পুলিশ এবং পেটি অফিসারদের শাসানিতে চেঁচামেচি সামান্য কমল ঠিকই, তবে একেবারে থেমে গেল না।
আমার কুঠুরি থেকে সামনের ব্লকের সেলগুলো দেখা যায়। কিন্তু আমাদের ব্লকের একতলা দোতলা বা তেতলার কোনও কুঠুরিই দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে তালা খোলা এবং বন্ধ করার আওয়াজ কানে আসছিল। বুঝতে পারছিলাম সেলে কয়েদিদের ঢোকানো হচ্ছে।
হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটে গেল। একটি কয়েদি পাহারাদার আর পেটি অফিসারদের নজর এড়িয়ে আচমকা আমার সেলের। দরজার সামনে চলে এল। চাপা গলায় বলল, ভাইসাব, আমার নাম বৈজু। আমি এক মামুলি কয়েদি। লেকিন আপনারা যে তিনজন আজ নয়া এই কালাপানি এলেন তারা সবাই দেশকে আজাদের জন্যে লড়াই করেছেন তাদের সবাইকে ইজ্জৎ করি। নমস্তে। এখানকার পুলিশ, টিল্ডাল আর পেটি অফিসাররা বহোৎ হারামি। আপনাদের জান বরবাদ করে দিতে চাইবে। সবার জন্যে পারব না, তবে আপনাকে আমি দেখভাল করব।
আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের তিন বিপ্লবীর সেলুলার জেলে আসার খবর তা হলে সাধারণ কয়েদিদের। মধ্যেও চাউর হয়ে গেছে! আমাদের ওপর যে প্রচণ্ড অত্যাচার চালানো হবে তা আগেই টের পেয়ে গেছি। কিন্তু মামুলি এই কয়েদিটি আমাকে বেছে নিয়ে কীভাবে আমার ওপর উৎপীড়ন কম হয় তার ব্যবস্থা করবে ভেবে পাচ্ছিলাম না। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সে সম্মান করে সেজন্য লোকটাকে খুব ভালো লাগল। জিগ্যেস করলাম, তোমার নাম কী? সে বলল, বৈজু
বিনয় অপার বিস্ময়ে এক বিচিত্র জগতের ইতিহাস শুনে যাচ্ছিল। সে জিগ্যেস করল, কাল যে বৈজু আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে সেলুলার জেলে এসেছিল, এ কি সেই বৈজু?
শেখরনাথ মাথাটা সামান্য নাড়লেন হ্যাঁ। তারপর শোন– তিনি আবার পুরনো স্মৃতির ভেতর ফিরে গেলেন। বলতে লাগলেন, বৈজুকে জিগ্যেস করলাম, তুমি কত বছর আগে এখানে এসেছ? সে বলল, হোগা, লগভগ চার সাল। বাকি জিন্দেগি কালাপানিতেই কাটাতে হবে। কোন অপরাধে তাকে এই বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে জানার জন্য ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল। কিন্তু সে প্রশ্ন আর করলাম না। বেশ কয়েকটা খুন না করলে যে এখানে আসা যায় না, তা আগেই শুনেছি। তেমনই কিছু একটা করে থাকবে বৈজু।
আমি তখন অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। –আচ্ছা, বৈজু, আমাদের মতো রেভোলিউশানারি আর কেউ এখন সেলুলার জেলে আছে? সে একটু অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, রিভোলিশান কিয়া হ্যায়। বুঝলাম, রেভোলিউশানারি শব্দটা তার অজানা। বললাম, দেশের আজাদির জন্যে যারা লড়াই করছে তাদের কথা বলছি। ব্যাপারটা এবার মাথায় ঢুকল বৈজুর। সে বলল, জেলের অফিসাররা যাদের টিরোরিস (টেরোরিস্ট) বলে? আমি বললাম, হ্যাঁ। বৈজু জানাল, এই তিন নম্বর ব্লকের তেতলায়, চার নম্বর ব্লকের একতলায়, আর সাত নম্বর ব্লকের দোতলায় আরও কয়েকজন রয়েছে। বলল, যদি তাদের কাছে। আপনারদের খবর পৌঁছে দিতে বলেন তার ব্যওস্থা করতে পারি। ওদের খবরও আপনাদের কাছে পাঠাতে পারি।
শুনে আমি স্তম্ভিত। সেলুলার জেলের ভেতর চতুর্দিকে যেখানে শয়ে শয়ে সেন্ট্রি, রাইফেল উঁচিয়ে পাহারা দিচ্ছে, ওয়াচটাওয়ার থেকে চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হচ্ছে, সেই কঠোর নিশ্চিদ্র যবনিকা ভেদ করে কীভাবে খবর চালাচালি করা সম্ভব, ভেবে পেলাম না। আমাকে তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে বৈজু বলল, সব বন্দোবস্ত আছে। আপ বেফিকুর রহিয়ে। পরে সব জানতে পারবেন। তারপর এদিক সেদিক তাকিয়ে বলল, শুনলাম, কাল আপনাদের তিন টিরোরিসকে টিকটিকিতে চড়ানো হবে। আমার বিস্ময়ের শেষ ছিল না। দেখা যাচ্ছে এখানে কোনও কিছুই গোপন থাকে না। সেলুলার জেলের প্রশাসন যে-সব নিরেট দেওয়াল তুলে রেখেছে তার মধ্যেও অদৃশ্য অনেক ছিদ্র রয়েছে। বৈজু বলতে লাগল, আপনার চোট যাতে কম লাগে সেটা আমি দেখব। আমি উত্তর দিলাম না। এবার কাচুমাচু মুখে বৈজু বলল, এক বাত কহুঙ্গা? বললাম, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বলবে। একটু ইতস্তত করে বৈজু বলল, আমার বহুৎ ভুখ (খিদে)। সুবেহসে রাত তুক খালি। মনে হয়, পেটে আগ (আগুন) জ্বলছে। কয়েদখানা থেকে যে খানা দেওয়া হয় তাতে পেট ভরে না। আপনাকে আজ চারঠো চাপাটি দিতে দেখেছি। তামাম কয়েদিকেই। শুনেছি বঙ্গল মুল্লুকের আদমিরা বেশি খেতে পারে না। আমাকে দোঠো দেবেন?
এতক্ষণে বৈজুর সমধুর বাক্যবর্ষণের কারণটা স্পষ্ট হয়ে গেল। আমি হেসে ফেললাম। তারপর দুটো চাপাটি এনে তার হাতে দিয়ে বললাম, এখন থেকে রোজ আমার ভাগ থেকে দুটো করে চাপাটি তুমি পাঁবো হাটু অবধি মাথা ঝুঁকিয়ে বৈজু বলল, আপকা মেহেরবানি।
বৈজু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, বলা হল না। তার আগেই বিশাল তাকদবর এক পাঠান পেটি অফিসার অলিন্দের ওধার থেকে দৌড়ে এল। ছসাড়ে ফিটের মতো হাইট। পাথরের পাটার মতো চওড়া বুক। সারা মুখে দাড়ি। তার চোখ থেকে রাগে আগুন ছুটছে। মোটা মোটা আঙুল দিয়ে সাঁড়াশির মতো বৈজুর ঘাড় চেপে ধরে দাঁতে দাঁত ঘষে সে গজরে উঠল, শালে, কুত্তার বাচ্চা, সেলে কয়েদি ঢোকাতে গিয়ে দেখি, এক হারামির পাত্তা মিলছে না। শিরে (মাথায়) বিলকুল চক্কর লেগে গেল। তারপর দেখি তুমি হারামি এখানে ভেগে এসে নয়া টিরোরিসের (টেরোরিস্টের) সাথ গপসপ (গল্প সল্প) করছ! চল শালে, চল আজ তোর হাড্ডি তুড়ে দেব। বৈজু বারকয়েক সেলাম ঠুকে কাকুতিমিনতি করতে লাগল, আমার কোঈ বুরা (খারাপ) মতলব নেহী হ্যায় আসলাম ভাই। নয়া কয়েদি এসেছে, তাই ভাবলাম দেখে যাই। দেখা করতে এসে, দো-এক বাত ভি হল– বলে আমাকে দেখিয়ে চোখের ইশারায় কিছু বলতে চাইল। ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিন্তু তাতে কাজ হল। পরে জেনেছিলাম পেটি অফিসারটার পুরো নাম আসলাম খান। সে বৈঞ্জুর কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে ট্যারাবাকা লাল লাল দাঁত বের করে, চোখ কুঁচকে একটু হাসে। বলে, শালে হারামজাদা তারপর নিচু গলায় কথা বলতে বলতে চলে যায়। একটু পরেই পাশের কুঠুরির তালা খোলার শব্দ কানে আসে; সেই সঙ্গে আসলাম খানের কর্কশ স্বর। –ঘুষ যা কুত্তা। টের পেলাম পাশের কুঠুরিটা বৈজুর। তাকে ঢুকিয়ে ফের তালা লাগিয়ে টানা বারান্দা কাঁপিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল আসলাম খান।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।