শিশির-স্মৃতিরেখা রুমা, কারোর চোখই শুকনো নেই। সবাই ভারাক্রান্ত, বিষাদমলিন। রামকেশব এবং তার স্ত্রীর কান্না ওদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে।
হেমনাথ বললেন, খুব তো কান্নাকাটি চলছে। স্টিমার ক’টায় ছাড়বে হুঁশ আছে?
শিশির যেন সময় সম্বন্ধে এতক্ষণে সচেতন হলেন। বললেন, সোয়া বারটায়– বলেই পকেট থেকে চেনে-বাঁধা ঘড়ি বার করলেন, ইস, বারটা বাজে! আর মোটে পনের মিনিট সময় হাতে।
হেমনাথ বললেন, বেশ মানুষ তোরা! মালপত্র স্টিমারে তুলতে হবে না? টিকিট কাটা হয়েছে?
শিশির জানালেন, টিকিটটা কালই করে রাখা হয়েছে।
কিসে যাচ্ছিস, ডেকে না কেবিনে?
ডেকে।
মালপত্র তুলবার ব্যবস্থা কর। ছেলেপুলে নিয়ে যাবি, হাত-পা ছড়িয়ে বসবার শোবার মতো খানিকটা জায়গা তো চাই। একটা রাতের মতো স্টিমারে থাকতে হবে।
অতএব হিন্দুস্থানী কুলিদের ডাক পড়ল। মালপত্র মাথায় নিয়ে তারা স্টিমারের দিকে ছুটল। সবাইকে সঙ্গে করে হেমনাথও স্টিমারে এলেন। তার নির্দেশমতো চারদিকে বাক্স-ট্রাঙ্ক-টিফিন ক্যারিয়ার, এইসব নামিয়ে রেখে কুলিরা ডেকের অনেকখানি জায়গা দখল করে ফেলল। মাঝখানে পেতে দিল ঢালা বিছানা।
হেমনাথ বললেন, সাবধানমতো যাবি, কলকাতায় গিয়েই পৌঁছ-সংবাদ দিয়ে চিঠি লিখবি।
শিশির বললেন, লিখব।
এর মধ্যে ছুটিছাটা পেলে বৌমাদের নিয়ে চলে আসবি।
সরকারি চাকরি, ছুটিছাটা বড় কম। আসছে বছর পুজোর আগে আসার আর সম্ভাবনা নেই।
বাড়ি আসার ব্যাপারে শিশির রামকেশব এবং হেমনাথের মধ্যে কথা হতে লাগল।
এদিকে ঝুমা বিনুর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। ডাকল, বিনুদা—
বিনু তার দিকে তাকাল।
ঝুমা বলল, সেই কথাটা মনে আছে তো?
কোনটা?
কলকাতায় গিয়ে আমাদের বাড়ি যাবে, আমি তোমাদের বাড়ি যাব।
মনে আছে। তুমি কিন্তু আমাদের বাড়ি আগে আসবে।
কথায় কথায় খেয়াল ছিল না। হঠাৎ বিনুর চোখে পড়ল, একটু দূরে জলের কাছটায় স্টিমারের রেলিঙ ধরে সুনীতি আর আনন্দ খুব ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একটু পর স্টিমারঘাট থেকে ঘন্টির শব্দ ভেসে এল। হিন্দুস্থানী কুলি আর খালাসিরা চিৎকার করে উঠল, যাঁরা স্টিমারে যাবেন না তারা যেন নেমে যান। কেননা গ্যাংওয়ে এক্ষুনি সরিয়ে নেওয়া হবে।
হেমনাথ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, এবার আমরা নামব শিশির। সুনীতি কোথায় রে? বিনু, ঝিনুক–
বিনুরা কাছেই ছিল। সুনীতি ছুটে এল। তারপর আরম্ভ হল প্রণাম পর্ব। শিশিররা একে একে হেমনাথ রামকেশব আর তার স্ত্রীকে প্রণাম করলেন। বিদায় নিয়ে আশীর্বাদ করে হেমনাথরা জেটিঘাটে নেমে এলেন। তারা নামবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গ্যাংওয়ে সরিয়ে নেওয়া হল। জেটি আর স্টিমারের মাঝখানে কাঠের পাটাতনের সংযোগটুকু ছিন্ন হয়ে গেল।
তারপর দু’মিনিটও কাটল না, ভো বাজিয়ে স্টিমার ছেড়ে দিল। জলজানের দু’ধারে বড় বড় চাকা দু’টো নদী তোলপাড় করে বিপুল গর্জনে ঘুরে চলেছে, ফলে ঢেউ উঠছে পাহাড়প্রমাণ। আর তাতে চারদিকের নৌকোগুলো মোচার ভোলার মতো দুলে চলেছে।
স্টিমারের যত যাত্রী সব এদিকের রেলিংএর কাছে ভিড় জমিয়েছে আর সমানে হাত নাড়ছে। তাদের ভেতর ঝুমাদের দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ঝুমা হাত নাড়ছিল না, রুমাল ওড়াচ্ছিল।
ঝুমার জন্য মনটা ভারি খারাপ হয়ে গেছে বিনুর। আস্তে আস্তে সেও হাত নাড়ছিল।
প্রথম দিকে স্টিমারটার গতি ছিল রাজহাঁসের মতো মন্থর, ধীরে ধীরে তাতে দুর্দম বেগ এসে যেতে লাগল। একসময় কুমাদের নিয়ে অনেক দূরে একটা বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেল স্টিমারটা।
এতক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে ছিলেন শিশিরের মা। যখন আর স্টিমারটা দেখা গেল না, আচমকা জোরে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন।
শিশিরের মায়ের কান্না দেখতে দেখতে, হঠাৎ কেন কে জানে বিনুর মনে হল, তারা যখন রাজদিয়া থেকে চলে যাবে নদীতীরে দাঁড়িয়ে ঝিনুকও হয়তো এই রকম কাঁদবে।
এক দিকে ঝুমা, আরেক দিকে ঝিনুক দুইয়ের মাঝখানে নিজেকে কেমন যেন মনে হয় বিনুর!
১.৩৬ দুর্গাপুজোর পর কোজাগরী
দুর্গাপুজোর পর কোজাগরী। তারপর একে একে কালীপুজো, ভ্রাতৃদ্বিতীয়াও চলে গেল। অবনীমোহন কলকাতায় ফেরার কথা আর বলেন না।
কার্তিকের শেষাশেষি একদিন সুরমা বললেন, কি গো, তোমার মতলবটা কী?
অবনীমোহন বললেন, কিসের মতলব?
কলকাতায় ফিরছ কবে?
কলকাতায় আর ফিরছি না।
তার মানে?
ইস্টবেঙ্গলেই থেকে যাব ভাবছি।
সুরমা অবাক, কী বলছ তুমি!
অবনীমোহন হাসতে হাসতে বললেন, মাথার ভেতর সেই পোকাটা নড়ে উঠেছে।
পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে সুরমা আর অবনীমোহন কথা বলছিলেন। তারা ছাড়া আরও দুজন এখানে রয়েছে বিনু এবং ঝিনুক। সুধা সুনীতি কোথায়, কে জানে। হয়তো ভেতর-বাড়িতে স্নেহলতা শিবানীর সঙ্গে গল্পটল্প করছে; কিংবা বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হেমনাথ বাড়ি নেই, ভোরবেলা উঠেই কী একটা কাজে কমলাঘাটের গঞ্জে গেছেন। ফিরতে ফিরতে রাতদুপুর।
সময়টা বিকেল। এই তো খানিক আগে দুপুর পার হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই হেমন্তের শেষ বেলাটা দ্রুত জুড়িয়ে যাচ্ছে। রোদ কেমন যেন মলিন আর স্তিমিত। বাগানে ছায়া ঘন হতে শুরু করেছে। অনেক দূরে–পুকুর এবং ধানখেতের ওপারে আকাশ আর দিগন্ত যেখানে একাকার, সেই জায়গাটা কেমন যেন ঝাঁপসা। বেলা থাকতে থাকতেই কি ওখানে হিম পড়ছে?
