আবার আগের মতো ঘাড় কাত করল বিনু, হুঁ–
স্নেহলতা এবার কাজের কথায় এলেন, একবার কুমোরপাড়ায় তোকে যেতে হবে দাদাভাই। বুধাই পালকে চিনিস তো। তাদের বাড়ি।
কেন?
আজ পুজো। লক্ষ্মীসরা আনতে হবে না?
লক্ষ্মীসরা কী দিদা?
কুমোরপাড়ায় গেলেই দেখতে পাবি। বুধাই পালকে বলবি, ভাল দেখে যেন সরা দেয়। বুঝলি?
আচ্ছা। এক্ষুনি যাব?
যা বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল। একটু থেমে কী ভেবে নিলেন স্নেহলতা, তারপর বললেন, পাঠাব তো। কিন্ত যুগলটা ওদের সঙ্গে হাটে গেল।
বেরুবার মুখে পাছে বাধা পড়ে যায়, সেই ভয়ে বিনু তাড়াতাড়ি বলে উঠল, বুধাই পালের বাড়ি আমি চিনি, ঠিক চলে যেতে পারব।
কুমোরপাড়ায় দু’ভাবে যাওয়া যায়। নৌকোয় করে কিংবা পায়ে হেঁটে। হেঁটে গেলে অনেকখানি ঘুরতে হবে–সেই স্টিমারঘাটা বরফ কল, মাছের আড়ত বাঁয়ে ফেলে মাইলখানেক পাড়ি দিলে তবে কুমোরপাড়া। বিনু হেঁটে যাবার কথাই ভাবছিল।
স্নেহলতা বললেন, কিভাবে যাবি?
হেঁটে।
না–না। অতখানি রাস্তা হেঁটে যাওয়া-আসা সোজা নাকি। তোকে পাঠিয়ে শেষে একটা বিপদে পড়ি।
বিনু কী বলতে যাচ্ছিল, এই সময় এ বাড়ির দ্বিতীয় কামলা করিম এসে হাজির। তাকে পেয়ে সমস্যাটার সমাধান হয়ে গেল।
স্নেহলতা বললেন, এই করিম, তোর এখন কী কাজ?
করিম জানালো, বাগানের দক্ষিণ কোনায় যে লেবুবতী আমের গাছটা বাজে পুড়ে ভূতের চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা কেটে ফেলতে হবে। হেমনাথ তাই বলে গেছেন। গাছটা কাটবার জন্য একটা কুড়ুল যোগাড় করতে ভেতর-বাড়িতে এসেছিল সে।
স্নেহলতা বললেন, এখন তোর গাছ কাটতে হবে না। বিনুকে নিয়ে নৌকোয় কুরে একটু কুমোরপাড়ায় যা।
করিম চোখেমুখে ভয় ফুটিয়ে বলল, আরে সব্বনাশ।
কী হল?
গাছ না কাইটা অহন যদিন কুমারবাড়ি যাই, বড়কত্তায় আইসা আমারে শ্যাষ করব।
কিছু করবে না। তুই যা।
আপনে কিন্তুক দায়ী রইলেন। বড়কত্তায় যদিন কিছু কয় আপনে আমারে বাঁচাইবেন।
স্নেহলতা বললেন, আচ্ছা, সে ভাবনা তোকে করতে হবে না। যা বলবার আমি তাকে বলব’খন। বিনুকে বললেন, যা দাদাভাই ওর সঙ্গে–
ছুটে দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় চলে গেল বিনু। বইপত্র ছত্রাকার হয়ে ছিল। সেগুলো গুছিয়ে রেখে বেরুতে যাবে, সেই সময় কোত্থেকে ঝিনুক এসে পড়ল। তীক্ষ্ণ ধারাল চোখে বিনুকে দেখতে দেখতে বলল, কোথায় যাচ্ছ?
কুমোরবাড়ি। বলেই করিমের সঙ্গে চলতে শুরু করল বিনু।
কেন?
লক্ষ্মীসরা আনতে।
আমি যাব তোমার সঙ্গে।
না।
হ্যাঁ যাব।
মেয়েটা যেন আঠার মতো সব সময় পেছনে লেগে আছে। যেখানেই বিনু যাক, যা-ই করুক– তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিচ্ছু হবার উপায় নেই। মনে মনে খুব বিরক্ত হচ্ছিল বিনু। বলল, না।
ঝিনুক সঙ্গ ছাড়ল না। পেছনে ছুটতে ছুটতে বলতে লাগল, নিয়ে চল না, নিয়ে চল না—
বিনুর সেই এক উত্তর, না।
আশায় আশায় পুকুরঘাট পর্যন্ত এল ঝিনুক। কিন্তু যখন দেখল সে উঠবার আগেই বিনুরা তাড়াতাড়ি উঠে নৌকো ছেড়ে দিয়েছে তখন কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে জড়ানো গলায় বলল, সেই কথাটা তোমার মাকে বলে দেব।
সেই কথাটা বলতে জলে ডোবার ব্যাপারটা। বার বার একই অস্ত্র দেখিয়ে মেয়েটা তাকে হাতের মুঠোয় পুরে রাখবে, তা তো আর হয় না। তা ছাড়া অনেক দিন হয়ে গেছে, সেই ব্রহ্মাস্ত্রের ধারও আর তেমন নেই। তাচ্ছিল্যের সুরে বিনু বলল, বল গে–
কুমোরপাড়ার কাছাকাছি আসতেই বিনুরা দেখতে পেল, খালপাড়ে কত নৌকো যে এসে জমেছে তার লেখাজোখা নেই।
বিনু অবাক। শুধলো, এত নৌকো কিসের করিম?
করিম বলল, মনে লাগে, পিতিমা টিতিমা নিতে আইছে।
খালের ধারে সারি সারি বইন্যা গাছ। তাদের একটার ডালে নৌকো বেঁধে করিম আর বিনু ওপরে উঠে এল।
কুমোরপাড়ায় ঢুকতেই দেখা গেল, মেলা বসে গেছে। দূরদূরান্ত থেকে কত মানুষ যে লক্ষ্মীসরা কিনতে এসেছে! পটুয়াদের ঘিরে ধরে সমানে তাড়া দিয়ে যাচ্ছে। কেউ বলছে, পালমশয় আমারে আগে দ্যান—
আরেক জন অমনি বলে উঠল, না পালমশয়, আমারে আগে। হেই ভোর রাইতে আইছি, বেলা দুফার হইতে চলল।
অন্য একজন বলল, পালমশয়, আমার কথাখান বিবেচনা করেন। আমারে যাইতে হইব হেই গিরিগুঞ্জে। যাইতে যাইতে বিকাল হইয়া যাইব।
পটুয়ারা কেউ বসে নেই, রং তুলি দিয়ে বড় বড় মাটির সরার উলটো পিঠে লক্ষ্মীর চিত্র এঁকে চলেছে। ঝড়ের গতিতে তাদের হাত চলছে। এত ব্যস্ততা যে হুঁকোতে দুটো টান দেবারও ফুরসত পাচ্ছে না।
বুধাই পালের বাড়িতেও সেই একই দৃশ্য। তাকে ঘিরে প্রায় শ’খানেক লোক উদ্গ্রীব বসে আছে।
বুধাই পাল তার তিন ছেলেকে নিয়ে সরা চিত্তির করছিল। একা কেউ সবটা করছে না। কেউ হয়তো হাত-পা মুখ আঁকছে, কেউ চোখ ফোঁটাচ্ছে, কেউ পাচাটা বসাচ্ছে। প্রথম ছেলের হাত থেকে দ্বিতীয় ছেলের হাতে, তারপর তৃতীয় ছেলের হাত ঘুরে বাপের কাছে এসে ছবিটা সম্পূর্ণ হচ্ছে।
একেকটা সরা শেষ হলে তৎক্ষণাৎ সেটা কিনে নিয়ে একেক জন খদ্দের চলে যাচ্ছে। বিনুরা একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। সরা থেকে যে চোখ তুলবে তেমন ফাঁকই পাচ্ছে না বুধাই পাল। পেলে নিশ্চয়ই তাদের দেখতে পেত।
কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকা যায়? করিম হঠাৎ ডাকল, পালমশয়–
এবার তাকাল বুধাই পাল। তাকিয়েই বিনুকে দেখে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ওরে ক্যাঠা আছস। রে, একখান জলচকি লইয়া আয়। হ্যামকত্তার নাতি আইছে।
