ্যা উইখানে আরাম কইরা শুইয়া আছে।
বিনু তাকাল। পলকহীন, তীক্ষ্ণ চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও অঘ্রাণের নিস্তরঙ্গ খালে অতল কালো জল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না।
পাশ থেকে সাগ্রহে যুগল শুধলো, দেখতে নি পাইছেন?
বিনু মাথা নাড়ল, না।
ভালা কইরা ঠওর করেন।
চোখদুটো আরও শাণিত করল বিনু। কিন্তু কোথাও কচ্ছপের চিহ্ন নেই। সে বলল, কোথায় তোমার কচ্ছপ?
ধিক্কারের গলায় যুগল বলল, কী চৌখ আপনের ছুটোবাবু! সামনে রইছে, অথচ দেখতে পান। উই যে দ্যাখেন–
এবার বিনু দেখতে পেল, অনেকক্ষণ পর পর জলের অতল থেকে একটা দুটো করে বুদ্বুদ উঠে আসছে।
বিনু বলল, ওগুলো তো বুজকুড়ি–
হ। উইগুলির তলেই শালার কাউঠা শুইয়া রইছে আর গলা বাইর কইরা পুটুর পুটুর ভুরভুরি ছাড়তে আছে। খাড় বউয়ার ভাই, এইবার তোমার নীলা সাঙ্গ করি–
যুগলের হাতে যে অস্ত্রটা ছিল, তার চেহারা মোটামুটি এইরকম। সরু মতো লম্বা একটা বাঁশের মাথায় ইস্পাতের ধারাল ফলা আটকানো। ফলার কাছাকাছি জায়গায় বাঁশটাকে ঘিরে সেই ভারী লোহার পাতটা পরিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল যুগল। ফলে ওটার ওজন বেড়ে গেল অনেকখানি। তারপর পুলের কিনারে এসে বুদ্বুদগুলি নিশানা করে খুব আস্তে টেটাটা ছুঁড়ে দিল।
আস্তে ছুড়লে কী হবে, লোহার পাতের ভারে অস্ত্রটা তীরের মতো জলের অতলে নেমে গেল।
একটু পর টেটার বাঁশ ধরে যুগল যখন টেনে তুলল, দেখা গেল, ফলার মাথায় সত্যি সত্যিই একটা কচ্ছপ। ফলাটা তার নরম মাংসল গলা ভেদ করে ওধারে চলে গেছে।
যুগল বলল, অঘ্ঘান পৌষ মাসে জল যহন থির হইয়া যায়, হেই সময় কাউঠারা কী করে জানেন ছুটোবাবু? জলের তলে গলা বাইর কইরা উয়াস ছাড়ে, হেই দেইখা ঠাওর করতে হয়। মনে থাকব তো? বলতে বলতে ক্ষিপ্র হাতে টেটার ফলা খুলে দড়ি দিয়ে কচ্ছপটার চার পা বেঁধে হাতে ঝুলিয়ে নিল।
