তক্ষুনি একখানা জলচৌকি চলে এল। বিনুকে তার ওপর বসিয়ে বুধাই বলল, কী মনে কইরা নাতিবাবু?
বিনু বলল, লক্ষ্মীসরা নিতে এসেছি।
অন্য কাজ ফেলে, সবাইকে বসিয়ে রেখে খুব যত্ন করে একখানা সরা চিত্তির করল বুধাই পাল। গোটা সরাটা একাই আঁকল সে, ছেলেদের কিছুই করতে দিল না।
অন্য খদ্দেররা অসন্তুষ্ট। চাপা গলায় তারা বলতে লাগল, এইটা ক্যামন বিচার। আমরা এতক্ষণ বইসা আছি–
বুধাই পাল বলল, বিচার টিচার বুঝি না। হ্যামকত্তার নাতি আইছে। তারটা আগে কইরা দিতেই হইব। যদি তোমরা গুসা (রাগ) কর, আমার কিছুই করনের নাই।
লোকগুলো কেউ আর কিছু বলল না।
সরাটা আঁকা হলে বিনুর হাতে দিতে দিতে বুধাই পাল বলল, ধরেন নাতিবাবু—
হাতে নিয়ে বিনু অবাক। লক্ষ্মীর ছবিই না, বুধাই পাল সরার ওপর দুর্গা মূর্তিও এঁকেছে। অবশ্য কার্তিক-গণেশ-সরস্বতীর মতো লক্ষ্মীও তাতে আছে। বিনু বলল, এ কি, এটা যে দুর্গা ঠাকুর।
বুধাই পাল হাসল, হ, দুগগাঠাকুরই। কোজাগরীতে আপনের দাদুর বাড়ি এই সরাই পূজা হয়।
কিন্তু–
কী?
আমি দেখলাম, কাউকে কাউকে শুধু লক্ষ্মী এঁকে দিলেন–
তাগো হেই নিয়ম। হ্যামকত্তার বাড়ির নিয়ম হইল কোজাগরীতে দুগ্গামূত্তি পূজা। আপনে নিচ্চিন্ত মনে লইয়া যান–
লক্ষ্মীসরা নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর। পুকুরঘাটে নেমে বাগান আর বাইরের দিকের উঠোন পেরিয়ে সবে বিনু ভেতর-বাড়িতে পা দিয়েছে, সুরমা ছুটতে ছুটতে এসে তার কান টেনে ধরলেন, হারামজাদা বাঁদর–
এইরকম একটা অভ্যর্থনা কল্পনাই করে নি বিনু। প্রথমটা হতভম্ব, তার পরেই চেঁচিয়ে উঠল, কী করেছি আমি? কী করেছি?
কী করেছি? বলেই এক চড় কষালেন সুরমা, কেন, কেন তুই ঝিনুককে নিয়ে গেলি না? জানিস না মেয়েটার কত কষ্ট!
বিনু লক্ষ করল, মায়ের ঠিক পিছনেই ঝিনুক দাঁড়িয়ে। রাজদিয়াতে আসার দিন থেকেই মেয়েটার প্রতি মায়ের পক্ষপাতিত্ব। নিশ্চয়ই এমন করে সে লাগিয়েছে যাতে মা রেগে গেছেন।
ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে মাথার ভেতরটা যেন জ্বালা করতে লাগল বিনুর, তারপরেই লজ্জায় অপমানে চোখের মণিদু’টো ফেটে জল বেরিয়ে এল।
আরও দু-চারটে চড়টড় হয়তো পড়ত, তার আগেই এ ঘর ও ঘর থেকে সুধা-সুনীতি-স্নেহলতা শিবানী–সবাই ছুটে এলেন। সুরমার হাত থেকে বিনুকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে স্নেহলতা বকাবকি করতে লাগলেন, এই পুজোর দিনে ছেলেটার গায়ে হাত তুললি! কী যে তোদের রাগ, বুঝি না। ঝিনুককে দেখিয়ে বললেন, আর ওই এক মেয়ে হয়েছে—
.
সন্ধের পর চন্দনের পাটার মতো কোজাগরীর পরিপূর্ণ চাঁদ উঠল। আলোয় আলোয় চরাচর ভেসে যেতে লাগল। তার একটু পর এল পুরুত। আয়োজন সম্পূর্ণ করে রেখেছিলেন স্নেহলতা। পুরুত এসেই পুজোয় বসে গেল।
পুজোটুজো হয়ে গেলে প্রসাদ বিতরণের পালা। রাতদুপুর পর্যন্ত রাজ্যের লোক এসে প্রসাদ খেয়ে গেল।
একটা ব্যাপার বিনু লক্ষ করেছে, দুপুরবেলা সেই মারধোরের পর থেকে সারাদিন অপরাধীর মতো মুখ করে তার পেছনে ঘুর ঘুর করেছে ঝিনুক। বিনু কিন্তু নিজের মনকে পাষাণ করে ফেলেছে, একটি কথাও বলে নি। চোখাচোখি হলে তক্ষুণি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যতই ঘুরুক, যতই মুখ চুন করে থাকুক, বিনু আর তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।
রাত্রিবেলা এক বিছানায় শুয়ে ঝিনুক ফিসফিস করে ডাকল, বিনুদাদা—
বিনু সাড়া দিল না।
ঝিনুক বলতে লাগল, আর কক্ষণো মাসিমার কাছে তোমার নামে কিছু বলব না।
বিনু এবারও চুপ।
ঝিনুক কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলবে না?
উত্তর না দিয়ে বিনু ঝিনুকের দিক থেকে এ পাশ ফিরে শুল।
১.৩৪ লক্ষ্মীপুজোর পরদিন
লক্ষ্মীপুজোর পরদিন বিনুদের কেতুগঞ্জে যেতে হল।
দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পর বিনুঝিনুক-অবনীমোহন-সুধা-সুনীতি-হেমনাথ আর সুরমা নৌকোয় উঠলেন। নৌকোটা বেয়ে যাবে যুগল আর করিম।
বিনুরা রাজদিয়া আসবার দিনটি থেকে মজিদ মিঞা কতবার যে হেমনাথের বাড়ি এসেছে তার হিসেব নেই। যতবার এসেছে ততবারই অবনীমোহনকে বলেছে, আমাগো বাড়িত কবে যাইবেন মিতা?
অবনীমোহন বলেছেন, শিগগিরই একদিন যাব।
যাব যাব করেও যাওয়া হচ্ছিল না, রোজই একটা না একটা বাধা এসে পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত মজিদ মিঞা ক্ষোভে-দুঃখে রাজদিয়া আসা বন্ধই করে দিয়েছে। তার অভিমান ভাঙাবার জন্য আজ অবনীমোহনের না বেরিয়ে উপায় ছিল না।
.
চারদিকে অথৈ জলের মাঝখানে কেতুগঞ্জ গ্রামটা দ্বীপের মতো ভেসে আছে। মাইলের পর মাইল ধানবন, পদ্মবন, শাপলাবন আর জলমগ্ন প্রান্তর পেরিয়ে বিনুরা যখন সেখানে পৌঁছল, রোদের রং বদলে হলুদ হয়ে গেছে। হাওয়ায় টান ধরতে শুরু করেছে। সূর্যটা পশ্চিমের আকাশ বেয়ে অনেকখানি নেমে এসেছে। এখন বিকেল।
আগে থেকেই খবর দেওয়া ছিল। যুগলরা ঘাটে নৌকো ভেড়াতেই মজিদ মিঞা ছুটে এল। তার পেছনে নতুন জামা টামা পরা একদল ছেলেমেয়ে, নাক পর্যন্ত ঘোমটা টানা এক প্রৌঢ়া, চোদ্দ পনের বছরের এক কিশোরীও এসেছে। তাদের সঙ্গে এসেছে এক বৃদ্ধ, গায়ের চামড়া তার কোচকানো, চুল পাটের ফেঁসোর মতো, চোখে পুরু সরের মতো ছানি, ঠোঁট দুটি কিন্তু পানের রসে টুকটুকে যেন টিয়াপাখির ঠোঁট।
পরম সমাদরের গলায় মজিদ মিঞা বলল, আসেন আসেন। সুধা-সুনীতি-বিনুর দিকে তাকিয়ে বলল, আসো গো মায়েরা, বাবারা–
