হুকুম নাই। লালমোহন সাহেব কইয়া দিছে, খালি মুখ ধোওনের সময় দিতে। খাওন দাওন হগল কিন্তুক আমাগো গির্জায় গিয়া।
চোখ বড় বড় করে হেমনাথ বললেন, বাব্বা!
হেমনাথের মনোভাব খানিক আন্দাজ করতে পেরেছিল কাদের। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, লালমোহন সাহেব যা কইয়া দিছে তাই কইলাম।
বেশ বাবা, বেশ। হিজ ম্যাজিস্টি যখন হুকুম দিয়েছেন তখন তো নড়চড় হবার জো নেই। মুখ ধুয়েই তোমার পুষ্পক রথে উঠছি।
এ বাড়ির সবার এখনও ঘুম ভাঙে নি। যারা ঘুমোচ্ছিল তাদের জাগিয়ে মুখটুখ ধুয়ে নিতে বললেন হেমনাথ। নিজেও ধুয়ে নিলেন, দেখাদেখি ঝিনুক বিনুও ধুলো। তারপর হেমনাথ ওদের দু’জনকে নিয়ে সূর্যবন্দনা সেরে নিলেন।
এদিকে সারা বাড়িতে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। সুধা-সুনীতি-অবনীমোহন, প্রায় সকলেই জামাকাপড় পরে বেরুবার জন্য তৈরি। স্নেহলতা অবশ্য যাবেন না। সপ্তমী অষ্টমী, পর পর দুদিন থিয়েটার আর নৃত্যনাট্য দেখতে গিয়েছিলেন। বাড়ির কর্ত্তী তিনি, সর্বময় ঈশ্বরী। রোজই যদি সবার সঙ্গে নাচতে নাচতে বেরিয়ে পড়েন, এত বড় সংসার চলে কী করে? সবে নতুন পাট উঠেছে, সেগুলো দেয়ার ব্যাপার আছে। শুকোবার ব্যাপার আছে। শ্রাবণ ভাদ্র মাসের ডোল বোঝাই আউশ ধান ভানিয়ে রাখতে হবে। তা ছাড়া, কদিন পর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। খই ভাজতে হবে, মুড়ি ভাজতে হবে। পঞ্চাশটা নারকেলের নাড় পাকানো আছে, চন্দ্রপুলি, ছাপা সন্দেশ বানানো আছে, মুড়কি বানানো আছে। চিড়ে কোটা আছে। খই-মুড়ি-চিঁড়ে দিয়ে তিন রকমের মোয়া বানানো আছে। কাজ কি তার এক-আধটা? দায়িত্ব কি সামান্য? কোন দিকে তার নজর না দিলে চলে!
স্নেহলতা যাবেন না। কাজেই শিবানী জানিয়ে দিলেন, তিনিও যাবেন না। সম্পর্কটা যদিও ননদ ভাজের, আসলে তারা যেন অভিন্নহৃদয় দুই সখী। স্নেহলতা না বেরুলে কার সাধ্য শিবানীকে নড়ায়।
দু’রাত গায়ে মাথায় হিম লেগে শরীর খারাপ হয়েছে সুরমার। তিনিও বেরুবেন না।
যাবার মধ্যে সুধা-সুনীতি-অবনীমোহন-ঝিনুক আর বিনু। দেরি না করে তাদের নিয়ে ফিটনে উঠলেন হেমনাথ। ওঠার শুধু অপেক্ষা, সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে দিল কাদের।
স্টিমারঘাট, তারপর বরফ কল, মাছের আড়ত, সেটেলমেন্ট অফিস, আদালত পাড়া পর্যন্ত বিনুর দৌড়। সে সব পেছনে ফেলে ফিটন আরও অনেক দুরে এগিয়ে গেল। জায়গাটা ক্রমশ সরু হয়ে যেখানে শেষ হয়েছে সেটাই গির্জা। তারপর থেকে জল। খুব সম্ভব স্টিমারঘাটের কাছের বড় নদীটা ঘুরে গির্জার পেছনে চলে এসেছে।
গির্জার সব চাইতে বড় বিস্ময় তার তীক্ষাগ্র চুড়োটা, ধীরে ধীরে সরু হয়ে অনেক উঁচুতে আকাশের গায়ে সেটা বিঁধে রয়েছে। সেদিন স্নেহলতার সঙ্গে পুজোর কাপড় বিলোতে বেরিয়ে দুর থেকে চুড়োটা দেখতে পেয়েছিল বিনু।
গির্জার সামনের দিকে খানিক ফাঁকা জমি সবুজ ঘাসে ঢেকে আছে। কাদের ফিটন নিয়ে সোজা সেখানে চলে এল।
লারমোর বোধহয় দেখতে পেয়েছিলেন, গির্জার ভেতর থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলেন। তার নীলাভ চোখদুটো খুশিতে আলো হয়ে উঠল। ব্যস্তভাবে বলতে লাগলেন, হেম এসেছে। অবনী এসেছে। আমার দাদা দিদিরা এসেছে। কী আনন্দ যে হচ্ছে!
হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ, আমরা এসেছি। সারাদিনের জন্যে নিজেদের তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম। এখন যা ইচ্ছে কর।
লারমোর কী যে করবেন, ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না। ছেলেমানুষের মতো লাফ দিয়ে ফিটনের পাদানেই উঠে পড়লেন। গাড়ির ভেতর উঁকি দিয়ে অস্থির গলায় বললেন, কী!
কী হল?
রমু কোথায়।
নিচে দাঁড়িয়ে গাড়ির ভেতরকার সবটুকু দেখতে পান নি লারমোর। পাদানে উঠতেই কারা এসেছে আর কারা আসে নি, বুঝতে পারলেন।
হেমনাথ বললেন, রমুটার শরীর ভাল না। আসতে অবশ্য চেয়েছিল, আমিই বারণ করেছি।
লারমোর বললেন, হঠাৎ শরীরটা খারাপ হল যে?
নাটক টাটক দেখে হিম লাগিয়েছিল, তাই—
রমু না হয় আসতে পারে নি। বৌঠাকরুন? শিবুদিদি?
স্নেহলতা শিবানী কেন আসেন নি, হেমনাথ বললেন।
লারমোর বললেন, আনন্দর অর্ধেকটাই মাটি।
একটু নীরবতা। তারপর হেমনাথ তাড়া দিলেন, কী ব্যাপার, গাড়ি থেকে নামতে দেবে না? রাস্তা ছাড়–
লারমোরের খেয়াল ছিল না, রাস্তা জুড়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। বিব্রতভাবে পাদান থেকে তাড়াতাড়ি নিচে নামলেন। হেমনাথরা আর অপেক্ষা করলেন না, দরজা খুলে নেমে পড়লেন।
লারমোর বললেন, এস—
তার সঙ্গে যেতে যেতে হেমনাথ বললেন, আমাদের আনবার জন্যে ভাল লোক পাঠিয়েছিলে বটে।
হেমনাথ কী বলতে চান, বুঝতে না পেরে সন্দিগ্ধ গলায় লারমোর শুধোলেন, কী ব্যাপার বল তো? কাদের অন্যায় কিছু করেছে। কিন্তু ও তো সেরকম লোক না।
হেমনাথ বললেন, আরে না না, শুধু শুধু অন্যায় করতে যাবে কেন? তুমি তো ধরে আনতে বলেছিলে। ও একেবারে আমাদের বেঁধে এনেছে।
কিরকম?
কিরকম আবার, ঘুম থেকে উঠবার পর মুখটা খালি ধুতে পেরেছি। তারপর আর দাঁড়াতে দেয় নি কাদের। নিশ্বাস ফেলতে দেয় নি। টেনে তোমার ওই গাড়িটায় তুলে ফেলেছে।
একটু আগে সংশয় ছিল। দেখতে দেখতে লারমোরের চোখমুখের চেহারা বদলে গেল। নিশ্চিন্ত উৎফুল্ল সুরে তিনি বললেন, যাক, তা হলে যা বলে দিয়েছিলাম তাই করেছে কাদের।
হেমনাথ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, জানো, খেয়ে পর্যন্ত আসতে দেয় নি।
