গির্জায় ফিরে খানিকক্ষণ বিশ্রামের পর অবনীমোহন বললেন, আচ্ছা লালমোহন মামা–
বল– লারমোর উন্মুখ হলেন।
এই গির্জায় আপনি কতদিন আছেন?
মনে মনে হিসেব করে লারমোর বললেন, প্রায় চল্লিশ বছর। এইটিন নাইনটি নাইনে এখানে এসেছিলাম, আর এটা হল গিয়ে নাইনটিন ফরটি।
হঠাৎ কী মনে পড়তে অবনীমোহন বললেন, একটা কথা জানবার খুব ইচ্ছে আমার। যত বারই জানতে চেয়েছি, বলেছেন, পরে বলবেন। আজ কিন্তু আপনাকে ছাড়ব না।
কী কথা বল তো?
আপনার জীবনের কথা।
স্নিগ্ধ হেসে লারমোর বললেন, শোনাবার মতো কথা কিছুই নেই। অতি তুচ্ছ জীবন আমার।
অবনীমোহন বললেন, তুচ্ছ কিনা, সে আমরা বুঝব। আপনি বলুন—
বেশ, তোমার যখন এত আগ্রহ, শোন লারমোর নিজের জীবনকথা শুরু করলেন।
জন্মসূত্রে লালমোর আইরিশ। ওই পর্যন্তই। আয়ার্ল্যান্ডের কথা আজকাল তার বিশেষ মনেও পড়ে না।
জন্মভূমির নামে মানুষের বুকে আবেগের নদী দুলতে থাকে। তেমন কোনও অনুভূতি লারমোরের মধ্যে অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ।
থাকবেই বা কী করে? সেই কবে ইন্ডিয়ায় চলে এসেছেন লারমোর, সে কি আজকের কথা! একটা শতাব্দীর প্রায় আধাআধি তো তার এ দেশেই কেটে গেল।
এসেছিলেন যৌবনের শুরুতে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন। এখানে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরলে জন্মভূমির সেই দেশটাকে ধুধু স্বপ্নের মতো মনে হয়।
লারমোরের স্মৃতি থেকে কত কিছুই তো মুছে গেছে। তবু মনে পড়ে, খুব ছেলেবেলাতেই বাবা মাকে হারিয়েছেন। তারপর খুব দূর সম্পর্কের এক কাকা তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। নিজের কাছে বলতে চার্চে।
কাকা বিয়েটিয়ে করেন নি। তিনি ছিলেন গির্জাবাসী সন্ন্যাসী–সেবাব্রতী এবং ধর্মযাজক। বহুজনহিতায় বহুজনসুখায় তাঁর জীবন উৎসর্গ করা।
লারমোরের দিকে তাকাবার সময় কাকার ছিল না। চার্চের নানা দায়িত্বপূর্ণ কাজে সর্বক্ষণ তাকে ব্যস্ত থাকতে হতো। চার্চে একটা অরফানেজ ছিল, কাকা তাকে সেখানে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। অনেকগুলো অনাথ পিতৃপরিচয়হীন শিশুর সঙ্গে লারমোরের প্রথম জীবন কাটতে শুরু করেছিল।
মনে পড়ে, অরফ্যানেজে ভর্তি করে দিয়েই কাকা তার কর্তব্য শেষ করে ফেলেন নি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে দু’চার মাস পর পর এসে লারমোরের খোঁজও করতেন। বলতেন, বাবা-মা নেই বলে দুঃখ করো না, প্রভুর হয়তো এটাই ইচ্ছে।
সেই বয়সে লারমোর এসব বুঝতে পারতেন না; বড় বড় অবোধ চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতেন।
কাকা আবার বলতেন, চারদিকে তাকিয়ে দেখ, জগতে কত ছেলে অনাথ। তোমার তো তবু বলবার মতো একটা পিতৃপরিচয় আছে, ওদের তা-ও নেই। প্রভু করুণাময়, তার উপর বিশ্বাস রাখো। সব দুঃখ ঘুচে যাবে।
সেদিন না হলেও, বড় হয়ে কাকার কথাগুলো বুঝতে পেরেছিলেন লারমোর।
ছাত্র হিসেবে চিরদিনই তিনি অসাধারণ মেধাবী। স্কুলের জীবন শেষ করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। চাচই তার পড়ার খরচ চালাত।
জগতে এত শাস্ত্র থাকতে কেন লারমোর চিকিৎসা শাস্ত্রের অনুরাগী হয়েছিলেন তার কারণ আছে। কারণটা তার পরিবেশ। ছেলেবেলা থেকেই লারমোর তাঁর চারধারে যা দেখেছেন তা হল কল্যাণময় সেবার জগৎ। দেখেছেন সুখ-সাধকামনা-বাসনা, নিজেদের বলতে যা কিছু সব বিসর্জন দিয়ে সর্বত্যাগী মিশনারির দলকে পরার্থে জীবন সঁপে দিতে। পবিত্র গির্জা, কল্যাণব্রতী ফাদারের দল এবং কাকা এঁরা সবাই মিলে তার অস্তিত্ব যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন। তাদের প্রভাব এত বিপুল, এমন সর্বব্যাপী যে তার বাইরে পা বাড়াবার উপায় ছিল না লারমোরের। অমোঘ নিয়তির মতো তারা যেন লারমোরের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতে শুরু করেছিলেন।
লারমোর তখন ভাবতেন ডাক্তার হতে পারলে মানুষের যতখানি সেবা করা যায়, আর কিছুতেই তা সম্ভব নয়। তাই স্কুলের পড়া শেষ করেই মেডিক্যাল কলেজে গিয়েছিলেন। সেই বয়সেই নিজের ভবিষ্যৎ মোটামুটি স্থির করে ফেলেছিলেন লারমোর।
চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে পড়তে হঠাৎ আরেক দিকে চোখ পড়েছিল তার। চার্চে ভারতবর্ষের ওপর লেখা কিছু বই ছিল। নিতান্ত কৌতূহলের বশে একদিন সেগুলো নিয়ে পাতা ওলটাতে শুরু করেছিলেন। ওলটাতে ওলটাতে কখন যে ইন্ডোলজির বইগুলো তাকে একেবারে কুহকিত করে ফেলেছে, লারমোর নিজেই জানেন না।
ভারতবর্ষের মানুষ, তার গাছপালা, তার দারিদ্র্য, তার পরাধীনতা, তার রূপকথা, সামাজিক রীতিনীতি–সব মিলিয়ে ইন্ডিয়া যেন এক বিচিত্র স্বপ্নের দেশ। পড়তে পড়তে কখনও ব্যথিত হয়েছেন লারমোর, কখনও অস্থির, কখনও বিহ্বল, কখনও বা মুগ্ধ।
চার্চে ক’খানাই বা বই ছিল! যেখান থেকে পারতেন ইন্ডোলজির আরও বই যোগাড় করে পড়তেন লারমোর। পূর্ব গোলার্ধের এক অজানা দেশ তার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল যেন। কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে ভারতবর্ষ তাঁকে অবিরত হাতছানি দিয়ে যাচ্ছিল।
ভবিষ্যৎ আগেই স্থির হয়ে ছিল। কাকা তখনও জীবিত। মেডিক্যাল কলেজের রেজাল্ট বেরুবার পর লারমোর তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
কাকা বললেন, তুমি পরীক্ষার ফাস্ট হয়েছ। আই অ্যাম ভেরি হ্যাঁপি মাই বয়। অরফানেজে থেকে কষ্ট করেছ। প্রভু করুণাময় আজ সে কষ্টের পুরস্কার দিয়েছেন। এখন তোমার কাছে সুখ অর্থ-প্রতিষ্ঠা, সব কিছুর দরজা খোলা। জীবনে উন্নতি কর, তাই আমি চাই।
