আমি তাও বলে দিয়েছিলাম।
যেমন মনিব তেমনি তো তার কর্মচারী হবে।
লারমোর উত্তর দিলেন না, সকৌতুকে হাসতে লাগলেন।
হেমনাথ বললেন, হেসো না তো। ছেলেমেয়েগুলো এত বেলা পর্যন্ত না খেয়ে আছে। ওদের কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।
আড়ে আড়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে লারমোর বললেন, আর তোমার?
আমারও।
সেই কথাটাই বল। এই জন্যেই এত রাগ?
হেমনাথ হেসে ফেললেন।
হাসতে হাসতে লালমোর বললেন, চল। গিয়েই খেতে দিচ্ছি।
ঘাসের জমিটার পরই চার্চ। এটুকু পথ লারমোরের পিছু পিছু সবাই সেখানে চলে এল।
গির্জাটা কত কালের, কে জানে। তার বয়সের বুঝি আদি-অন্ত নেই। দেওয়ালের গা থেকে বালির আস্তর খসে খসে নানা জায়গায় ইট বেরিয়ে পড়েছে। সে ইটও নোনা-ধরা। শীত-গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ মৌসুমি বাতাসের আঘাতে আঘাতে আর জলের ঘাটে ঘাটে কত জায়গা যে ভেঙেচুরে ক্ষয়ে গেছে! দরজা-জানালাগুলোও আস্ত নেই, উইদের দাঁতে তারা নিশ্চিহ্ন হবার পথে। অশ্বত্থেরা ভিতের তলায় তলায় শিকড় চালিয়ে ধ্বংসের কাজ অনেকখানি এগিয়ে রেখেছে।
গির্জাবাড়িটা কতকাল যে সারানো হয় নি, কতকাল যে তার কলি ফেরানো হয় নি!
ভেতরের চেহারাও বাইরের মতোই। দেওয়ালের কোণে কোণে বছরের পর বছর ঝুল জমছে, মাকড়সার জালের পর জাল বুনে যাচ্ছে। ঘুলঘুলিতে পায়রা আর চড়াইরা বংশপরম্পরায় বাসা বাঁধছে। দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে এ বাড়িতে তাদের স্বত্ব কায়েম হয়ে গেছে যেন।
গির্জায় ঢুকলেই প্রথমে যা চোখে পড়ে তা হল প্রকান্ড বেদির ওপর যিশু-মূর্তি। মানবপুত্র ওখানে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে আছেন। সর্বাঙ্গে কোথাও যন্ত্রণার চিহ্ন নেই, ক্ষমাসুন্দর চোখে মূঢ় অন্ধকার জগতের দিকে তিনি যেন তাকিয়ে আছেন। তাকে ঘিরে স্নিগ্ধ এক জ্যোতির্বলয়।
মূর্তিটির দিকে তাকালে স্বর্গীয় সুষমায় মন ভরে যায়, উত্তেজিত রিপুতাড়িত স্নায়ুর ওপর প্রশান্তি নেমে আসে।
লারমোরের সঙ্গে আসতে আসতে খ্রিস্টমূর্তির কাছে কিছুক্ষণ সবাই থমকে দাঁড়াল।
ভক্তিপূর্ণ মুগ্ধ স্বরে অবনীমোহন বললেন, চমৎকার মূর্তি। তাকালেই প্রাণ ভরে যায়।
হেমনাথ আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ। আমি মাঝে মাঝে এসে ওই মূতিটার সামনে বসে থাকি। কী মনে হয় জানো অবনী? মনে হয়, পৃথিবীতে কোনও হীনতা নেই, নীচতা নেই, নোংরামি নেই। এখানে এলে নিজের ভেতর অনেকখানি শক্তি পাওয়া যায়।
অবনীমোহন উত্তর দিলেন না, একদৃষ্টে মানবপুত্রের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
লারমোর ডাকলেন, এস।
যিশুমূর্তির পেছন দিকে খানিকটা গেলে দু’খানা বড় বড় ঘর। লারমোর একটা ঘরে অবনীমোহনদের নিয়ে এলেন। এক ধারে ছোট্ট তক্তপোশ, তার ওপর এলোমেলো ময়লা বিছানা। আরেক ধারে হাতলভঙ্গ ক’খানা বেতের চেয়ার, একটা মাঝারি টেবিল, দু’টো আলমারি বোঝাই বই আর গদিমোড়া একখানা ইজিচেয়ার। আরেক কোণে দেওয়ালে পেরেক পুঁতে দড়ি খাটানো রয়েছে, তাতে খানকতক ক্ষারেকাঁচা ধুতি এবং ফতুয়া ঝুলছে। এখানে ওখানে এক আধটা বাক্স, মাটির একটা কলসি, দু’টো চীনে মাটির গেলাস, কালি-পড়া হারিকেন ইতস্তত ছড়াননা।
লারমোর বললেন, এই আমার সাম্রাজ্য। বসসা তোমরা, বসো–
সবাই বসলে লারমোর দরজার দিকে মুখ করে ডাকতে লাগলেন, পরানের মা, পরানের মা–
ওদিকের কোত্থেকে সাড়া এল, যাই–
একটু পর একজন বিধবা মধ্যবয়সিনী এ ঘরে এসে দাঁড়াল। নাক পর্যন্ত তার ঘোমটা টানা। লারমোর শুধোলেন, রান্নাবান্নার কতদূর?
মৃদু গলায় বিধবাটি বলল, বসাইয়া দিছি।
মাছ-তরকারি ভাতটাত তুমি রাঁধে। পায়েসটা আমি করব। গোরুগুলো দোয়ানো হয়েছে?
না।
ঠিক আছে, আমি দুইয়ে নিচ্ছি। এখন আমাদের খেতে টেতে দাও। কাল রাত্তিরে পাতক্ষীর আর চমচম এনে রেখেছিলাম। সে সব দিও।
মেয়েমানুষটি স্বল্পভাষিণী। এত লোকজন দেখে সে জড়সড় হয়ে গেছে। ঘোমটার ভেতর মাথা নেড়ে জানাল, লারমোর যেমন বলছে, ঠিক তেমন তেমনই দেবে।
লারমোর আবার বললেন, ডাল হবে, ভাত হবে, বেগুন ভাজা আলু ভাজা, পাঁচ রকমের মাছ এত সব হবে। রান্না শেষ হতে বেলা হেলে যাবে। এখন পেট ভরে না খেলে বাচ্চারা খিদেয় কষ্ট পাবে। যাও যাও, বেশি করে খাবার নিয়ে এস–
লারমোরের কথায় হেমনাথ সায় দিলেন।
বিধবাটি চলে গেল।
একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন হেমনাথ। বললেন, একে কোথায় পেলে লালমোহন? কাজির পাগলার সনাতনের বউ না, যে গেল বছর বর্ষাকালে উদরীতে মরেছে?
হ্যাঁ। লারমোর বলতে লাগলেন, স্বামী মরবার পর থেকে মেয়েটার দুর্গতির শেষ নেই। শরিকেরা যা করবার করেছে, ঠকিয়ে সর্বস্বান্ত করে ওকে রাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছে। তারপর দু মুঠো ভাতের জন্যে আজ এ বাড়ি, কাল ও বাড়ি করে বেড়াচ্ছিল। উদয়াস্ত খাটত। তবু যদি কেউ একটু ভাল মুখে কথা বলত! উঠতে বসতে খালি লাথি আর ঝাটা। এভাবে কি মানুষ বাঁচতে পারে?
তারপর–
তারপর আর কি, পরশু দিন রোগী দেখতে কাজির পাগলা গিয়েছিলাম, সনাতনের বউ এসে আমাকে ধরল। বলল, আমি তার ধর্মবাপ। তাকে আমার কাছে আশ্রয় দিতে হবে। এ অবস্থায় তো ফেলে আসতে পারি না, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। তুমিই বল হেম, ঠিক করি নি?
ঠিকই করেছ। আচ্ছা–
বল– লারমোর উন্মুখ হলেন।
হেমনাথ বললেন, পরান বলে ওর একটা ছেলে ছিল না?
ছিল তো। সে মানুষ হলে তার মায়ের দুঃখ তত ঘুচেই যেত।
