খাওয়াদাওয়ার পর পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না মজিদ মিঞা। খেতে বসে সে বলল, ঠাউর ভাই, আমি কিন্তুক সোয়াস্তি পাইতে আছি না।
হেমনাথ তাকালেন, কেন?
ক্যান আবার। যে কথা কওনের লেইগা ডাইকা আনলেন অহনও তা কইতে আছেন না—
হেমনাথ হেসে ফেললেন, তুই বড় অস্থির মজিদ
মজিদ মিঞা তক্ষুনি ঘাড় কাত করল, লাখ কথার এক কথা। সত্যই আমি বড় অস্থির। ধৈয্য বড় কম।
সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললেন না হেমনাথ। মনে মনে খানিক চিন্তা করে একসময় শুরু করলেন, অবনীর খুব ইচ্ছে এখানে কিছু জমিজমা কেনে। চাষ-আবাদ করতে চায়–
মজিদ মিঞা লাফিয়ে উঠল, এ তো বড় আনন্দের কথা–
আগে সবটা শোন। তারপর লাফাস।
আইচ্ছা কন–
হেমনাথ বলতে লাগলেন, আমি তো জমিজমার খবর রাখি না। তুই এ ব্যাপারে দেখেশুনে কিছু ভাল জমি অবনীমোহনকে কিনে দে। দেখিস, পরে যেন আবার মামলা মোকদ্দমা না বাধে।
মজিদ মিঞা বলল, জমিন কিনতে হইব না। হেমনাথ অবাক, না কিনলে পাবে কোত্থেকে?
আমার দ্যাড় শ’ কানি জমিন আছে। তার থিকা তিরিশ কানি মিতারে দিয়া দিমু। শখ মিটাইয়া তেনি চাষবাস করুক।
অবনীমোহন অভিভূত। কেউ যে এমন অক্লেশে মাত্র দুদিনের আলাপে অতখানি জমি দিয়ে দেবার কথা বলতে পারে তা যেন অভাবনীয়। তবু বিব্রত বোধ করতে লাগলেন অবনীমোহন। বললেন, না না, আপনার জমি দেবেন কেন?
মজিদ মিঞা বলল, দিলামই না হয়। আপনে আমার আপনজন না?
নিশ্চয়ই আপনজন। তবে–
অবনীমোহন কথা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই মজিদ মিঞা বলে উঠল, নিজের ভাই-বন্দুরে কেও যদিন কিছু দ্যায় তা নিতে দোষের কিছু আছে?
অবনীমোহন বললেন, দোষের কিছু না—
তয়?
নেবারও তো সীমা থাকা উচিত।
মজিদ মিঞা কোনও কথাই শুনতে চায় না। বিনে পয়সায় তার জমি নিতেই হবে। না নিলে চারধারে তাবত মানুষকে বলে দেবে কেউ যেন অবনীমোহনের কাছে জমি না বেচে।
মজিদ মিঞা কিছুতেই দাম নেবে না। ওদিকে অবনীমোহনও দাম ছাড়া জমি নেবেন না।
শেষ পর্যন্ত হাসতে হাসতে হেমনাথই মধ্যস্থতা করলেন। বললেন, দ্যাখ মজিদ, তোর কথাটা বুঝতে পারছি। অবনীমোহনকে তুই নিজের জন ভাবিস। সেদিক থেকে কিছু দিলে হাত পেতে নেওয়াই উচিত। কিন্তু অবনীমোহনের দিকটাও ভেবে দ্যাখ–
কুন দিক?
দাম দিয়ে না কিনলে কোনও জিনিসই নিজের মনে হয় না। মনে হয় দান নিচ্ছি। অবনী যদি দাম দিতে না পারত সেটা ছিল আলাদা কথা। তাই বলছিলাম কি–
কী?
বাজারে যা দাম, তুই তার চাইতে কিছু কম নে। ওটুকু সুবিধা করে দিলেই অবনী খুশি। বন্ধু ছাড়া, নিজের লোক ছাড়া কে-ই বা তা দেয়।
একটু চুপ করে থেকে মজিদ মিঞা বলল, আপনে যা কইলেন তাই হইব। কুনোদিন আপনের অবাইধ্য তো হই নাই। তয় একখান কথা–
বল।
আমি যে দাম কমু তার বেশি সিকি পয়সা দিলেও কিন্তুক নিতে পারুম না।
বেশ, তাই হবে। হেমনাথ হাসলেন।
মজিদ মিঞা বলল, তরাতরি খাইয়া দাইয়া লন, আইজই মিতারে জমিন দেখাইয়া দিমু।
খাওয়াদাওয়ার পর বিশ্রামের সুযোগ পাওয়া গেল না। একরকম তাড়া দিয়েই অবনীমোহন আর হেমনাথকে নৌকোয় নিয়ে তুলল মজিদ মিঞা। বিনু সঙ্গ ছাড়ল না, সেও ওঁদের সঙ্গে নৌকোয় উঠল।
যুগলের এখনও চান-খাওয়া হয়নি। ঠিক হল, মজিদ মিঞা নিজেই নৌকো বেয়ে যাবে।
বিনু অবাক হয়ে গিয়েছিল, জমি দেখানোর ব্যাপারে সবার চাইতে বেশি উৎসাহ মজিদ মিঞার। অবনীমোহনরা রাজদিয়াবাসী হলে জগতে তার মতো সুখী বুঝিবা আর কেউ হবে না।
হেমন্তের প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে জমি দেখা শুরু হল। মাটি অবশ্য দেখা গেল না। কেননা, কার্তিকের শেষাশেষি এই সময়টায় মাঠে জল আছে। আর সেই জলের ওপর মাথা তুলে আছে থোকা থোকা–একটানা দিগন্ত পর্যন্ত–ধানের মঞ্জরী। যেদিকে যতদূর চোখ ফেরানো যাক, মাঠের ঝাঁপি পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
কদিন আগেও ধানের রং সবুজ দেখেছে বিনু। নরম তুষের ভেতর তখন সবে দুধ জমেছে। আর এখন? ধানের খেতকে আর চেনাই যায় না। কোনও যাদুকর শ্যামল মাঠকে সোনালি লাবণ্যে কখন ভরে দিল, কে জানে।
জমি দেখাতে দেখাতে বিকেল হেলে গেল। ধানের মঞ্জরীর ভেতর দিয়ে পথ করে নৌকো চলেছে তো চলেছেই।
একসময় মজিদ মিঞা অবনীমোহনের উদ্দেশে বলল, এতগুলান জমিন দেখাইলাম, কুনটা পছন্দ হইল কন–
অবনীমোহন বললেন, আমার তো সব জমিই ভাল লাগল। চমৎকার ধান হয়ে আছে।
জোরে জোরে মাথা নেড়ে মজিদ মিঞা বলল, উঁহু–
কী?
এই চকের সব জমিনই ভালা না মিতা। এইর ভিতর সরস নীরস আছে।
তাই নাকি?
হ–মজিদ মিঞা ঘাড় কাত করল।
অবনীমোহন বললেন, আমি তো বুঝতে পারছি না। সব জায়গাতেই সুন্দর ধান ফলেছে।
মিতা, আপনে ভালা কইরা ধানটা খেয়াল করেন নাই। করলে বুঝতেন, যেই জমিনে ঘন হইয়া মোটা গোছে ধানগাছ ফনফনাই উঠছে হেই জমিনই ভাল জমিন। আর যেই জমিনে ধানগাছ পাতলা পাতলা, হেই জমিন তত ভালা না।
সত্যি, আমি অতটা খেয়াল করিনি।
মজিদ মিঞা বলল, জমিন চিনা (চেনা) সহজ না।
অবনীমোহন বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বলি কি, আর ঘোরাঘুরিতে দরকার নেই। আপনি যে জমি পছন্দ করে দেবেন, আমি তাই নেব।
কথাটা যুক্তিসঙ্গত মনে হল। মজিদ মিঞা বলল, হেই ভাল।
জমি দেখার পর ফেরার পালা। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে নেমে গেল।
.
২.০৩
দিন দুই পর অবনীমোহন কলকাতা রওনা হলেন। ওখানকার সব ব্যবস্থা করে ফিরতে ফিরতে এক সপ্তাহ। রাজদিয়ায় ফিরেই জমি রেজিস্ট্রি করার ইচ্ছা। হেমনাথ এবং মজিদ মিঞাকে এ ব্যাপারে সব বন্দোবস্ত করে রাখতে বলেছেন তিনি। দুপুরের স্টিমারে অবনীমোহন চলে গেলেন।
