হেমনাথ ঘাড় কাত করেছিলেন আছি। আপনি?
ওই একরকম। আপনাকে কিন্তু চার্চে খুব আশা করেছিলাম। রোজই ভেবেছি, আসবেন। আসেন নি।
বিব্রতভাবে হেমনাথ বলেছিলেন, বাড়ির ক’টা কাজে আটকে গিয়েছিলাম। দু’একদিনের ভেতর ঠিক যাব।
লারমোর বলেছিলেন, বুঝতেই পারেন, এদেশে নতুন এসেছি। আপনজন কেউ নেই। ফাদার পারকিন্স ছিলেন, তিনি তো মারাই গেছেন। চার্চে যতক্ষণ থাকি একরকম মুখ বুজে থাকতে হয়। আপনাকে কেন জানি সামান্য আলাপেই বন্ধু বলে ভাবতে শুরু করেছি।
নিশ্চয়ই ভাববেন। দেখবেন, এরপর থেকে চার্চে এতবার হানা দেব যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠবেন।
দেখা যাবে।
একটু চুপ। তারপর সামান্য দ্বিধার সুরে লারমোর বলেছিলেন, একটা ব্যাপার জানতে ইচ্ছে করছে।
স্বচ্ছন্দে।
আমি যখন হাটের লোকগুলোর কাছে প্রভু যিশুর কথা, বাইবেলের কথা বলছিলাম তখন হাসছিলেন কেন?
এমনি।
না, এমনি না। কারণ আছে।
হেমনাথ স্বীকার করেছিলেন, আছে।
কী সেটা? জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছিলেন লারমোর।
তার আগে বলুন আপনি এদেশে কী করতে এসেছেন?
ধরুন প্ৰিচ করতেই।
তাহলে বলব আপনার আসাটা পুরোপুরি বিফলে যাবে।
কেন? লারমোরের চমক লেগেছিল।
হেমনাথ বলেছিলেন, যে ভাষায় আপনি ওদের বোঝাতে চাইছেন সেটা ওদের ভাষা নয়। ওরা তা বোঝে না।
কিন্তু–
বলুন।
এটা তো বাংলা ভাষাই।
একশ’ বার।
তবে?
হেমনাথ বলেছিলেন, তাহলে পরিষ্কার করেই বলি। ধরুন আমি বাঙালি। এই হাটে যত মানুষ। আছে তারাও বাঙালি। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। যতখানি ভাবতে পারি, বুঝতে পারি, ওরা নিশ্চয়ই তা পারে না। সাধারণ মানুষের নিজস্ব ভাষা আছে। তাদের বোঝাতে হলে সেটা জানা দরকার। সেটা না জানলে ওদের কাছে পৌঁছনো যাবে না।
কিন্তু–
কী?
শুনেছি, ফাদার পারকিন্সও এখানে কুড়ি বছরের মতো কাটিয়েছেন। তিনিও ওই ভাষাতেই প্ৰিচ করতেন। আপনার কি ধারণা, কুড়ি বছর ধরে তিনি ভুল করে গেছেন?
উত্তর না দিয়ে একটা হাটুরে লোককে ডেকে এনেছিলেন হেমনাথ। জিজ্ঞেস করেছিলেন, পাদ্রীসাহেব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে যা বলছিলেন, বুঝতে পেরেছি?
লোকটা মাথা নেড়েছে, আইজ্ঞা না। বড় পাত্রীও (পারকিন্স) এইরকম খটর মটর কইরা কী জানি কইত। কার বাপের সাইধ্য বোঝে।
আচ্ছা, তুমি যাও।
লারমোরের চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে গিয়েছিল যেন। লোকটা চলে গেলে বলেছিলেন, এই জন্যেই বুঝি তখন মিটিমিটি হাসছিলেন।
হেমনাথ ঘাড় হেলিয়ে বলেছিলেন, হ্যাঁ।
কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষা শিখব কী করে?
তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। তাদের প্রতিদিনের সুখদুঃখের ভাগীদার হতে হবে। তবেই শেখা যাবে।
লারমোর এবার নীরব থেকেছেন।
হেমনাথ আবার বলেছিলেন, ফাদার পারকিন্স সম্বন্ধে আমার কী ধারণা জানেন?
কী?
কুড়ি বছর প্ৰিচ করেও খুব একটা কিছু উনি করতে পারেন নি।
লারমোর চুপ।
হেমনাথ থামেন নি, এই প্রিচিঙের ব্যাপারে আমার একটা কথা মনে হয়।
কী কথা?
বলতে গিয়েও থেমে গিয়েছিলেন হেমনাথ। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেছিলেন, আপনার সঙ্গে সবে আলাপ হয়েছে, এক্ষুণি বললে আপনি আহত হবেন, ভুলও বুঝতে পারেন। তাই এখন নয়, তেমন বুঝলে পরে বলব।
পরেই বলেছিলেন। ততদিনে লারমোরের সঙ্গে বন্ধুত্বের রং পাকা হয়ে গিয়েছিল। ভুল বোঝার অবকাশ আর ছিল না। দিনে তিন বার করে তখন তিনি চার্চে আসতেন। আপনি’ থেকে কবে যে সম্বোধনের ভাষাটা তুমি’তে নেমেছিল, নিজেদেরই খেয়াল নেই।
হেমনাথ বলেছিলেন, আমার কী মনে হয় জানো, এই প্রিচিঙের কোনও প্রয়োজন নেই।
ভ্রূ ছোট করে লারমোর শুধিয়েছিলেন, কেন?
এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্মে নিয়ে মানুষের এক উপকার করা যায় বলে আমার মনে হয় না।
কিন্তু–
কী?
খ্রিস্টধর্ম জগতের সব চাইতে সেরা ধর্ম, এটা তো তুমি মানবে।
খ্রিস্টধর্ম সম্বন্ধে আমার অসীম শ্রদ্ধা। কিন্তু কোনও ধর্মের চাইতে কোনও ধর্ম খাটো, এ আমি মানি না।
অনেক তর্কাতর্কির পর হেমনাথ বলেছিলেন, তুমি অন্য ধর্ম সম্বন্ধে কতটুকু জানো?
কিছু কিছু জানি।
আমার কাছে অনেক বই আছে, ভাল করে পড়ে দেখ। দেখবে কোনও ধর্মই অ্যান্টি-হিউম্যান নয়।
বেশ, বইগুলো দিও।
অন্য ধর্ম সম্বন্ধে লারমোরের ধারণা ছিল ভাসা ভাসা, অস্বচ্ছ। বইগুলো পড়বার পর তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে আলোড়ন শুরু হয়ে গিয়েছিল। চোখের মণিতে নতুন ছটা এসে লেগেছিল যেন। মনে হয়েছিল, প্রিচিঙ নিরর্থক। যুগযুগান্ত ধরে আপন পিতৃপুরুষের ধর্মবোধ নিজের অস্তিত্বে ধারণ করে মানুষ হয়তো পরম শান্তিতে আছে, তাকে উন্মুল করে অন্য মাটিতে স্থাপন করতে যাওয়া ঠিক নয়। সম্ভবত তা নিষ্ঠুরতাও। লারমোর স্থির করেছিলেন, আর প্রিচিঙ করবেন না। অন্যভাবে মানুষের কল্যাণের কথা ভাববেন। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে, আলাদা কথা।
সিদ্ধান্তটা নেবার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ ঘটেছিল। কলকাতার মিশন এখানকার গ্রান্ট বন্ধ করে দিয়েছিল। সে কথা হেমনাথকে বলতেই একখানা উষ্ণ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তার বাবা তখনও জীবিত। বাবাকে বলে চার্চের নামে পাঁচিশ বিঘে জমি লিখে দিয়েছিলেন। ওই জমি থেকেই চার্চের খরচ চলবে।
লারমোর বলেছিলেন, খাওয়া-পরার ব্যাপারে তো নিশ্চিন্ত করলে। কিন্তু আরেক দিক থেকে যে ভাবনা বাড়ল। প্রিচিঙ ছিল, তবু একটা কাজের মধ্যে থাকতাম। এখন থেকে যে একেবারে নৈষ্কর্ম ব্রত।
