॥ প্রথম পর্ব সমাপ্ত ॥
২.০১-০৫ অবনীমোহনের ধারণা
কেয়াপাতার নৌকো – দ্বিতীয় পর্ব
২.০১
অবনীমোহনের ধারণা, পুর্ব বাংলাকে চেনার মন্ত্র হেমনাথ-লারমোর-স্নেহলতার মতো মানুষদের হাতে রয়েছে এবং এই বাংলাকে না জানলে গোটা বাংলা দেশটাকেই জানা যাবে না। তার বিশ্বাস এখানে তাদের থাকা ব্যর্থ হবে না, অবেগপূর্ণ সুরে সেই কথাই তিনি বলে গেলেন। তারপর উৎসুক দৃষ্টিতে হেমনাথের দিকে তাকালেন।
অভিভূতের মতো শুনে যাচ্ছিলেন হেমনাথ। আচ্ছন্ন গলায় বললেন, তুমি যে এভাবে ভেবেছ,
আমি চিন্তাই করিনি।
অবনীমোহন হাসলেন। হেমনাথ আবার বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ, পুব বাংলাকে না জানলে গোটা বাংলাদেশকে জানা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
একটু চুপ।
তারপর অবনীমোহন বললেন, কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে মামাবাবু–
কী সমস্যা?
আমরা যদি এখানে থেকে যাই, ছেলেমেয়েগুলো পরীক্ষা টরীক্ষা দিতে পারবে না। তাতে একটা করে বছর নষ্ট।
পরীক্ষার জন্য আটকাবে না। আমি হেডমাস্টারকে বলে দেব, জানুয়ারি মাসে বিনুকে পরের ক্লাসে ভর্তি করে নেবে। অবশ্য অ্যাডমিসন টেস্ট দিতে হবে। আর সুধা সুনীতির জন্যে তো ভবতোষই আছে। ওদের কলেজে ভর্তি হতে অসুবিধা হবে না।
অবনীমোহন বললেন, ভবতোষবাবু সন্ধেবেলা এসেছিলেন। সুধা সুনীতির ভর্তির ব্যাপারে আমি তাকে একটু আভাস দিয়েছি। বলেছি, দু’একদিনের ভেতর আপনাকে নিয়ে তার বাড়ি যাব।
হেমনাথ বললেন, বেশ তো—
হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে অবনীমোহনকে চিন্তিত দেখাল। বললেন, ভর্তি তো করব, কিন্তু–
কী?
ওরা কলকাতা ইউনিভার্সিটির কোর্স করেছে। এখানে–
বাধা দিয়ে হেমনাথ বলে উঠলেন, সে জন্যে তোমার দুশ্চিন্তা নেই। এখানকার কলেজটা কলকাতা ইউনিভার্সিটির আন্ডারে। ঢাকা শহর বাদ দিলে ইস্টবেঙ্গলে যত স্কুল কলেজ আছে তার প্রায় সবগুলোই কলকাতা ইউনিভার্সিটির আওতায় পড়ে।
তাই নাকি! আমার জানা ছিল না। যাক, ভালই হয়েছে। অবনীমোহন নিশ্চিন্ত হলেন।
হেমনাথ খানিক ভেবে বললেন, এখানে তো থাকবে, কিন্তু কলকাতায় তোমার ব্যবসা ট্যবসা আছে না?
আছে।
তার কী হবে?
তুলে দেব। মাঝখানে একবার কলকাতায় যেতে হবে। সব বন্দোবস্ত করে সপ্তাখানেকের ভেতর ফিরে আসব। ভাবছি–
কী?
চুপচাপ হাত-পা গুটিয়ে তো বসে থাকা যাবে না। এখানে কিছু ধান জমিটমি কিনে চাষবাস করব। একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
বেশ তো। কালই তোমার মিতাকে একটা খবর পাঠাচ্ছি। তার কাছে অনেক জমির খোঁজ আছে।
মিতা মানে মজিদ মিঞা?
হ্যাঁ।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেমনাথ আর অবনীমোহনের কথা গোগ্রাসে গিলছিল বিনু। হঠাৎ কে যেন চাপা গলায় ডেকে উঠল, ছুটোবাবু–
চমকে পেছন ফিরতেই দেখা গেল, বারান্দার খুঁটিতে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগল। চোখাচোখি হতেই যুগল হাতছানি দিল।
পায়ে পায়ে ঘর থেকে বাইরে এল বিনু। বলল, ডাকছ কেন?
চাপা আনন্দের গলায় যুগল বলল, বড় বাহারের সম্বাদ (খবর) ছুটোবাবু, বড় বাহারের সম্বাদ–
বুঝতে না পেরে বিনু শুধলো, কী?
আপনেরা রাইজদাইতে থাকবেন।
তারা রাজদিয়াবাসী হবে, এতে সবাই খুশি। হেমনাথ-ঝিনুক-শিবানী-স্নেহলতা, সব্বাই। যুগলও যে খুশি হবে, মনে মনে বিনু তা জানত।
যুগল বলল, লন (চলুন) আমার লগে।
কেন?
মেলা কথা আছে।
বিনু আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। অন্ধকারে যুগলের সঙ্গে তার ঘরে চলে এল। হাতড়ে হাতড়ে কোত্থেকে একটা হেরিকেন বার করে জ্বালিয়ে ফেলল যুগল। বলল, বয়েন–
বিনু পা ঝুলিয়ে চৌকিতে বসল। তারপর জানতে চাইল, কী কথা যেন বলবে—
তরাতরির কী দুটোবাবু, ধীরেসুস্থে শোনেন–
যুগলের চোখেমুখে আলো খেলে যাচ্ছে। দুই ঠোঁটের মধ্যিখানে আধফোঁটা একটু হাসি। বাইরেটা দেখে মনে হয়, প্রাণের ভেতর তার আনন্দের বান ডেকেছে। উৎসুক চোখে বিনু তাকিয়ে থাকল।
কিছুক্ষণ পর যুগল বলল, আইজ বিহান বেলায় বড়কত্তার লগে কমলাঘাট গ্যাছিলাম।
বিনু বলল, জানি।
হেইখানে কী হইছে জানেন ছুটোবাবু? কী?
খুশির সঙ্গে খানিকটা উত্তেজনা মিশিয়ে যুগল ফিসফিস করল, গোপাল দাসের লগে দেখা। হেও (সেও) কমলাঘাট আইছিল।
এত আনন্দের কারণ কিছুটা আন্দাজ করতে পারল বিনু। তাকিয়েই ছিল। বলল, সেই জন্যেই বুঝি এত ফুর্তি?
যুগল শব্দ করে হাসতে লাগল।
বিনু আজকাল বিয়ের ব্যাপারে যুগলের সঙ্গে ঠাট্টা টাট্টা করে। রগড়ের গলায় বলল, শ্বশুরের সঙ্গে দেখা হলে কার না আনন্দ হয়!
যুগল বলল অহনও হউর হয় নাই কিলাম।
দুদিন পর হবে তো।
তা হইব। যুগল তক্ষুনি ঘাড় কাত করল।
বিনু শুধলো, গোপাল দাস কী বললে?
আমারে কিছু কয় নাই। কথা বারা যা কিছু বড়ত্তার লগেই হইছে। যুগল বলতে লাগল, গোপাল দাস কী কইছে জানেন?
কী?
বিয়ার সোময় পাখিরে যা-যা গয়নাগাটি দিব, বানাইয়া ফালাইছে। হার, চুড়ি, আংটি, কানের দুল, জামাইর আংটি-কিছু আর বাকি নাই। হেরপর অন্য জিনিসের কথা ধরেন। নয়া কাপড় চোপড়, টিনের ভোরঙ্গ, বিছনা-পাটি, আয়না কাকই বাসন-কোসন-হগল কিনা (কেনা) হইয়া গ্যাছে। বলতে বলতে একেবারে বিভোর হয়ে গেল যুগল। তার চোখ চকচক করতে লাগল।
বিনু বলল, এত তাড়াতাড়ি সব কিনে ফেলল?
যুগল অবাক, তরাতরি কই ছুটোবাবু! দিনের হিসাব কইরা দেখছেন?
বিনু ঘাড় নাড়ল, হিসেব করেনি।
যুগল বলল, কাত্তিক মাস শ্যাষ হইয়া আইল। আর ছয় দিন পর অঘান পইড়া যাইব। অদ্যানের মাঝামাজি ধান কাটা। একবার ধান কাটা আরম্ভ হইলে উয়াস (নিশ্বাস) ফালানের সময় পাইব না গোপাল দাস। এক-আধটুক জমিন তো হের (তার) না, এক লপ্তে বিশ কানি জমিন। বিশ কানিতে কত ধান হয়, চিন্তা কইরা দ্যাখেন। হেই হগল কাইটা কুইটা, সেইত্যা ঘরে তুলতে পৌষ-মাঘ দুইখান মাস যাইব গিয়া। হের পরেই ফাগুন মাস। আর–
