সে ছোকরা কোথায়?
বছর তিনেক আগে এক ঢপের দলে গিয়ে জুটেছিল, তারপর থেকে তার পাত্তা নেই।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
লরমোর অবার কী বলতে যাচ্ছিলেন, পরানের মা বেতের সাজিতে চিড়ে-মুড়ি-ক্ষীর-চমচমের ফলার সাজিয়ে নিয়ে এল। সবার হাতে একটা করে সাজি দিয়ে নিঃশব্দে চলে যাচ্ছিল সে, লারমোর ডাকলেন, তুমি খেয়েছ?
পরানের মা উত্তর দিল না, মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
লারমার বললেন, এখন গিয়ে খেয়ে নেবে, বুঝেছ? মোটে লজ্জা করবে না। এখন থেকে এটা তোমার নিজের বাড়ি।
আধফোঁটা বিব্রত স্বরে পরানের মা বলল, আইচ্ছা। বলে আর দাঁড়াল না।
খাওয়া দাওয়ার পর লারোর বললেন, এতখানি বেলা হল, গোরুগুলো গোয়ালে আটকে রয়েছে। দুধ দুয়ে ওদের ছেড়ে দিই গো যাবে না কি তোমরা? বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন।
অবনীমোহন বললেন, ঘরে বসে থেকে আর কী করব? চলুন আপনার দুধ দোয়া দেখি গে–
এইসময় সুধা বলে উঠল, আপনি সত্যিই দুধ দুইতে পারেন লালমোহন দাদু? সে ভারি অবাক হয়ে গেছে।
মধুর হেসে লারমোর বললেন, গাই দোয়া কি খুব কঠিন কাজ রে দিদি? আমি না পারি কী?
কী কী পারেন তার একটা লিস্ট দিন দেখি– ঘাড় বাঁকিয়ে ভুরু নাচিয়ে সুধা বলল।
সব পারি রে দিদি, সব পারি। ধান ভানতে পারি, চিড়ে কুটতে পারি, জলসই-এর গান গাইতে পারি, আবার পায়েসও রাঁধতে পারি।
সে পায়েস খাওয়া যাবে তো?
খেয়েই বলিস। ওটা তো আজ আমিই রাঁধব।
একটু ভেবে নিয়ে সুধা বলল, আমার মতো নাচতে পারেন আপনি?
মাথাটা সামনের দিকে অনেকখানি নিচু করে লারমোর বললেন, ওইখানটায় তোর জিত দিদিভাই। এই বয়েসে কোমর আর ঘোরে না। যদি সেই বয়েসে তোর সঙ্গে দেখা হতো রে–
সুধা ঝঙ্কার দিয়ে উঠল, তা হলে কী হত শুনি?
সে কথা কি হাটের মাঝখানে বলা যায়?
তবে কোথায় বসে বলা যায়?
নির্জনে দুজনে—
লারমোরের কথা শেষ হবার আগেই হেমনাথ হুঙ্কার দিলেন, অ্যাইও–
লারমোর ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, কী হল হে? অমন হুমকে উঠলে? ল্যাজে পা পড়েছে মনে হচ্ছে।
‘একশ’ বার পড়েছে। আমার হেড বেগমের কানে নির্জনে কী বলতে চাও হে বেয়াদপ? জানো তোমার গর্দান চলে যেতে পারে।
দুঃখিত, দুঃখিত। একে যে তোমার হেড বেগম করে বসে আছ, বুঝতে পারি নি। বলতে বলতে করুণ চোখে সুধার দিকে তাকালেন লারমোর। হেমনাথকে দেখিয়ে বললেন, ওই কালো কষ্টিপাথরটাকে মন প্রাণ সঁপে না দিয়ে–
সুধা ভেংচে উঠল, আহা-হা–
লারমোর এবার নিজের বুকে আঙুল রেখে আবেগপূর্ণ গলায় বললেন, এই গোরাদের গলায় যদি বরমাল্য দিতিস রে সুধারানী–
সুধা আগের মতোই ভেংচাতে লাগল, অসভ্য কোথাকার—
সবাই হাসছিল। হাসাহাসির ভেতর একসময় লারমোর গির্জার পেছন দিকে এসে পড়লেন।
গির্জার পর অনেকখানি ফাঁকা মাঠ, তারপর নদী। মাঠটার এক ধারে সারি সারি খানকতক টিনের ঘর। একটা ঘরে দেখা গেল অনেকগুলো ধানের ডোল, আরেক ঘরে চার পাঁচটা গোরু বাঁধা। এটাই সম্ভবত গোয়াল।
গোয়ালঘরের কাছে এসে লারমোর ডাকতে লাগলেন, কাদের, কাদের–
তৃতীয় ঘরখানা থেকে কাদের বেরিয়ে এল। কখন কোন পথ দিয়ে সে এখানে এসে ঢুকেছিল, কেউ টের পায় নি।
লারমোর বললেন, দুধ দোয়াব, পেতলের দু’টো বলতি আর তেলের বাটি নিয়ে আয়।
কাদের চলে গেল।
বিনু হঠাৎ বলে উঠল, কাদের তো আপনার কাছে থাকে, না লালমোহনদাদু?
হ্যাঁ। যে ঘরটা থেকে কাদের বেরিয়ে এসেছিল সেটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে লারমোর বললেন, ওটা কাদের আর চম্পকের ঘর।
চম্পক কে?
ওই যে ঘোড়াটা, যেটা আমাদের ফিটন টানে। ওর আরেকটা নামও আছে–গোপাল। বিনু অবাক। ওই রোগা চেহারার বুড়ো হাড্ডিসার ঘোড়াটার যে নাম থাকতে পারে, তাও এরকম চমকপ্রদ শৌখিন নাম–কে ভাবতে পেরেছিল! গোপাল না হয় মেনে নেওয়া যায় তাই বলে চম্পক! বিমূঢ়ের মতো বিনু তাকিয়ে থাকল। অনেকক্ষণ পরে বলল, ঘোড়াটা আর কাদের এক ঘরে থাকে!
হ্যাঁ।
অন্য সকলেও অবাক হয়ে গিয়েছিল। সমস্বরে তারা বলল, কেন?
আর বলল না– লারমোর বলতে লাগলেন, চম্পককে ছাড়া এক মুহূর্ত সে থাকে না। ঘোড়ার জন্যে আলাদা ঘর করে দিতে চেয়েছিলাম, কাদের রাজি না। ওই চম্পকের সঙ্গেই তার ওঠা বসা, চলা ফেরা। এমনকি ওটার সঙ্গে কথাও বলে সে। পনের বছর আগে ঘোড়াটা কেনা হয়েছিল। তখন থেকেই সে কাঁদেরের বন্ধু, সঙ্গী।
বালতি আর তেলের বাটি নিয়ে কাদের ফিরে এল। তার সামনে ঘোড়ার প্রসঙ্গ নিয়ে কেউ আর কিছু বলল না।
দুধ দোয়াবার সরঞ্জাম এসে গেছে। লারমোর গোয়ালে ঢুকলেন। তার পিছু পিছু বিনুরাও গেল।
গোরর বাঁটে তেল মেখে দুই হাঁটুর ফাঁকে বালতি নিয়ে নিপুণ হাতে দুইতে শুরু করলেন লারমোর। পাঁচটা গরুর দুধে দু’টো বালতি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল।
দুধটা কাদেরকে দিয়ে পরানের মায়ের কাছে পাঠিয়ে গোরুগুলোকে ছেড়ে দিলেন লারমোর। তারা ছুটে গিয়ে সামনের মাঠে শরতের কোমল, সজীব ঘাসে মুখ ডুবিয়ে দিল।
লারমোর বললেন, একটা বড় কাজ হল। চল, জায়গাটা তোমাদের ভাল করে ঘুরিয়ে দেখাই।
গির্জার চারধার, এখানকার নদীতীর, একটু দূরের ঝাউবীথি–দেখতে দেখতে বেলা বেড়ে গেল। ঝকঝকে নীলাকাশের খাড়া পাড় বেয়ে বেয়ে সূর্যটা অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে।
আশ্বিন যায় যায়। তবু এখনও রোদে বেশ ধার আছে। সবার কপালে ঘামের দানা জমেছে। হেমনাথ বললেন, আর না, এবার ফেরা যাক।
