আর কী? জিজ্ঞাসু চোখে বিনু তাকাল।
যুগল বলল, ফাগুন মাস পড়লেই বিয়া। এর ভিতরে কিনা-কাটা সাইরা না রাখলে চলে?
বিনুকে মাথা নাড়তেই হল, তা তো ঠিকই—
একটু ভেবে যুগল আবার বলল, দুই-একদিনের ভিতরেই গোপাল দাস আমাগো এইহানে আসব।
কেন?
বড়কত্তার কাছ থিকা পণের টাকা আদায় করতে।
বিনুর মনে পড়ে গেল, পাখির জন্য সেদিন আট কুড়ি টাকা পণ চেয়েছিল গোপাল দাস।
যুগল আবার বলল, ধান কাটার আগেই সগল ঝামেলা চুকাইয়া রাখতে চায় গোপাল দাস। হের পর ফাগুন পড়লেই পাখির আর আমার দুইজনের চাইর হাত এক কইরা দিব। ঝামেলা আগেই মিটাইয়া রাখন ভাল, না কী ক’ন ছুটোবাবু? সমর্থনের আশায় বিনুর চোখের দিকে তাকাল সে।
বিনু মাথা নাড়াল।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর যুগলই আবার শুরু করল, আমার বিয়ার সময় আপনেরে কিন্তুক বরযাত্রী যাইতে হইব ছুটোবাবু। না গ্যালে ছাড়ুম না।
বিনু তাড়াতাড়ি বলে উঠল, যাব, নিশ্চয়ই যাব।
আপনেরা এইহানে থাকবেন, আমার বিয়ায় যাইবেন–কী যে আনন্দ হইতে আছে ছুটোবাবু!
বিনু উত্তর দিল না।
যুগল বলতে লাগল, পাখি আর আমার ব্যাপারটা আপনে তো হগলই জানেন দুটোবাবু। হেই জল সাতরাইয়া পাখি আমার নায়ে আইল, তারে গান শুনাইলাম, তার লেইগা ছোঁক ছোঁক করতে করতে টুনি বইনের বাড়ি যাইতাম–কী না জানেন আপনে! আপনেরে যদি বিয়ার সোময় না পাইতাম, কী দুঃখু যে হইত!
বিনু এবারও চুপ করে থাকল।
ধীরে ধীরে কার্তিকের রাত গাঢ় হতে লাগল।
.
২.০২
পরের দিন সকালেই নৌকো দিয়ে যুগলকে কেতুগঞ্জে পাঠিয়ে দিলেন হেমনাথ। মজিদ মিঞাকে নিয়ে সে যখন ফিরল, হেমন্তের সূর্য মাথার ওপর উঠে এসেছে।
কদিন আগেও দুপুরবেলাটা অসহ্য লাগত। চারদিকে এত গাছপালা, এত জল, স্নিগ্ধ সুশ্যাম মাঠ, এমন অঢেল হাওয়া, তবু সূর্য মাথার ওপর এলে তাতে গা পুড়ে যেত।
কার্তিক মাস পড়তেই সূর্যটা কেমন যেন জুড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। রোদের স্বভাব যাচ্ছে দ্রুত বদলে। দুপুরবেলাগুলোও এখন বেশ আরামদায়ক। হাওয়াতে টান ধরেছে। শীত যে আসছে, এ তারই ভূমিকা।
মজিদ মিঞাকে আনবার জন্যই যুগলকে পাঠানো হয়েছিল। যেতে-আসতে যুগলের দুপুর হয়ে যাবে। মোটামুটি সময়ের এই হিসেব ধরে হেমনাথ আর অবনীমোহন বাইরের ঘরে অপেক্ষা করছিলেন। বিনুও সেখানে ছিল।
আন্দাজটা মোটামুটি সঠিক। জানলা দিয়ে বিনুরা দেখতে পেল, যুগলের নৌকো পুকুরঘাটে এসে ভিড়েছে। ভিড়বার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে পাড়ে নামল মজিদ মিঞা। তারপর উল্লসিত, উত্তেজিত গলায় চেঁচাতে চেঁচাতে বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করল, আমার মিতায় কই? ঠাউর ভাই কই?
মজিদকে দেখে সবাই বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল। হেমনাথ গলা তুলে বললেন, এই যে আমরা।
কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে মজিদ মিঞা বলল, কথাখান কি সত্য ঠাউর ভাই? বলে হেমনাথের দিকে তাকাল।
হেমনাথ শুধোলেন, কোন কথা?
আমার মিতায় নিকি রাইজদায় থাইকা যাইব?
হ্যাঁ।
অত বড় মানুষটা, প্রায় অবনীমোহনের সমবয়সী–আনন্দে উত্তজনায় কী করবে, কী না করবে যেন ভেবে পেল না। ছুটে এসে বিনুকে কোলেই তুলে নিল, তারপর আবেগের গলায় বলল, যুগইলা গিয়া যহন এই কথা কইল, আমি তো বিশ্বাসই করি নাই।
হেমনাথ বললেন, ঘরে আয়–
সবাই ঘরে গেল। মজিদ মিঞা বিনুকে ছাড়ে না, তাকে কোলে নিয়েই তক্তাপোশ বসল। বিনু বারকতক উসসুখ করল, কিন্তু মুক্তি পাওয়া গেল না।
মজিদ মিঞা বলল, বিহানবেলা বাইর হইতে আছি, যুগইলা গিয়া হাজির। তারে দেইখা আমি আটাস (অবাক), মনে মনে এটু ডরও ধরছিল। দরকার পড়লে ঠাউর ভাই নিজেই আমার বাড়িত যায়, তয় যুগইলা আইল কেন? কী সম্বাদ হেয় (সে) লইয়া আইছে, কে জানে।
হেমনাথ শুধোলেন, তারপর?
মজিদ মিঞা আর বলতে পারল না। পুকুরঘাট থেকে যুগল এসে কখন যে চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়েছে, কারোর খেয়াল নেই। সে বলল, হেরপর আমি যহন কইলাম, জামাইকত্তারা (অবনীমোহনরা) এইহানেই থাকব তহন মিঞাভাই তেনার পোলাপানেরে ডাইকা, বাপেরে ডাইকা, মায়েরে ডাইকা, ভাবীজানরে ডাইকা, কেতুগঞ্জের বেবাক মাইনষেরে ডাইকা চাইর দিক উথাল পাথাল কইরা ফেলাইল। মিঞাভাইর মুখে খালি একখান কথা, আমার কইলকাতার মিতায় এইবার রাইজদাবাসী হইব।
মুখময় কাঁচাপাকা দাড়ি। তার ফাঁকে জগতের সরলতম হাসিটি হেসে মজিদ মিঞা বলল, কথাখান শুইনা আহ্লাদে আটখান হইয়া গেছিলাম। আহ্লাদ হইলে মাইনষেরে ডাইকা ডাইকা কমু না?
মজিদের আনন্দ, মজিদের আন্তরিকতা প্রাণের ভেতরটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। অভিভূত অবনীমোহন বললেন, হাজার বার বলবেন—
মজিদ মিঞা যেন শুনতে পেল না। ঘোরের ভেতর থেকে বলে উঠল, আইজ বিহান বেলায় যার মুখ দেইখা যে উঠছিলাম, জন্ম জন্ম য্যান তার মুখ দেইখাই উঠি।
একটুক্ষণ চুপ।
তারপর মজিদ মিঞা নীরবতা ভাঙল, অহন কন কিসের লেইগা ডাইকা পাঠাইছেন—
হেমনাথ বললেন, খুব দরকারী কথা আছে তোর সঙ্গে—
মজিদ মিঞা উৎসুক চোখে তাকাল।
হেমনাথ বলতে লাগলেন, এখন না, খাওয়াদাওয়া কর। তারপর ধীরে সুস্থে শুনিস।
মজিদ মিঞার তর আর সয় না। বলল, না, অহনই ক’ন।
এইসময় ভেতর-বাড়ি থেকে করিম এসে জানায়, রান্নাবান্না হয়ে গেছে। স্নেহলতা বলে দিয়েছেন, এক্ষুনি যেন সবাই চান টান করে নেয়।
হেমনাথ বললেন, ওই যে তলব এসে গেছে। এখন যদি বসে বসে কথা বলতে থাকি, তোর আমার কারোর মাথাই বাঁচবে না।
