লারমোর বলতেন, আজ্ঞে আমরা মিশনারি। মানুষের কল্যাণের জন্যে, তাদের সেবা করতে–
বাধা দিয়ে ফাদার পারকিন্স বলতেন, সেবা টেবা তো আছেই। আরও একটা বড় ব্যাপার আছে।
কী?
প্রিচিঙ। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে অন্ধকারের বাসিন্দারা কিলবিল করে বেড়াচ্ছে। তাদের আলোকমন্ত্রে দীক্ষা দিতে হবে। সেই জন্যেই আমরা মিশনারিরা সারা ওয়ার্ল্ডে ছড়িয়ে পড়েছি। যেখানে যতদূরে যে মানুষই থাক, প্রভুর বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দিতেই হবে। বলতে বলতে উঠে দাঁড়াতেন ফাদার পারকিন্স, দেখে কিভাবে প্ৰিচ করতে হয়, কিভাবে সন্স অফ সিনারদের আলোকের মাঝখানে নিয়ে আসতে হয়। দেখে দেখে শেখো। এরপর তোমাকেও এভাবে প্রিচ করতে হবে।
লারমোর কিছু বলতেন না; অসীম কৌতূহলে তাকিয়ে থাকতেন।
এবার আর লারমারের দিকে নজর থাকত না ফাদার পারকিন্সের। নদীর চর কিংবা হাটের জনতাকে ডেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতেন, আইস আইস পাপাচারীর সন্তানেরা, তোমাদের আমি আলোকের পথে লইয়া যাইব। প্রভু যিশুই সেই আলোক, যিশুই পথ। নিজের রক্তে তিনি এই জগৎকে শুচি করিয়া গিয়াছেন। এইভাবে অনেকক্ষণ চেঁচাবার পর হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়তেন। লারমোরকে বলতেন, দেখলে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ। লারমোর মাথা নাড়তেন।
আমার বয়েস হয়েছে, বেশিক্ষণ চেঁচাতে পারি না। বাংলা ভাষাটা তো কাজ চালাবার মতো শিখেছ। এবার তোমাকেই কিন্তু প্ৰিচ করতে হবে।
আচ্ছা–
আসার সময় থলে বোঝাই করে মথি আর লুক লিখিত সুসমাচার আনা হতো, নির্দেশমতো হাটুরে অথবা চরের মানুষদের হাতে হাতে বিলিয়ে দিতেন লারমোর।
এইভাবে মাস পাঁচেক কাটল। তারপর ফাদার পারকিন্স নিজের সম্বন্ধে যা আশঙ্কা করেছিলেন তা-ই ঘটল। তিনদিনের ধুম জ্বরে মারা গেলেন।
ফাদার পারকিন্সের মৃত্যুর পর রাজদিয়া গির্জার সব দায়িত্ব এসে পড়ল লারমোরের হাতে। পারকিন্স যেমন যেমন শিখিয়েছিলেন, প্রথম প্রথম তাই করতেন লারমোর। চার্চের সম্পত্তি দুটো নৌকো আর একখানা ফিটন ছিল। ফিটন চালাত কাদের। এখানে আসা থেকেই কাদেরকে দেখেছেন লারমোর, সে তার দীর্ঘকালের সহচর। খরার দিনে ফিটন, নইলে নৌকো করেই প্রচার করতে বেরুতেন লারমোর। সুজনগঞ্জে, কমলাঘাটে কি রসুলপুরের হাটে কিংবা নদীর চরে চরে ঘুরে তিনি চেঁচাতেন, ওই মহাপ্রলয় আসিল, ওই ঘন ঘন বজ্রপাত হইতে লাগিল। আইস আইস’
চিৎকারের পর সুসমাচার বিতরণ। তারপর চার্চে ফিরে আসা।
এই নিয়মেই দিন যাচ্ছিল, দিন আসছিল। এর মধ্যে হঠাৎ একটা মজার ব্যাপার ঘটল।
সেদিন সুজনগঞ্জে প্ৰিচ করছিলেন লারমোর। কৌতূহলী জনতা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল।
যথারীতি আলোকমন্ত্রে দীক্ষার কথা বলে সুসমাচার বিলি করতে শুরু করলেন লারমোর। লালচে কাগজে ছাপা চার পৃষ্ঠার পুস্তিকাগুলো প্রতি হাটেই তিনি নিয়ে যান। সবাই হাত পেতে নেয়, কিছু বলে না। সেদিন কিন্তু কালো দোহারা চেহারার একটি যুবক, তারই সমবয়সী হবেন, সুসমাচারটা নিয়ে বললেন, আপনি বুঝি এখানে নতুন?
থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন লারমোর। ছ’আট মাস প্ৰিচ করছেন, সুজনগঞ্জের হাটে তার চারধারে যারা ভিড় জমায় তাদের সকলেই তার মুখচেনা। জনতার মধ্যে যুবকটিকে আগে আর কখনও দেখেন নি।
লারমোর বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি নতুন। ক’মাস হল, এ দেশে এসেছি।
তাই হবে। মাসকয়েক আমি এখানে ছিলাম না। থাকলে আগেই আপনার সঙ্গে আলাপ হতো। আপনি নিশ্চয়ই রাজদিয়ার চার্চে আছেন?
হ্যাঁ।
তা একা প্ৰিচ করতে বেরিয়েছেন যে? ফাদার পারকিন্স কোথায়?
ফাদার পারকিন্সকে আপনি চেনেন!
চিনি বৈকি। আমাদের অনেক দিনের পরিচয়। উনি আমাকে খুব স্নেহ করেন।
একটু চুপ করে থেকে লারমোর বলেছিলেন, ফাদার পারকিন্স নেই।
যুবকটি যেন চকিত হয়ে উঠেছিলেন, মানে!
মাস চারেক হল মারা গেছেন।
আক্ষেপের সুরে যুবক বলেছিলেন, উনি মারা গেলেন, অথচ আমি জানতেই পারি নি। ওঁর কাছে কত আবদার করেছি, কত উৎপাত করেছি– বলতে বলতে থেমে গিয়েছিলেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর লারমোরই জিজ্ঞেস করেছিলেন, এখানে আপনি কোথায় থাকেন? রাজদিয়ায়। রাজদিয়ার দক্ষিণ দিকের শেষ বাড়িখানা আমাদের।
তবে তো ভালই হল। মাঝে মাঝে চার্চে আসবেন।
নিশ্চয়ই আসব।
একটু ভেবে লারমোর বলেছিলেন, আপনার সঙ্গে আলাপ টালাপ হল। নামটাই কিন্তু জানা হয় নি ভাই–
যুবক বলেছিলেন, আমার নাম হেমনাথ মিত্র।
আরেকটা কথা—
বলুন–
তখন বললেন না মাঝখানে কমাস আপনি এখানে ছিলেন না—
হ্যাঁ।
কোথায় ছিলেন তবে?
ঢাকায়। ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষাটা বাকি ছিল। সেটা দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে এলাম।
কী সাবজেক্ট ছিল আপনার?
দর্শন–
আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুব ভাল লাগল। আসবেন কিন্তু চার্চে। আপনার জন্যে আমি অপেক্ষা করে থাকব।
সেদিন ওই পর্যন্ত।
পরের হাটে আবার হেমনাথের সঙ্গে দেখা। ওই জলপ্রলয় আসিল, ওই ঘন ঘন বজ্রপাত হইতে লাগিল– বলে কণ্ঠস্বর যখন শীর্ষবিন্দুতে তুলেছেন লারমোর সেই সময় চোখে পড়েছিল, হাটুরে জনতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন হেমনাথ, ঠোঁট টিপে টিপে হাসছেন।
অমন হাসির কারণ কী থাকতে পারে? মনে মনে অস্বস্তি বোধ করেছিলেন লারমোর।
প্রিচিঙের পর সুসমাচার বিতরণ টিতরণ হয়ে গেলে লারামোর, হেমনাথের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, ভাল আছেন?
