বেশিক্ষণ খোঁজাখুঁজি করতে হল না। উত্তর দিকে যে বেতবন রয়েছে তার গায়ে ঝাঁকড়া-মাথা একটা পিটক্ষীরা গাছ। গাছটার অনেকগুলো মোটা মোটা শেকড় মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে। দুটো শেকড়ে মুখোমুখি বসে রয়েছে সুনীতি আর আনন্দ।
জায়গাটা আড়াল মত। পা টিপে টিপে বিনু পিটক্ষীরা গাছটার কাছে চলে এল। এমনভাবে দাঁড়াল যাতে সুনীতিরা তাকে দেখতে না পায়।
আনন্দ বলছিল, কালই আমরা চলে যাচ্ছি।
মৃদু আধফোঁটা গলায় সুনীতি বলল, সে তো শুনলাম। আপনার জামাইবাবু তখন বললেন।
আনন্দ বলল, তুমি কিছু বলবে না?
দূরে দাঁড়িয়ে বিনু অবাক। আনন্দ তো বড়দিকে আপনি’ বলত, সম্ভাষণের ভাষাটা কবে থেকে বদলে গেল কে জানে।
সুনীতি আগের স্বরেই বলল, আমি কী বলব?
বা রে, চলে যাচ্ছি। ভালমন্দ কিছু বলবে না?
সুনীতি উত্তর দিল না।
একটু ভেবে আনন্দ বলল, আবার কবে দেখা হবে?
সুনীতি বলল, তা কী করে বলি—
তোমরা কলকাতায় যাচ্ছ কবে?
বলতে পারছি না।
তবু?
পুজোর ছুটি শেষ না হলে দাদু বোধহয় যেতে দেবেন না।
কোন পুজোর ছুটি? স্কুল-কলেজের, না অফিস-টফিসের?
স্কুল-কলেজের।
ঈষৎ হতাশার সুরে আনন্দ বলল, ওরে বাবা, সে তো এখনও অনেক দিন! সেই ভাইফোঁটার পর শেষ হবে।
সুনীতি আস্তে ঘাড় কাত করল।
ততদিন তা হলে দেখা হবার সম্ভাবনা নেই?
তাই তো মনে হচ্ছে।
একটু নীরবতা। তারপর আনন্দ বলল, আমার খুব খারাপ লাগছে, খুব খারাপ।
মৃদু কণ্ঠস্বরে সুনীতি বলল, আমারও খুব ভাল লাগছে না।
তোমরা কিন্তু স্বচ্ছন্দে কালই আমাদের সঙ্গে কলকাতায় যেতে পারতে।
ও ব্যাপারে আমার কোনও হাত নেই।
চিন্তাগ্রস্তের মতো আনন্দ বলল, তা বটে।
সুনীতি কিছু বলল না।
আনন্দ আবার বলল, তোমাদের কলকাতার ঠিকানা কী?
সুনীতি ঠিকানা জানিয়ে দিল।
আনন্দ বলল, ঠিকানা নিলাম, তোমাদের বাড়ি কিন্তু যাব।
নিশ্চয়ই আসবেন।
কেউ কিছু মনে করবে না তো?
কারোর মনে করাকরিতে আপনার কিছু যাবে আসবে?
তার মানে?
সুনীতি লীলাভরে ঘাড় বাঁকিয়ে হাসল, মানে আসবেন, যখন খুশি আসবেন।
আনন্দ বলল, সে তো অনেক দেরি। মাঝখানের এই দিনগুলো–
কী?
কেমন করে কাটবে?
আমাকে দেখার আগে যেমন করে কাটত।
উঁহু—
কী?
তা আর হয় না।
চোখের তারায় কেমন করে যেন হাসল সুনীতি। বলল, কেন মশাই?
আনন্দ বলল, বুঝতে পারছ না?
না।
সত্যি?
হুঁ–
তা হলে কারণটি বলি?
বলতে হবে না।
একটু চুপ। তারপর কী ভেবে আনন্দ বলল, ভাবছি কলকাতায় গিয়ে একটা কাজ করব।
সুনীতি জিঞ্জাসু চোখে তাকাল, কী?
আনন্দ বলল, তোমাকে রোজ একখানা করে চিঠি লিখব।
সুনীতি চমকে উঠল, ও মা, না না– তারপর দু’হাত এবং মাথা একই সঙ্গে জোরে জোরে প্রবলবেগে নেড়ে বলতে লাগল, কিছুতেই না, কিছুতেই না। চিঠি টিঠি লিখবেন না।
কেন লিখব না?
সবাই কী ভাববে!
যা সত্যি তাই ভাববে।
না না, আমি ভারি লজ্জায় পড়ে যাব। কারোর মুখের দিকে তাকাতে পারব না। আর সুধাটা তো–
সুধা কী?
আমাকে একেবারে পাগল করে ছাড়বে।
আনন্দ আর সুনীতির বাকি কথাগুলো আর শোেনা হল না। তার আগেই পাশ থেকে কে ডেকে উঠল, বিনুদা–
চমকে পেছন ফিরতেই বিনু দেখতে পেল, ঝুমা। চোখাচোখি হতেই মেয়েটা হাসল, এখানে কী করছ?
ইঙ্গিতে আনন্দ সুনীতিকে দেখিয়ে ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল বিনু। নিচু গলায় বলল, চুপ।
ঝুমাটা ভারি চালাক। চট করে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে ফিসফিস গলায় বলল, লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের কথা শুনে কী হবে? চল আমরা ওদিকে যাই।
আনন্দ সুনীতি এত তন্ময়, নিজেদের নিয়ে এতই মগ্ন যে বিনুদের অস্তিত্ব টের পেল না। বিনু শুধলল, ওদিকে কোথায় যাবে?
এদিক ওদিক দেখে ঝুমা বলল, চল, পুকুরঘাটে গিয়ে বসি।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঝুমার সঙ্গে যেতে হল। শান-বাঁধানো পুকুরঘাটে এসে জলে পা ডুবিয়ে পাশাপাশি বসল দু’জন।
পুকুরের ওপারে ধানের খেত। এই তো সেদিন বিনুরা রাজদিয়া এল। পুরোপুরি একটা মাসও হয় নি। তখন ধানগাছগুলো সবে শিষ ছাড়তে শুরু করেছে। আর এখন, কার্তিকের এই শুরুতে? পাতা আর দেখা যায় না। ধানের মঞ্জরীতে মঞ্জরীতে চারদিক ছেয়ে গছে। সবুজ তুষের ভেতর এখন অবশ্য দুধ জমছে, একটু টিপলেই বেরিয়ে আসে। কদিন পর আর এই দুধ থাকবে না, ঘন হয়ে জমাট বেঁধে একেক দানা শস্য হয়ে যাবে–মানুষের বাঁচার আশ্বাস, তার সঞ্জীবনী।
এখনও মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ। যুগল বলেছে, কদিন পর অঘ্রাণ পড়লেই এ রং থাকবে না। ধান পেকে মাঠের ঝাপি সোনালি লাবণ্যে ভরে যাবে।
পা দিয়ে জলে ঢেউ তুলতে তুলতে ঝুমা ডাকল, বিনুদা–
দূর ধানখেতের দিকে তাকিয়ে বিনু আনন্দ আর সুনীতির কথা ভাবছিল। ঝুমার ডাকে অন্যমনস্কের মতো সাড়া দিল।
ঝুমা বলল, আমার কিন্তু খুব মন কেমন করবে।
কেন?
কেন আবার, তোমার জন্যে।
বিনু উত্তর দিল না।
ঝুমা এবার বলল, সেদিন নৌকোয় করে আমরা ফুল তুলতে গিয়েছিলাম—
হুঁ–
তুমি কাউফল পাড়তে গিয়ে জলে ডুবে গিয়েছিলে—
হুঁ–
তারপর পুজোর সময় পাশাপাশি বসে থিয়েটার দেখলাম—
হুঁ–
মাঝরাত্তিরে নৌকো চড়ে যুগলের সঙ্গে সুজনগঞ্জে যাত্রা শুনতে যাওয়া—
হুঁ–
কলকাতায় গিয়ে এই সব খুব মনে পড়বে।
বিনু কিছু বলল না, আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল।
ঝুমা বলল, তোমরা কলকাতায় যাবে না?
বিনু বলল, যাব না মানে? ছুটির পর স্কুল খুললেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা। এখানে বসে থাকলে পরীক্ষা দেব কী করে?
