রঙ্গিণী নায়িকার মতো লীলাভরে হাত নেড়ে সুনীতি বলল, পনের কুড়ি দিন উধাও হয়ে থেকে আজ এসে বলছেন, আনন্দ হয়েছে। ওভাবে আনন্দ প্রকাশ করে না মশাই–
ইতিমধ্যে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে নিয়েছে হিরণ। মুখ তুলে একবার সুনীতিকে দেখে নিয়ে বলল, কিভাবে তা হলে করে?
সুধার কাছে জেনে নিন। বলেই বিনুর দিকে ফিরল সুনীতি, চল রে বিনু, আমরা বাগানে যাই–
হিরণের চোখেমুখে আগের উজ্জ্বলতা ফিরে এসেছে। রঙ্গিণী এবং নির্দয়া, দুই রূপেই যে সুনীতি মজা করেছে, এতক্ষণে বুঝে ফেলেছে হিরণ। মাথাটা সামনের দিকে অনেকখানি ঝুঁকিয়ে সে বলল, আপনি সত্যিই মহানুভব।
বলছেন?
একশ’বার।
বিনুকে নিয়ে দু’পা গিয়েই হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে পেছন ফিরল সুনীতি। বলল, দুনিয়ার সব স্কুলকলেজ খুলে গেছে। আপনার ইউনিভার্সিটি এ বছর খোলার আশা আছে?
নিশ্চয়ই আছে। হেসে হেসে হিরণ বলল, আজ থেকে তিনদিন পর খুলবে।
ইউনিভার্সিটি খুললেই তো ঢাকায় গিয়ে থাকবেন?
তা তো থাকতেই হবে।
কিন্তু–
কী?
একটু ভেবে সুনীতি বলল, একটানা ঢাকায় গিয়ে থাকলে চলবে না। মাঝে মাঝে এখানে এসে আনন্দ প্রকাশ করে যাবেন, বুঝলেন?
মাথাটা অনেকখানি হেলিয়ে হিরণ বলল, আপনার আদেশ মাথা পেতে নিলাম।
সুনীতি আর কিছু বলল না। বিনুকে সঙ্গে নিয়ে ইঙ্গিতময় একটু হেসে বাগানের দিকে চলে গেল।
.
কিছুক্ষণ পর ছুটতে ছুটতে সুধা বাগানে এল। হেমন্তের বাতাসে তার পিঠময় খোলা চুল উড়ছে, চোখের তারায় আগুনের হলকা খেলে যাচ্ছে। বুকটা ঢেউয়ের দোলায় একবার উঠছে, একবার নামছে। সুধা যেন এখন রণরঙ্গিণী।
বিনু সুনীতি এখানেই ছিল। বাগানের উত্তর দিকে খালের ধার ঘেঁষে একটা রোয়াইল ফলের গাছ। হলুদ রঙের গোল গোল ফলগুলি যেমন টক তেমনি সুস্বাদু। সুনীতি কেঁচড় ভরে পেড়ে নিয়েছিল, বিনু নিয়েছিল পকেট বোঝাই করে। তারপর বাগানময় ঘুরে ঘুরে টপাটপ মুখে ফেলেছিল।
সুধা এসে সোজা সুনীতির একটা হাত চেপে ধরল। এত জোরে ধরেছে যে বাহুর কোমল মাংসে নখ বসে গেছে।
সুনীতি বলল, উঃ, লাগে। ছাড় সুধা–যন্ত্রণায় তার চোখমুখ কুঁচকে গেছে।
সুধা ছাড়ল না। ধারাল গলায় বলল এটা কী হল?
কোনটা?
আমাকে আর হিরণবাবুকে ওভাবে রেখে চলে এলি যে?
যন্ত্রণার মধ্যেও হেসে ফেলল সুনীতি। গলা নামিয়ে ফিসফিস করল, তোরা তাই চেয়েছিলি যে।
সুধা খুব রেগে গেল, কী চাই, তোর কানে কানে বুঝি বলেছিলাম?
বলতে হবে কেন?
তবে?
আমি কি কচি খুকি, কিছুই বুঝি না?
সুধা ভেংচি কাটার মতো করে বলল, কচি খুকি হবি কেন, তুই সব্বার ঠাকুমা। বুঝবি আবার না? একেবারে অন্তর্যামী হয়ে বসে আছিস।
সুনীতি হাসতে লাগল, আছিই তো।
সুধা এবার খেপে উঠল, আমাকে আর হিরণবাবুকে নিয়ে আবার যদি এরকম করিস খুব খারাপ হয়ে যাবে।
কৌতুকের গলায় সুনীতি বলল, সত্যি! শব্দটার ওপর কণ্ঠস্বরের সবটুকু জোর ঢেলে দিল সে।
সত্যি না তো মিথ্যে?
সুনীতি এবার এক কান্ডই করল। আঙুলের ডগায় পানপাতার সরু সুছাঁদ প্রান্তের মতো সুধার মনোহর চিবুকটি তুলে ধরে মাথা দুলিয়ে বলল, আমার বেলায় বুঝি মনে ছিল না?
সুধা বলল, তোর সঙ্গে আবার কী করলাম?
এর ভেতরেই ভুলে গেলি?
কিছু করলে তো মনে থাকবে।
সুর টেনে টেনে সুনীতি বলল, কিচ্ছু করো নি?
সুধা বলল, না।
আনন্দবাবু আর আমাকে নৌকোয় তুলে সেদিন ঠেলে দিয়েছিল কে? এবার মনে পড়েছে? সুধার চিবুকটা আরেকটু ওপরে তুলল সুনীতি।
সুধা এবার হেসে ফেলল, তাই বুঝি শোধ তুললি?
ঠিক তাই। এবার থেকে মনে রাখবি, এক মাঘে শীত যায় না।
রাখব, তুইও রাখিস।
দুই বোন হাত ধরাধরি করে হঠাৎ গলা মিলিয়ে হেসে উঠল।
.
২.০৪
হিরণ ভবতোষ কিংবা মজিদ মিঞাই শুধু নয়, বিনুরা যে এখন থেকে রাজদিয়াতে থাকবে, এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাবে, এ খবরটা জানতে রাজদিয়ার কারোর আর বাকি রইল না। এবং মুখে মুখে দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
সকাল নেই দুপুর নেই, আজকাল লোক আসছেই। নিকারীপাড়া মৃধাপাড়া কুমোরপাড়া কামারপাড়া যুগীপাড়া ঋষিপাড়াই বা কেন, দূর দূরান্তের গ্রামগঞ্জ থেকে জলস্রোতের মতো মানুষ আসছে। বিনুরা এখানে থাকবে, তাদের প্রতিবেশী হিসাবে পাওয়া যাবে–এতে সবাই আনন্দিত, গর্বিত। আনন্দ আর গর্বের কথাটা তারা আন্তরিক সুরে বলে যেতে লাগল।
বিনুদের জন্য সারা রাজদিয়া জুড়ে উৎসব শুরু হয়ে গেছে বুঝি। তাদের থাকার কথা শুনে লোক যে ছুটে আসতে পারে তা যেন ভাবাই যায় না।
বিস্মিত, অভিভূত সুরমা তো বলেই ফেলেছেন, যেখানকার মানুষ এত ভাল সে জায়গা স্বর্গ।
দেখতে দেখতে অঘ্রাণ মাস পড়ে গেল।
একদিন সকালবেলা দুই দিদি আর ঝিনুকের সঙ্গে দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় পড়তে বসেছিল বিন। কলকাতায় গিয়ে অ্যানুয়াল পরীক্ষা অবশ্য দিতে হবে না। সেদিক থেকে দুর্ভাবনা না থাকলেও জানুয়ারি মাসে অ্যাডমিসন টেস্ট দিয়ে এখানকার স্কুলে ভর্তি হতে হবে। তাই বই টইগুলোর সঙ্গে একটু আধটু যোগাযোগ রাখা দরকার।
পড়াশোনা যখন চলছে, হঠাৎ কোত্থেকে যুগল এসে হাজির। উঠোনের কোণ থেকে ইশরায় বিনুকে ডেকে নিয়ে খুব উৎসাহের সুরে বলল, ছুটোবাবু, কাউঠার মাংসা খাইছেন কুনোদিন?
বিনু বলল, কাউঠ্যা কী?
কাউঠ্যা চিনেন না?
না।
যুগল এবার এমনভাবে তাকাল যাতে মনে হয়, কাউঠ্যা’ না চেনার ফলে জীবন একেবারে ব্যর্থ হয়ে গেছে বিনুর। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর কাউঠ্যা’ নামক প্রাণীটির রূপগুণ বংশ-পরিচয়ের বিবরণ দিতে শুরু করল সে, কাউঠ্যা জলে থাকে, গোল দেখতে। পিঠের চারাখান লোহার লাখান শক্ত। কাউঠ্যার লাখান আরেকখান জলের পোক আছেকাছিম। কাছিমের দুই ধারে যে বাদি আছে তা খাইতে লাগে নাইরকলের লাখান। চাবাইলে কচ কচ করে।
