তা তো ঠিকই। তোমরা কবে যাচ্ছ?
অক্টোবরের বাইশ তারিখে স্কুল খুলবে, তার আগেই যাব।
কলকাতায় গেলে আমাদের বাড়ি আসবে তো?
যাব।
আমাদের বাড়ি হেলদার কাছে, বত্রিশ নম্বর রামকান্ত চাটুজ্যে লেন।
বিনু কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই বাড়ির ভেতর থেকে ডাক এল, কোথায় গেলি রে তোরা? এই বিনুদাদা–ঝুমাদিদি–শিগগির বাড়ি আয়–
হেমনাথের গলা। বিনু বলল, চল, বাড়ি যাই। দাদু ডাকছে।
যেতে যেতে ঝুমা বলল, আমাদের বাড়ি যাবার কথা মনে থাকে যেন। তুমি আবার বড় ভুলে। যাও।
ভুলব না। তবে–
কী?
আমি তো একা একা অতদুর যেতে পারব না। বাবাকে বলব, না নিয়ে গেলে কিন্তু যাওয়া হবে না।
ভুরু কুঁচকে বিনুর দিকে তাকাল ঝুমা। গলার স্বরে ধিক্কার মিশিয়ে বলল, কী ছেলে তুমি! ভবানীপুর থেকে দু’নম্বর দোতলা বাসে উঠবে, সোজা হেদায় এসে নামবে। একটু ভেবে বলল, ঠিক আছে, তোমাকে আগে যেতে হবে না। আমরাই আগে তোমাদের বাড়ি যাব।
কার সঙ্গে যাবে?
কার সঙ্গে? চোখের পাতা নাচাতে নাচাতে ঝুমা বলল, আমার মামার সঙ্গে। তখন শুনলে, সুনীতিদিকে মামা বলছিল, তোমাদের বাড়ি যাবে। মামা গেলেই আমি তার পিছু নেব।
সেই ভাল।
একটু চুপ করে থেকে ঝুমা বলল, আচ্ছা বিনুদা–
কী?
সুনীতিদির সঙ্গে মামার খুব ভাব, না?
হুঁ–
ঘাড় কাত করে ঝুমা এবার বলল, তোমার সঙ্গে আমারও খুব ভাব—
বিনু উত্তর দিল না। আড় চোখে একবার ঝুমাকে দেখে নিল।
বাড়ি ফিরবার পর ঝুমারা বেশিক্ষণ থাকল না। সন্ধে নামতে না নামতেই চলে গেল।
যাবার সময় হেমনাথ বললেন, তোরা কাল দুপুরের স্টিমারে যাচ্ছিস তো?
শিশির বললেন, হ্যাঁ।
যদি পারি স্টিমারঘাটে যাব।
আবার কষ্ট করে–
কষ্ট আর কি—
.
দিন দুই আগে কোজাগরী পূর্ণিমা গেছে। তার রেশ এখনও রয়েছে। সন্ধের ঠিক পরেই আকাশের গা বেয়ে রুপোর থালার মতো চাঁদ উঠে এল। চারদিকে-বাগানে, ধানখেতে, পুকুরের শান্ত স্থির টলটলে জলে জ্যোৎস্নার বান ডাকল। পাখিদের আর সাড়াশব্দ নেই, সারাদিনের ক্লান্তিমাখা দেহে তাদের ঘুম নেমে এসেছে। বিকেলবেলা থেমে থেমে ঝিঁঝিরা ডাকছিল, এখন আর মাঝখানে ছেদ নেই। একটানা তাদের কণ্ঠসাধনা চলছে।
ঝুমারা খানিক আগে চলে গেছে। অবনীমোহন বললেন, বিনু ঝিনুক সুধা-সুনীতি, তোরা সব পড়তে বসে যা।
দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় পাটি পেতে দু’খানা হোরিকেন জ্বেলে চারজনে পড়তে বসল। বিনুর দেখাদেখি হিংসেয় হিংসেয় আজকাল ঝিনুকও পড়তে বসে।
বিনুর কাছাকাছি বসে ছিল ঝিনুক। কিছুক্ষণ পড়ার পর সবার কান বাঁচিয়ে ঝিনুক ডাকল, বিনুদাদা–
পড়ার বই থেকে মুখ তুলল বিনু, কী বলছ?
তখন তোমরা কী করছিলে?
সেদিন লক্ষ্মীসরা আনতে যাবর সময় ঝিনুককে সঙ্গে নেয় নি, সে জন্য মায়ের হাতে মার খেতে হয়েছিল। সেই থেকে ঝিনুকের সঙ্গে বিশেষ কথা বলে না বিনু, মনে মনে মেয়েটার ওপর খুব রেগে আছে। নিস্পৃহ সুরে সে বলল, কখন?
বিকেলবেলা। ঝিনুক বলতে লাগল, তুমি আর ঝুমা পুকুরঘাটে পা ডুবিয়ে বসে ছিলে, সেই তখন?
বিনু চমকে উঠল, তুমি আমাদের দেখেছ?
হ্যাঁ। ঝিনুক বলতে লাগল, প্রথমে সুনীতিদিদি গেল, তার পেছন পেছন গেল আনন্দদাদা। আনন্দদাদার পর তুমি গেলে তারপর ঝুমা। ঝুমার পিছু পিছু আমি গেলাম।
অবাক বিস্ময়ে বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকল বিনু।
ঝিনুক থামে নি, তখন তোমরা কী করছিলে, বল না?
বিনু আস্তে করে বলল, গল্প করছিলাম।
কী গল্প?
সে অনেক রকম।
হোক অনেক রকম, তুমি বল।
বিনু বলল, অত আমার মনে নেই।
ঝিনুক নাছোড়বান্দা, যা আছে তাই বল।
একটু ভেবে নিয়ে বিনু বলল, ঝুমারা তো কাল কলকাতা চলে যাবে। আমরাও কদিন পর যাচ্ছি। ঝুমা বলছিল, কলকাতায় গেলে ওদের বাড়ি যেতে, ওরাও আমাদের বাড়ি আসবে। এই সব–
হঠাৎ আলো নিবে গেলে যেমন হয়, ঝিনুকের মুখখানা নিমেষে সেই রকম মলিন হয়ে গেল। চোখ দুটি কেমন যেন ব্যথিত আর করুণ। কঁপা শিথিল গলায় সে বলল, তোমরা কলকাতায় চলে যাবে!
বা রে, আমরা এখানে সারা জীবন থাকতে এসেছি নাকি?
মুখখানা আরও বিষণ্ণ হয়ে গেল ঝিনুকেরা। নীলকান্ত মণির মতো চোখের তারাদু’টো জলে ডুবে যেতে লাগল।
এই মেয়েটার জন্য কদিন আগে যে মার খেতে হয়েছিল তা আর মনে থাকল না বিনুর। ঝিনুকের জন্য হঠাৎ অত্যন্ত মমতা বোধ করল সে। গাঢ় গলায় বলল, তুমি কাঁদছ?
ঝিনুকের চোখ থেকে পোখরাজের দানার মতো জলের বিন্দুগুলি টপ টপ করে ঝরতে লাগল। বিনুর দিকে সে আর তাকিয়ে থাকতে পারছিল না; আপনা থেকেই তার মাথাটা নিচের দিকে নেমে গেল।
বিনু ভীষণ বিব্রত বোধ করছিল। সবার কান বাঁচিয়ে যতখানি সম্ভব চাপা গলায় বলতে লাগল, এই বোকা মেয়ে, কাঁদে না।
ঝিনুকের কান্না থামল না। শব্দ করে সে অবশ্য কাঁদছে না, নীরবে পোখরাজের দানাগুলো বিরামহীন ঝরেই যাচ্ছে।
বিনু আবার বলল, আরে বাপু, এক্ষুনিই তো আমরা চলে যাচ্ছি না আরও কিছুদিন থাকব।
.
পরের দিন দুপুরবেলা শিশিরদের বিদায় জানাবার জন্য হেমনাথ স্টিমারঘাটে গেলেন। তার সঙ্গে সুনীতি ঝিনুক আর বিনু।
শিশিররা ততক্ষণে এসে গেছেন। তাঁদের সঙ্গে এসেছেন রামকেশব আর তার স্ত্রী, অর্থাৎ শিশিরের বাবা-মা।
শিশিররা এখনও স্টিমারে ওঠেন নি, জেটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শিশিরের মা খুব কাঁদছিলেন আর আঁচলে ঘন ঘন চোখ মুছছিলেন। রামকেশবের চোখদু’টিও ফোলা ফোলা, ঈষৎ আরক্ত। বোঝ যায়, গোপনে তিনিও কেঁদেছেন। দীর্ঘ এক বছরের জন্য ছেলে কলকাতায় চলে যাচ্ছে, বিদায়ের সময় কেউ আর স্থির থাকতে পারছেন না।
