একে একে বিনুরা নৌকো থেকে নামল। সবার শেষে নামলেন অবনীমোহন। তার একখানা হাত ধরে মজিদ মিঞা বলল, আপনে না আইলে কিন্তু আমি আর যাইতাম না।
হাসতে হাসতে অবনীমোহন বললেন, তা তো জানি, সেই জন্যেই চলে এলাম।
বাড়ির দিকে যেতে যেতে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল মজিদ মিঞা। নতুন জামা-পরা বাচ্চাগুলো তারই ছেলেমেয়ে। তাদের কারোর নাম রাশেদ, কারোর মতিয়া, কারোর ওসমান, কারোর কামরণ। বিনুরা আসবে বলেই তাদের সাজসজ্জার এমন ঘটা। নতুন জামা টামা পরে সেই সকাল থেকে বসে আছে।
ঘোমটা-ঢাকা প্রৌঢ়াটির নাম নছিরণ–মজিদ মিঞার বিবি। তার হাত দুটোই শুধু দেখা যাচ্ছে, তাতে রুপোর কঙ্কণ আর চুড়ি, কোমরে রুপোর ভারী গেট। বৃদ্ধটি মজিদ মিঞার মা। চোদ্দ পনের বছরের সেই কিশোরীটি তার মেয়ে, নাম রহিমা।
হঠাৎ কী মনে পড়তে অবনীমোহন তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, আচ্ছা মিতা—
মজিদ মিঞা উন্মুখ হল, কী ক’ন?
আমরা যেদিন প্রথম রাজদিয়া আসি সেদিন শুনেছিলাম কার সঙ্গে যেন জমি নিয়ে আপনার ঝগড়া হয়েছে। মামাবাবু সে ঝগড়ার মীমাংসা করে দিয়েছিলেন। ঠিক হয়েছিল, যার সঙ্গে ঝগড়া তার ছেলের সঙ্গে আপনার মেয়ের বিয়ে হবে। আপনার সেই মেয়ে কোনটি?
এই যে– বলে পেছন ফিরে মজিদ মিঞা ডাকতে লাগল, রহিমা কই রে, রহিমা—
সেই কিশোরীটি একটু পেছনে পড়ে গিয়েছিল, ডাক শুনে সামনে এগিয়ে এল।
প্রথমটা রহিমাকে ভাল করে লক্ষ করে নি বিনু। এবার পরিপূর্ণ চোখে তাকাল। রহিমার গড়ন গোল গোল, গায়ের রং কাঁচা হলুদের মতো, নাকটি একটু বোচাই হবে। চোখ দুটি ভারি সরল আর নিষ্পাপ। জগতের সব কিছুর দিকে তাকিয়ে সে দুটি যেন সর্বক্ষণ অবাক হয়ে আছে। নাকে তার সোনার বেশর, কানে কানফুল। হাতের সোনার চুড়ি গায়ের রঙের সঙ্গে মিশে গেছে।
মজিদ মিঞা বলল, এই মাইয়ার লগে নবু শালার পোলার শাদি দিমু।
বিয়ের কথায় রহিমা ছুটে পালিয়ে গেল।
মজিদ মিঞা আবার বলল, শাদির সোময় আপনেরে আসতে হইব কিলাম। কথা দিছিলেন।
নিশ্চয়ই। আমার মনে আছে।
.
মজিদ মিঞার বাড়িখানা বেশ পরিচ্ছন্ন। ঢালা বড় একটা উঠোন ঘিরে ক’খানা বড় বড় তিরিশের বন্দ’র টিনের ঘর। উঠোনে মোটা মোটা আউশ ধান টাল হয়ে রয়েছে। রাজ্যের পায়রা আর শালিক এসে সোনার দানার মতো শস্য খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। দেখেই মনে হয় সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ি।
বাড়ি এসে মজিদ মিঞা কী করবে, অবনীমোহনদের কোথায় বসাবে যেন ঠিক করে উঠতে পারল না। নিজেই ছুটে গিয়ে একখানা নকশা-করা চিকন্দি পেতে দিল। জলচৌকি আর হাতল ভাঙা খানকতক চেয়ার টেনে নিয়ে এল।
তারপর বাকি দিনটা শুধু গল্প, ঠাট্টা-ঠিসারা, হাসাহাসি। ফাঁকে ফাঁকে কতবার কত রকমের খাবার যে এল!
বিদের আসার খবর কেমন করে রটে গিয়েছিল। কেতুগঞ্জের মুসলমান পাড়া ভেঙে কত লোক যে তাদের দেখে গেল।
মজিদ মিঞার বাড়ি থেকে ছাড়া পেয়ে বিনুরা যখন রাজদিয়া ফিরল তখন নিশুতি রাত।
১.৩৫ লক্ষ্মীপুজোর পর থেকে
লক্ষ্মীপুজোর পর থেকেই রাজদিয়ায় ভাটার টান ধরেছে। যে প্রবাসী সন্তানেরা কয়েক দিনের জন্য এসে শহর সরগরম করে তুলেছিল একে একে স্টিমারে করে তারা চলে যেতে লাগল। কেউ গেল আসামে, কেউ বার্মায়, তবে অধিকাংশরই গন্তব্য কলকাতা।
এর মধ্যে একদিন শিশিররা এলেন। সবাই এসেছেন–শিশির স্মৃতিরেখা রুমা ঝুমা আনন্দ।
খানিক এ গল্প সে গল্পের পর শিশির বললেন, আমরা কাল চলে যাচ্ছি জ্যাঠাইমা—
স্নেহলতা বললেন, কালই যাবি?
হ্যাঁ।
এক বছর পর তো এলি। কটা দিনই বা বাড়িতে থাকলি!
কী করব! সরকারি চাকরি, যেতেই হবে। ছুটিও আর নেই। নিয়মমতো দশমী পর্যন্ত ছুটি, তার পরও এ কদিন থেকে গেলাম। আর থাকলে চাকরিটা যাবে।
শিশিররা কথা বলছিলেন। শুনতে শুনতে হঠাৎ বিনুর চোখে পড়ল, আনন্দ সুনীতিকে কী যেন ইশারা করছে।
একটু পর সুনীতি বেরিয়ে বাগানের দিকে গেল। তার কিছুক্ষণ পর আনন্দও বেরিয়ে পড়ল। উঠোনে খানিক ঘোরাঘুরি করে সেও বাগানের রাস্তা ধরল।
বিনু আর বসে থাকতে পারল না। বিচিত্র এক কৌতূহল যেন তাকে ঘিরে ধরছিল। একসময় সেও উঠে পড়ল।
আশ্বিন মাসের শেষ তারিখে ছিল লক্ষ্মীপুজো। লক্ষ্মী ভাসানের দিন থেকে কার্তিক মাস পড়েছে। আজ তেসরা কার্তিক।
সবে কার্তিকের শুরু, এরই মধ্যে বিকেলের হাওয়ায় হিমের ছোঁয়া টের পাওয়া যায়। রোদের রংও গেছে বদলে। শিউলি ফুলের বোঁটার মতো উজ্জ্বল হলদে আভা আর তাতে নেই, বাসি হলুদের মতো তা মলিন।
বাগানে এসে বিনু দেখতে পেল, সূর্যটা রক্তিম গোলকের মতো পশ্চিম আকাশের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে অনেকখানি নেমে গেছে। বাগানের ভেতর এখন ঘন ছায়া। মাথার ওপর ডালপালা আর পাতার দোয়া, তার ফাঁক দিয়ে টুকরো টুকরো রোদ এসে হাওয়ায় দুলছে।
এই তত বিকেল হল। এরই ভেতর পাখিরা ফিরে আসতে শুরু করেছে। কেউ সারাদিন আকাশে সাঁতার কেটেছে, কেউ মাঠে মাঠে শস্যকণা খুঁজেছে। ক্লান্ত পাখিরা এখন বাগানের গাছে গাছে তাদের সাধের বাসায় ডানা ঝাঁপটাচ্ছে, কিচিরমিচির করছে। চেঁচামেচিতে চারদিক মুখর।
বাগানে এসে বিনু পাখিদের দিকে তাকল না, অনুজ্জ্বল মলিন রোদ লক্ষ করল না, হিমেল হাওয়ার কথা ভাবল না। সে শুধু চনমন চোখে চারদিকে খুঁজতে লাগল। এইটুকু সময়ের ভেতর আনন্দ আর সুনীতি গেল কোথায়?
