এই বসুন্ধরায় কত দিকে কত রঙের মেলা সাজানো। এক জায়গায় থেমে থেকে জীবনকে একরঙা প্রতিমা বানাতে চান না অবনীমোহন। সমস্ত পিছুটান আর একঘেয়েমি ছিঁড়ে সামনের দিকে তিনি শুধু ছোটেন আর নিজের জন্য এক আশ্চর্য জগৎ গড়ে তোলেন।
অবনীমোহন যখন একবার স্থির করেছেন যাবেন না, তখন এই রাজদিয়াতেই থেকে যেতে হবে। যতদিন পূর্ব বাংলা তাকে মুগ্ধ বিস্মিত চমৎকৃত করে রাখছে ততদিন এখান থেকে যাবার কোনও আশাই নেই।
তবু সুরমা বললেন, দুম করে তো বলে বসলে যাবে না। সব দিক ভেবে দেখেছ?
অবনীমোহন বললেন, সব দিক বলতে?
প্রথমে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কথাই বল। বছর শেষ হতে চলল, আর ক’দিন পর পরীক্ষা। এখন এখানে থেকে গেলে নির্ঘাত একটা করে বছর নষ্ট।
নষ্ট যাতে না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে।
কেমন করে?
মামাবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে দেখি।
চিন্তিত মুখে সুরমা বললেন, ছেলেমেয়েগুলোর যা হবে তা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু তোমার ব্যবসা? এত খেটেখুটে যে দাঁড় করালে, তার কী হবে?
রাজদিয়া আসার আগে ব্যবসা শুরু করেছিলেন অবনীমোহন–এজেন্সির ব্যবসা। কয়েকটা বড় বড় বিলিতি কোম্পানির এজেন্সি যোগাড় করেছিলেন। এজন্য তাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। রাতদিন কত যে ছোটাছুটি করেছেন আর কত লোককে ধরেছেন তার হিসেব নেই।
অবনীমোহন বললেন, ব্যবসা আর করব না।
এমন অক্লেশে তিনি কথাগুলো বলে গেলেন যে সুরমা একেবারে থ। বিমূঢ়ের মতো প্রতিধ্বনি করলেন, ব্যবসা করবে না?
না।
একটুক্ষণ নীরবতা। তারপর সুরমা আবার বললেন, ব্যবসা না হয় নাই করলে কিন্তু কলকাতায় বাড়ি আছে, সেখানে আমাদের মালপত্র রয়েছে। সে সবের কী হবে?
অবনীমোহন বললেন, মাঝখানে আমি একবার কলকাতায় যাব, সমস্ত বন্দোবস্ত করে আসব।
যা ভাল বোঝ কর, আমি আর কী বলব! সুরমা বলতে লাগলেন, এই পূর্ব বাংলাই যে তোমার কতদিন ভাল লাগবে তা-ই ভাবছি। কবে আবার বলবে, এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে আরেক জায়গায় চল–
অবনীমোহন হাসতে লাগলেন।
মৃদু ধমকের গলায় সুরমা বললেন, অমন হেসো না –
বে কী করব?
হাসতে হাসতে অবনীমোহন শুধোলেন।
এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সুরমা বললেন, তোমার হাসি দেখলে আমার গা জ্বলে যায়।
অবনীমোহন কিছু বললেন না, নিঃশব্দে হাসতেই থাকলেন।
সুরমা থামেননি, সত্যি, একটা কথা ভাবলে আমার মাথার ঠিক থাকে না।
কী কথা?
প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়েস হল তোমার, এখনও ওড়ার স্বভাব গেল না। কবে যে তোমার স্থিতি হবে!
ওটা বোধহয় এ জন্মে আর হবে না।
আমারও তাই মনে হয়।
এবার অবনীমোহন যা বললেন তা এই রকম। এই পৃথিবীতে ক’দিনের জন্যেই বা মানুষ আসে। পঞ্চাশ ষাট কিংবা সত্তর বছর। তার বেশি তো নয়। অল্পক্ষণের এই প্রবাসে এক জায়গায় স্থির হয়ে গিয়ে জীবনকে বদ্ধজলার মতো গতিহীন, বর্ণহীন করে তোলার কোনও মানে হয় না। তার চাইতে বহতা নদীর মতো দেশ দেশান্তরে ঘুরে যত দিকের যত মাধুর্য পার, লুট করে নাও।
জীবন সম্পর্কে অবনীমোহনের ধ্যানধারণার সঙ্গে সুরমার মেলে না। বিরক্ত গলায় তিনি বললেন, চিরকাল ওই এক বক্তৃতা। শুনে শুনে কান পচে গেল–
অবনীমোহন কী বলতে যাচ্ছিলেন, ভেতর-বাড়ি থেকে স্নেহলতার গলা ভেসে এল, রমু—রমু–
সুরমা উঠে পড়লেন, মামীমা ডাকছে, যাই–বলতে বলতে পা বাড়িয়ে দিলেন।
একটু পর অবনীমোহনও উঠলেন। তিনি অবশ্য ভেতরে গেলেন না, উঠোন পেরিয়ে বাগানের গাছপালার ভিড়ে অদৃশ্য হলেন।
তারপরও খানিকটা সময় কাটল।
হেমন্তের শেষ বেলাটা দ্রুত নিবে যাচ্ছে। লাটাইতে সুতো গুটনোর মতো কেউ যেন দিনান্তের রোদটুকু টেনে নিতে শুরু করেছে। গাছপালার মাথায়, দূরের ধানবনে গাঢ় বিষাদের মতো কী যেন নামছে।
আশ্বিন মাসে বিনুরা যখন রাজদিয়া এল, আকাশ তখন কত উজ্জ্বল। সারা বর্ষার জলে ধুয়ে ধুয়ে তার নীল রংখানি শরতে খুলে গিয়েছিল। সমস্ত দিন পরিষ্কার আয়নার মতো আকাশটা ঝকঝক করত। কিন্তু কার্তিক পড়তে না পড়তেই তার চেহারা বদলে গেছে। আকাশ এখন ধূসর, শোকাতুরের মতো সারাদিন বিষণ্ণ হয়ে থাকে।
একটু পরেই ঝপ করে সন্ধে নেমে যাবে। তার নিঃশব্দ আয়োজন চলছে চারদিকে।
হঠাৎ পাশ থেকে ঝিনুক ডেকে উঠল, বিনুদাদা—
বিনু ঝাঁপসা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে চোখ রেখেই আস্তে সাড়া দিল।
ঝিনুক বলল, কী মজা, না?
কিসের মজা?
বারে, মেসোমশাই কী বলল, শোন নি?
অন্যমনস্কের মতো বিনু বলল, কী বলল?
ঝিনুক বলল, তোমাদের কলকাতায় যাওয়া হবে না।
বিনু উত্তর দিল না।
আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। তোমার?
বিনুর যে আনন্দ হচ্ছিল না, তা নয়। হঠাৎ কুমার কথা মনে পড়ে গেল তার। বলল, আমাদের কলকাতায় যাওয়া না হলে ভারি মুশকিল হবে।
ঝিনুক জানতে চাইল, কিসের মুশকিল?
ঝুমারা কলকাতায় আমাদের বাড়ি আসবে বলেছিল। আমরা না গেলে ওরা এসে নিশ্চয়ই ফিরে যাবে।
একদৃষ্টে কিছুক্ষণ বিনুকে দেখল ঝিনুক। মনে মনে তার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। একসময় গম্ভীর গলায় বলল, তা হলে রাজদিয়াতে থাকতে তোমার আনন্দ হচ্ছে না, কেমন? ·
বিনু কুমার কথা ভাবছিল, তাই সাড়া দিল না।
রাগ করে আর কোনও কথাই বলল না ঝিনুক। গাল ফুলিয়ে বসে থাকল।
হেমন্তের সন্ধেটা যেন সরু সুতোয় ঝুলছিল। সুতোটা ছিঁড়ে গিয়ে ঝপ করে সেটা নেমে এল।
