বিকেলবেলা পুবের ঘরে সুধা আর বিনু বসে ছিল। সুনীতি জানালার শিক ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে গাইছিল?
ভালবাসিবে বলে ভালবাসি নে
আমার এই রীতি,
তোমা বই জানি নে।
বিধু মুখে মধুর হাসি
দেখিলে সুখেতে ভাসি,
তাই তোমারে দেখিতে আসি,
দেখা দিতে আসি নে।
গাইতে গাইতে হঠাৎ থেমে গেল সুনীতি।
সুধা বলল, বেশ তো গাইছিলি, থামলি কেন?
ঠোঁট টিপে সুনীতি বলল, তোর বিধু মুখে মধুর হাসি দেখবার জন্যে কে আসছে দ্যাখ সুধা। উঠে দ্যাখ–
সুধা, তার সঙ্গে বিনু জানালার বাইরে তাকাতেই দেখতে পেল, বাগান পেরিয়ে এদিকেই আসছে হিরণ।
অনেক দিন পর হিরণ এ বাড়িতে এল। পুজোর আগে নাটক টাটকের ব্যাপারে নিয়মিত হানা দিত সে। পুজোর পার বার দুই মোটে তাকে দেখা গেছে। বিজয়ার পরের দিন একবার, আরেক বার কোজাগরীর রাত্তিরে। তারপর থেকে হিরণ নিরুদ্দেশ।
এই তো সেদিন তার সঙ্গে আলাপ। দেখামাত্র বিনুদের জয় করে নিয়েছিল হিরণ। বিশেষ করে সুরমা আর অবনীমোহনের তো খুবই ভাল লেগেছে তাকে।
নিয়ম করে যে দু’বেলা আসছিল, হঠাৎ পনের কুড়ি দিন তার খোঁজখবর নেই। সুরমা এবং অবনীমোহন চিন্তিত হয়েছেন, রোজই হিরণের কথা বলাবলি করেছেন। হেমনাথের অবশ্য দুর্ভাবনা। নেই। হিরণকে তিনি চেনেন। হাসতে হাসতে বলেছেন, ওটা এরকমই। এল তো দিনে দশ বারই এল। তারপর এমন উধাও হল যে বিশ পঁচিশ দিন আর পাত্তাই নেই। হিরণের স্বাভাব জেনেও তার খোঁজে যুগলকে কয়েক দিন পাঠিয়েছেন। যুগল এসে জানিয়েছে, হিরণ নেই। কোথায় গেছে, বাড়ির লোকেরা জানে না।
বাগান পেরিয়ে একটু পর হিরণ পুবের ঘরে চলে এল। খুশির সুরে বলল, তিন ভাইবোনই এখানে আছ দেখছি।
হ্যাঁ। সুনীতি ঘাড় কাত করল। কণ্ঠস্বরে দোলা দিয়ে বলল, আপনি তো বেশ লোক মশাই–
হিরণ হকচকিয়ে গেল, কেন?
সেই যে লক্ষ্মীপুজোর দিন এলেন, তারপর আর পাত্তাই নেই। বাড়িতে লোক পাঠিয়েও খোঁজ পাওয়া যায় না। কোথায় নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন?
মানিকগঞ্জে আমার এক বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। ওরা কিছুতেই ছাড়ল না। দিন পনের কুড়ি কাটিয়ে আসতে হল।
বাঃ বাঃ, চমৎকার!
ভয়ে ভয়ে হিরণ জিজ্ঞেস করল, কী?
সুনীতি বলল, পনের কুড়ি দিন উধাও হয়ে থাকলেন। বাড়িতে একটা খবরও তো পাঠাতে হয়।
রোজই ভেবেছি পাঠাব। পাঠাব পাঠাব করে পাঠানো আর হয়নি, শেষ পর্যন্ত চলে এলাম।
বাড়ির লোকেদের দুশ্চিন্তায় ফেলে কী লাভ?
বাড়ির লোকেরা দুশ্চিন্তা করে না। মাঝে মাঝেই আমি ডুব দিই, সবার এতে অভ্যেস হয়ে গেছে। হিরণ বলতে লাগল, সে যাক গে। আজই মানিকগঞ্জ থেকে ফিরেছি। স্টিমারঘাটে নেমে একটা সুখবর পেলাম। শুনে আমাদের বাড়িতে একবার দেখা দিয়েই আপনাদের এখানে ছুটতে ছুটতে আসছি।
সুনীতি শুধলো, কী এমন সুখবর যে ছুটে আসতে হল?
উৎসাহের গলায় হিরণ বলল, আপনারা নাকি কলকাতায় ফিরছেন না; রাজদিয়াতেই থেকে যাবেন?
আপনাকে কে বললে?
জীবন ঘোষ।
জীবন ঘোষ আবার কে?
হিরণ হাসল, সবাইকে কি আপনি চিনবেন? স্টিমারটের পাশে সারি সারি মিষ্টির দোকান দেখেছেন তো?
সুনীতি মাথা নেড়ে জানালো, দেখেছে।
হিরণ বলল, প্রথম দোকানটা জীবন ঘোষের।
সুনীতি অবাক। বিস্ময়ের সুরে বলল, মিষ্টির দোকানদারদের কাছেও এ খবর পৌঁছে গেছে।
ইয়েস ম্যাডাম। হিরণ জিজ্ঞেস করল, খবরটা ঠিক তো?
ঠিক।
হিরণের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উৎফুল্ল সুরে বলল, সত্যি গুড নিউজ। আমার কী আনন্দ যে হচ্ছে!
সুনীতির কপাল কুঁচকে গেল। ঘাড়খানা ঈষৎ হেলিয়ে চোখ আধাআধি বুজে নীরস গলায় শুধলো, আমরা থাকব, তাতে আপনার আনন্দ কেন হবে মশাই? বলেই আড়ে আড়ে সুধার দিকে তাকাল।
সুধার অবস্থা অবর্ণনীয়। মুখ নিচু করে সমানে নখ খুঁটে যাচ্ছে সে, খুঁটেই যাচ্ছে।
এদিকে হিরণ থতমত খেয়ে গেছে। ফস করে জোরালো ঝলমলে আলো নিবে গেলে যেমন হয়, তার মুখের চেহারা অবিকল সেইরকম। কাঁপা শিথিল গলায় বলল, বা রে, আপনারা থাকলে আমার আনন্দ হবে না?
এমনিতে সুনীতি বেশ গম্ভীর, মৃদুভাষিণী। চপলতা তরলতা তার ধারে কাছে নেই। কিন্তু হিরণকে এতদিন পর পেয়ে আজ যেন কী হয়ে গেছে। আপন স্বভাবের কথা মনেই নেই সুনীতির। প্রগলভতার ঈশ্বর বুঝিবা তার ওপর ভর করে বসেছে। কপালে আরও ক’টা ভঁজ ফেলে, চোখ আরও ছোট করে সে বলল, আনন্দের একটা কারণ তো থাকবে। সেটা কী?
সুধা আর বিনুকে দ্রুত এক পলক দেখে নিয়ে বিব্রত, বিপন্ন মুখে হিরণ বলল, মানে–মানে–আপনারা হেমদাদুর আত্মীয়। তাই–
হেমদাদুর আত্মীয় তো আপনার কী? আনন্দ হলে হেমদাদুরই হওয়া উচিত। সুনীতি আজ বড়ই নির্দয়।
হিরণ কী বলবে, ভেবে পেল না। কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল, গলায় স্বর ফুটল না।
একটু নীরবতা।
তারপর অতি দ্রুত সুনীতির মুখচোখের চেহারা বদলে যেতে লাগল। গলাখানা আগের মতো ঈষৎ বাঁকিয়েই রাখল সে। চোখের তারা দুটো উজ্জ্বল কালো মণির মতো কৌতুকে ঝিকমিক করতে লাগল। ঠোঁটের প্রান্তে আধোগোপন একটুখানি হাসি। তার সারা গায়ে অদৃশ্য ঢেউয়ের মতো কী যেন খেলে বেড়াতে লাগল।
খুব চাপা গলায় সুনীতি হঠাৎ ফিসফিস করল, বুঝলেন মশাই—
চকিত হিরণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভীরু গলায় সাড়া দিল, কী?
খুব আনন্দ হয়েছে, না?
হিরণ চুপ। কী উত্তর দেওয়া ঠিক হবে তা যেন স্থির করে উঠতে পারছে না। ক্ষণে নিঠুরা ক্ষণে মধুরা–সুনীতির এইরকম দ্রুত স্বভাব-বদল আগে আর কখনও দেখেনি সে।
