বিনুর কোনও দিকে হৃক্ষেপ নেই। মা-বাবার মুখের দিকে পলকহীন সে তাকিয়ে আছে, গোগ্রাসে তাদের কথা গিলছে। ঝিনুকও একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল।
অবনীমোহন যখন বললেন, কলকাতায় আর ফিরবেন না, রাজদিয়াতেই থেকে যাবেন, তখন থেকেই উত্তেজনায় আনন্দে বিনুর বুকের ভেতরটা দুলতে শুরু করেছে। আদিগন্ত ধানের খেত, জল পূর্ণ প্রান্তর, পাখির ঝাঁক, লারমোর, হেমনাথ, যুগল, দ্বীপের মতো ভাসমান গ্রামগুলি, সুজনগঞ্জের হাট, যাত্রার আসার–সব একাকার হয়ে এই স্নিগ্ধ শ্যামল দেশ বিনুকে একেবারে জাদু করে ফেলেছে। এদের ছেড়ে যেতে হলে ভয়ানক কষ্ট হতো তার।
ওদিকে সংশয়ের গলায় সুরমা বললেন, সত্যিসত্যিই কলকাতায় যাবে না?
অবনীমোহন বললেন, কেন, আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?
কিন্তু—
কিন্তু টিন্তু নয়, আমি মনস্থির করে ফেলেছি।
মাথার ভেতর সত্যিই তা হলে পোকাটা নড়েছে?
ইয়েস ম্যাডাম।
সুরমা এবার আর অবাক হলেন না, কেননা তিরিশ বছর ধরে তিনি অবনীমোহনকে দেখে আসছেন। মানুষটি বিচিত্র। আর দশজনের সঙ্গে অবনীমোহনের মেলে না। তার স্বভাবের ভেতর কোথায় যেন একটা অস্থির যাযাবরের বাস। সেটা দু’দন্ড তাঁকে পা পেতে বসতে দেয় না, নিয়ত ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়।
কেউ হয়তো কোনও অজানা দেশের গল্প করল, অমনি ঘর-সংসার ভুলে অবনীমোহন ছুটলেন। কিছুদিন সেখানে গিয়ে থাকতে না পারলে তার স্বস্তি নেই। কেউ হয়তো রমণীয় কোনও দৃশ্যের, কোনও পাহাড়-নদী-জলপ্রপাত কিংবা সমুদ্রের খবর নিয়ে এল। আর যায় কোথায়? অবনীমোহনের ঘুম গেল, খাওয়া গেল। জগৎ রসাতলে যাক, তিনি সে সব জায়গায় না গিয়ে পারবেন না।
আজ রামেশ্বর, কাল অমরকন্টক, পরশু দ্বারকা-সারা বছর এ সব লেগেই আছে। চিরদিন এই ছোটাছুটির খেলা দেখে আসছেন সুরমা। এর জন্য ছেলেমেয়েদের ক্ষতিও কি কম হয়েছে?
কোথাও গিয়ে সেই জায়গাটা যদি মনে ধরে গেল, কার সাধ্য সেখান থেকে অবনীমোহনকে নড়ায়? যতক্ষণ না নতুন চমকপ্রদ কোনও অঞ্চলের খবর আসছে, তিনি সেখানেই থেকে যাবেন। একবার কাশী গিয়ে তো বছর খানেকই কাটিয়ে এলেন, আরেক বার মধুপুরে থেকে এলেন ন’মাসের মতো। এই করে সুনীতির দুটো বছর নষ্ট হয়েছে। সুধার গেছে দেড় বছর। নইলে এতদিনে ওরা বি.এ, টি.এ পাশ করে যেত। বিনুর অবশ্য ক্ষতি হয় নি। একটা বছর যেতে যেতে কোনও রকমে বেঁচে গেছে।
দেখে শুনে একেক সময় তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হয়। আসলে কিন্তু তিনি তা নন। এই যে নিয়ত ছুটে বেড়াচ্ছেন সেটা যেন পুরোপুরি সজ্ঞানে নয়, বিচিত্র এক ঘোরের মধ্যে। অস্থিরতার ঈশ্বর যেন তাকে দুই অদৃশ্য ডানা দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন আর তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ রাখছেন। না, থামবার উপায় নেই অবনীমোহনের।
দূর দেশের আকর্ষণেই শুধু নয়, কলকাতা শহরেই কি কম ছোটাছুটি করে বেড়ান অবনীমোহন? বছরে কতবার করে যে বাড়ি বদলান তার আর লেখাজোখা নেই। আজ হয়তো টালিগঞ্জে আছেন, কাল লরীতে মালপত্র চাপিয়ে চলে গেলেন কসবা, পরশু পাড়ি জমালেন বাগবাজরে। শেষ পর্যন্ত ভবানীপুরে একখানা বাড়ি কিনে থিতু হয়েছেন।
অবনীমোহনের পেছনে ঘুরে ক্লান্ত, ছুটে ছুটে বিরক্ত সুরমা প্রথম প্রথম বলতেন, এক জায়গায় দু’দিন স্থির হয়ে থাকতে কি তোমার ইচ্ছে করে না?
অবনীমোহন মাথা নাড়তেন আর হাসতেন, না সখী। না—
অবনীমোহন বলতেন, আমার কি ভাল লাগে জানো?
সুরমা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেন, কী?
নিত্য নতুন।
নিত্য নতুন কী? জায়গা না মানুষ?
মজাটা বুঝতে পেরে হেসে অবনীমোহন বলতেন, দুই-ই।
এবার সুরমার গলায় পরিহাসের ছোঁয়া লাগত, আমি কিন্তু পুরনো হয়ে গেছি। দেখো, এই বয়সে আর নতুনের পেছনে ছুটো না। বলে স্বামীর দিকে তরল চোখের দৃষ্টি হাসতেন।
রগড়ের গলায় অবনীমোহন বলতেন, তার আর উপায় নেই প্রাণেশ্বরী।
কপট ভয়ের সুরে সুরমা বলতেন, উপায় থাকলে বুঝি ছুটতে?
ভেবে দেখিনি। এবার থেকে ভাবব।
ভাল কথাই মনে করিয়ে দিলাম দেখছি।
একটু নীরব থেকে দূরমনস্কের মতো অবনীমোহন বলতেন, আমার স্বভাবটাই কেমন যেন সৃষ্টিছাড়া। কোথাও একটানা থাকতে ইচ্ছে করে না, এক কাজ বেশিদিন করতে ইচ্ছে করে না।
স্বভাবের এই যাযাবরত্ব তার নিজেরই কম ক্ষতি করে নি। অবশ্য এই ক্ষতিকে ক্ষতি বলেই মানেন না অবনীমোহন।
সাধারণ মানুষ পায়ের তলায় নিশ্চিন্ত একটু আশ্রয় পেলেই স্থির হয়ে বসে। সেইখানেই জীবনকে ফুলফলে ভরে তোলে। অবনীমোহন কোনও দিন তা পারলেন না। পায়ের নিচে স্থির ভূমি তো কতবারই তিনি পেয়েছন। প্রথম জীবনে বিরাট সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন, সেটা থাকলে এতদিনে। হাজার টাকার বেশি মাইনে হয়ে যেত। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই চাকরি ছেড়ে কলেজে অধ্যাপনা শুরু করলেন। অধ্যাপক হিসেবে প্রচুর খ্যাতি হল, কিন্তু তার আয়ুও বেশিদিন নয়, বড় জোর বছর চারেক। তারপর কালো কোট গায়ে চাপিয়ে উকিল সাজলেন, ওকালতিতে যথেষ্ট পয়সা হল। কিন্তু একদিন দেখা গেল, আদালত টাদালতের বদলে শেয়ার মার্কেটে যাতায়াত শুরু করেছেন, হেসিয়ান আর বুলিরান মার্কেটের রহস্য কিছুদিন তাকে আচ্ছন্ন করে রাখল।
মোট কথা, কোথাও নোঙর ফেলে বসা তার স্বভাবে নেই। এটা ছাড়ার জন্য তার কতখানি ক্ষতি হল, ওটা পেয়ে কতখানি লাভবান হলেন, অবনীমোহন কোনও দিন তা ভাবেন না। লাভ ক্ষতি, কোনও কিছুর জন্য তার অনুশোচনা নেই, দুঃখ নেই, আসক্তি নেই।
