মৃদু গলায় লারমোর বলেছিলেন, অর্থ সুখ-প্রতিষ্ঠায় আমার লোভ নেই। আমি—
তুমি কী?
আমি আপনার মতো মিশনারি হতে চাই।
এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে কাকা লারমোরকে বুকের ভেতর টেনে নিয়েছিলেন। আবেগের সুরে বলেছিলেন, গড ব্লেস ইউ মাই বয়। প্রার্থনা করি, জগতের সব চাইতে শ্রেষ্ঠ আনন্দ তুমি লাভ কর।”
লারমোর তার বুকের ভেতর থেকে বলেছিলেন, একটা কথা—
বল।
মিশনারি হয়ে আমি এদেশে থাকতে চাই না।
তবে কোথায় যাবে?
ইন্ডিয়ায়।
দু’চোখে অপার বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন কাকা, ইন্ডিয়া!
লারমোর বলেছিলেন, আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি আমাকে অনুমতি দিন।
কিন্তু–
বলুন—
দ্বিধান্বিত সুরে কাকা বললেন, নিজের দেশ থাকতে ইন্ডিয়া কেন? সেখানকার কতটুকু জানো তুমি?
লারমোর বলেছিলেন, ওরা বড় দুঃখী, বড় গরিব আর পরাধীন। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে যা জানতেন সব বলে গিয়েছিলেন তিনি।
কাকা অবাক হয়ে বলেছিলেন, এত সব কী করে জানলে?
বই পড়ে।
একটু নীরব থেকে কাকা বলেছিলেন, যদি মনে করো, ভারতবর্ষের কিছু ভাল করতে পারবে, যাও। আমার আপত্তি নেই। কে কোন জাত, কার গায়ের রং কী, কে কোথাকার বাসিন্দা–এ সব বড় কথা নয়। আসল কথা হল মানুষের কল্যাণ, মানুষের সেবা।
কাকার সম্মতি পাওয়া গেছে, আশীর্বাদ আর শুভেচ্ছাও তিনি জানিয়েছেন। কাজেই কোথাও কোনও বাধা ছিল না। মিশনারি হয়ে সোজা ইন্ডিয়ায় চলে এসেছিলেন লারমোর।
ভারতবর্ষের আর কোথাও নয়, প্রথমেই তিনি এসেছিলেন কলকাতায়। সেখানে দিন তিন চারেক থেকে পূর্ব বাংলায়-এই রাজদিয়াতে।
আজ রাজদিয়ার এই গির্জাটার জরাজীর্ণ করুণ দশা, সেদিন কিন্তু এরকম ছিল না। চারদিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ঝকঝক তকতক করত। দেওয়ালগুলোর পলেস্তারা এমন করে খসে পড়েনি। নতুন কলিতে গির্জাবাড়িটাকে চমৎকার দেখাত।
তখন এখানে ছিলেন ফাদার পারকিন্স। পারকিন্সের যথেষ্ট বয়স হয়েছিল, প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। এদেশে থাকতে থাকতে একখানা খানদানী ম্যালেরিয়া বাধিয়ে ফেলেছিলেন, তার ওপর ছিল বাত। বার মাসই অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে হতো। ফলে মিশনের কাজ প্রায় বন্ধ হবার দাখিল। ফাদার পারকিন্সকে সাহায্য করবার জন্যই লারমোর রাজদিয়া এসেছিলেন।
এখানে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে ফাদার পারকিন্স জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইস্ট বেঙ্গলে আগে কখনও এসেছ?
আজ্ঞে না। লারমোর জানয়েছিলেন, ইস্টবেঙ্গল কেন, ইন্ডিয়াতেই এই আমার প্রথম আসা।
এখানে আসার আগে বাংলা ভাষাটা নিশ্চয়ই শিখে ফেলেছ?
না।
এখানকার হালচালও নিশ্চয়ই জানো না?
না।
এবার স্পষ্টতই বিরক্ত হয়েছিলেন ফাদার পারকিন্স, এদেশের কিছুই জানা নেই, এমন আনকোরা সব ছেলে ধরে ধরে পাঠাবে! এদের দিয়ে যে কী করে কাজ চলবে।
লারমোর উত্তর দেন নি।
ফাদার পারকিন্স আবার বলেছিলেন, এসে যখন পড়েছই তখন কী আর করি। প্রথমে বাংলা ভাষাটা শেখ। মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে বেরুতেও হবে।
আচ্ছা– তক্ষুনি ঘাড় কাত করেছিলেন লারমোর।
ফাদার পারকিন্স আর দেরি করেন নি; সেদিন থেকেই তালিম দিতে শুরু করেছিলেন।
মাসখানেকের ভেতর বাংলা ভাষাটা কাজ চালাবার মতো শিখে ফেলেছিলেন লারমোর। এর মধ্যে বারকয়েক তাকে বেরুতেও হয়েছিল। যেদিন জ্বরটা নতুন করে আসত না কিংবা বাতের ব্যথাটা ঝিমিয়ে থাকত, সেদিন ফাদার পারকিন্স তাকে নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে অথবা দূরের কোনও হাটে পাড়ি জমাতেন। একদিন বলেছিলেন, আমার শরীরের অবস্থা তো দেখছি।
ফাদার পারকিন্স কী বলতে চান বুঝতে না পেরে লারমোর বলেছিলেন, আজ্ঞে
বয়েস হয়েছে। রোগে দুর্বল হয়ে পড়েছি। একদিন ভাল যায় তো তিনদিন বিছানায় পড়ে থাকি। আমি একরকম খরচের ঘরেই চলে গেছি। আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে চারদিক ভাল করে দেখে নাও। রাজদিয়া গির্জার সব ভার তোমাকেই নিতে হবে।
এ দেশের ভাষা, সামাজিক রীতিনীতি জেনে না আসার জন্য প্রথম দিন বিরক্ত হয়েছিলেন ফাদার পারকিন্স। তাতে মনে মনে দমে গিয়েছিলেন লারমোর। কিন্তু মাসখানেক নিরন্তর মেলামেশার ফলে বোঝা গিয়েছিল, ফাদার পারকিন্স মানুষটি বেশ সজ্জন, বিবেচক, হৃদয়বান। কোনও ব্যাপারে লারমোরের অসুবিধা হচ্ছে কিনা, আস্বাচ্ছন্দ্য ঘটছে কিনা–সে সব দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ লক্ষ্য। ধীরে ধীরে মানুষটিকে ভালই লেগেছিল লারমোরের।
সেদিন কথার উত্তরে লারমোর বলেছিলেন, এ আপনি কী বলছেন?
কী বলছি?
আপনি থাকতে গির্জার ভার আমি নেব! আমি জানিই বা কী, বুঝিই বা কী?
ফাদার পারকিন্স হেসেছিলেন, আমি তো চিরকাল থাকব না। শরীরের যা আবস্থা তাতে আজ আছিঃ কাল নেই। আমি যখন থাকব না তখন কাউকে তো দায়িত্ব নিতেই হবে।
লারমোর ব্যথিত সুরে বলেছিলেন, মৃত্যুর কথা এখনই ভাবছেন কেন? অত বয়েস আপনার। হয়নি।
তার পিঠে হাত রেখে ফাদার পারকিন্স বলেছিলেন, যতই তুমি কমাতে চাও না, যথেষ্ট বয়েস আমার হয়েছে। বয়েসটা বড় কথা নয়, শরীর যদি ভাল থাকত! অসুস্থ রুগণ দেহ নিয়ে বেঁচে থাকা বিড়ম্বনা। সে যাক গে, যতদিন বাঁচব রাজদিয়াতে আছি, ততদিন তোমার চিন্তা নেই।
হাটে-গঞ্জে কি সুদূর নদীর চরে গিয়ে ফাদার পারকিন্স কিছুক্ষণ জিরোতেন। জিরোতে জিরোতে বলতেন, আমার দেশ ব্রিটেন, তোমার আয়াল্যান্ড। জন্মভূমি ছেড়ে, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে কেন আমরা এত দূরে এসে পড়ে আছি, বল তো?
