হেমনাথ বলেছিলেন, কে বললে? এখন থেকেই তো আসল কাজ শুরু।
কিরকম?
তুমি ডাক্তার তো?
হ্যাঁ।
এ দেশ বড় গরিব। বিনা চিকিৎসায়, বিনা ওষুধে ভুগে ভুগে কত মানুষ যে প্রতিদিন মরে যাচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে হাটে-হাটে ঘুরে তাদের সেবা শুরু কর। দেখবে কাজের অন্ত নেই।
ঈশ্বরের নির্দেশ যেন হেমনাথের মধ্যে দিয়ে এসে গিয়েছিল। লারমোর তার পথ খুঁজে পেয়েছিলেন।
তারপর কত বছর কেটে গেছে। পূর্ব বাংলার গাছপালা, শস্যপূর্ণ মাঠ, নদী, বন, মনোহর পাখির ঝাক, এখানকার মানুষ, তাদের সুখদুঃখ, শোক-উৎসব–সমস্ত একাকার হয়ে লারমারকে যেন মগ্ন করে রেখেছে।
কাহিনী শেষ করে লারমোর হাসলেন, এই আমার জীবন। অতি সামান্য, অতি তুচ্ছ। নিশ্চয়ই তোমাদের ভাল লাগল না।
কেউ কোনও কথা বলল না, অভিভূতের মতো সবাই বসে থাকল
এদিকে সূর্যটা কখন যে খাড়া মাথার ওপর এসে উঠেছে সেদিকে চোখ পড়তেই লারমোর চঞ্চল হলেন, চল চল। ঢের বেলা হয়ে গেছে। চান টান সেরে নেওয়া যাক।
১.৩৩ রাজদিয়ায় দুর্গাপুজো
রাজদিয়ায় দুর্গাপুজোর চাইতে লক্ষ্মীপুজোর সমারোহ অনেক বেশি। সারা শহরে দুর্গাঠাকুর আর ক’টা? বারোয়ারি-টারোয়ারি ধরে মোট সাতখানা। আর লক্ষ্মীপুজো? তার লেখাজোখা নেই। বারুইপাড়ায় যুগীপাড়ায় বামুন পাড়ায় কায়েতপাড়ায় সারা রাজদিয়াতে যেখানে যত বাড়ি, সব জায়গায় কোজাগরী পূর্ণিমার দিন ঘরদোর নিকিয়ে আলপনা এঁকে লক্ষ্মী এনে বসানো হয়। এখানে ঘরে ঘরে লক্ষ্মীবন্দনা। ধন-সম্পদ আর পরিপূর্ণতার এই দেবীর আরাধনা করতে কেউ ভোলে না।
রাজদিয়ায় দুর্গাপুজো হয় প্রতিমা বানিয়ে। লক্ষ্মীর বেলা কিন্তু অন্য নিয়ম। কেউ জলপূর্ণ ঘটে আম্রপল্লব আর শিষওলা ডাব বসিয়ে, তাতে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে পুজো সারে। তবে বেশির ভাগ। লোকই কুমোরপাড়া থেকে লক্ষ্মীসরা কিনে আনে, জলচৌকি কিংবা মাটির বেদির ওপর বসিয়ে তার পুজো হয়।
বিনুরা লারমোরের গির্জায় গিয়েছিল একাদশীর সকালে। মাঝখানে তিনটে দিন। তারপরই কোজাগরী পূর্ণিমা অর্থাৎ লক্ষ্মীপুজো এসে গেল।
মাঝের তিনদিন নিশ্বাস ফেলার সময় ছিল না স্নেহলতার। শুধু কি স্নেহলতার? শিবানী-উমা গৌরদাসী, এ বাড়ির মানুষগুলো নাইতে-খেতে এমন কি চোখের পাতা এক করতেও ভুলে গিয়েছিল।
কাজ কি একটুখানি? দেড় মণ চালের মুড়ি ভাজা হয়েছে এর ভেতর, আধ মণ ধানের খই। চিড়েও কোটা হয়েছে মণখানেক। তার ওপর তিলের নাড়, ক্ষীরের নাড়, মুগের নাড়, নারকেলের সন্দেশ-চন্দ্রপুলি-ছাপা, মুড়ি-চিড়ে-খইয়ের মোয়া–এসব তো আছেই।
.
লক্ষ্মীপুজোর দিন সকালবেলা উঠেই ঘরদোর বোয়ামোছা শুরু করলেন স্নেহলতা। অবনীমোহন আর হেমনাথকে পুজোর বাজার করতে পাঠালেন সুজনগঞ্জের হাটে। বার বার বলে দিলেন হাটে গিয়ে যেন ফেরার কথা ভুলে না যান হেমনাথ। বিকেলের ভেতর এসে না পৌঁছলে পুজোই হবে না।
হেমনাথরা চলে গেলে স্নেহলতা সুধা সুনীতিকে ডাকলেন, এই যে দিদিভাইরা, তোদের কিন্তু আজ অনেক কাজ–
সুধা সুনীতি বলল, কী কাজ দিদা?
চালের গুঁড়ো গুলে রেখেছি, তাই দিয়ে সারা বাড়ি আলপনা দিতে হবে।
ওরে বাবা—
কী হল?
সুধা সুনীতি একসঙ্গে হাত নেড়ে বলতে লাগল, ওসব আমরা পারব না।
পারবি না কিরকম? চোখ কুঁচকে স্নেহলতা তাকালেন। একটু অপ্রসন্নই হেয়েছেন তিনি, পারতেই হবে–
বা রে–
কী?
আমরা কোনওদিন আলপনা দিয়েছি নাকি?
না দিয়েছিস বেশ করেছিস। এখন দিতে হবে। স্নেহলতা বলতে লাগলেন, কলকাতায় থেকে থেকে তো মেমসাহেব হয়ে উঠেছ। যতই যাই হও, নাচো আর গাও, উর্দু পড় আর ফারসি পড় বাঙালির ঘরের মেয়ে তো। পুজোআর্চা, সংসারের কাজ, এ সব শিখতেই হবে। মেমসাহেবি করে দিন কাটালে চলবে না।
সুধা সুনীতি কিছু বলল না।
স্নেহলতা আবার বললেন, আমার কাছে যখন এসেই পড়েছ তখন আর নিস্তার নেই। দুপুরবেলা আমি আলপনা দিতে বসব। দেখে দেখে শিখে নেবে, বুঝলে?
সুধা-সুনীতি একসঙ্গে ঘাড় কাত করল, আচ্ছা।
আরেকটা কথা—
কী?
সকালবেলা কিছু খেয়েছিস?
না।
ভালই হয়েছে। কিছু খাস টাস নি। একেবারে পুজো হয়ে গেলে খাবি।
সুধা সুনীতি আঁতকে উঠল, পুজো তো হবে সেই রাত্তিরে!
স্নেহলতা তাকালেন, হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে?
অতক্ষণ উপোস দিয়ে থাকতে হবে?
কতক্ষণ আর, একটা বেলা তো মোটে।
দুই বোনে নাকে-কান্না জুড়ে দিল, রাত পর্যন্ত না খেয়ে থাকলে মরে যাব, এক্কেবারে মরে যাব।
স্নেহলতা ওদের কান্ড দেখে হেসে ফেললেন, মরে যাবি কি বেঁচে থাকবি দেখা যাবে’খন।
সুধা সুনীতির কাঁদুনির মধ্যে স্নেহলতা গলা তুলে ডাকলেন, বিনু—বিনু—বিনুদাদা–
ভেতর-বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে স্নেহলতারা কথা বলছিলেন, আর বাইরের দিকে দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় বসে পড়ছিল বিনু। সেখান থেকে স্নেহলতাদের দেখতে পাচ্ছিল সে। কথাবার্তাও শুনতে পাচ্ছিল।
স্নেহলতার ডাক কানে যেতেই বিনু ছুটে এল। বলল, কী দিদা?
আজ আর পড়তে হবে না।
বিনু ভারি খুশি, তার চোখ চকচক করতে লাগল।
স্নেহলতা বললেন, একটা কাজ করতে পারবি?
কী কাজ না জেনেই বিনু তক্ষুনি রাজি। মাথা অনেকখানি হেলিয়ে বলল, হুঁ-উ উ—
হুঁ তো করলি। আমি যদি বলি আকাশের চাঁদ পেড়ে এনে দে, পারবি?
আহা–
আহা কী?
তুমি অমন কথা বলবেই না।
আমার ওপর খুব বিশ্বাস দেখছি।
