.
একজন অত্যন্ত উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে সেলুলার জেলের পুরনো দিনের কথা বলতে খুব ভালো লাগছিল শেখরনাথের। কিন্তু সব দিকে তার নজর। বেলা এখন অনেকটাই চড়ে গেছে। বললেন, চল, হাসপাতালে ফেরা যাক।
বিনয়ের কৌতূহল মিটছিল না। যত শুনছিল, মনে হচ্ছে এক। আশ্চর্য, ভয়াবহ, অজানা পৃথিবীর দরজা তার সামনে খুলে যাচ্ছে। একতলার কোণের দিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। সে জিগ্যেস করল, পরদিন আপনাদের সত্যি সত্যিই টিকটিকিতে চড়ানো হয়েছিল?
শেখরনাথ বললেন, আজ আর নয়, কাল শুনো। মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়েরা হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছে। তাদের জন্যে ভাত ডাল তরকারি কিনতে এবারডিন মার্কেটে যেতে হবে। তবে
তবে কী?
যাবার আগে দোতলায় রাজনাথ, মুকুন্দ আর আমাকে যে সেলগুলোতে রাখা হয়েছিল, দেখিয়ে দেব। দোতলাটা অবিকল একতলার মতোই। সারি সারি তালাবন্ধ সব কুঠুরি। কোণের দিকের সিঁড়ি দিয়ে বিনয়কে সঙ্গে করে সেখানে উঠে এলেন শেখরনাথ। তাদের তিন বিপ্লবীকে কোথায় কোথায় রাখা হয়েছিল দেখিয়ে তারা ফিরে গেলেন হাসপাতালে।
৩.০৮ মোহনবাঁশি খানিকটা সুস্থ
পরদিন মোহনবাঁশি আরও খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠল। তার ছেলেমেয়ে বউ এবং বিনয়কে নিয়ে অন্য দিনের মতো আজও হাসপাতালে এসেছিলেন শেখরনাথ। ডাক্তার চট্টরাজ তাদের। মোহনবাঁশির কাছে নিয়ে গেলেন। আগের দিন মিনিট তিনেকের বেশি মোহনবাঁশিকে কথা বলতে দেননি তিনি। আজ প্রায় আধঘণ্টা কথা বলল মোহনবাঁশি। ওর স্ত্রী জ্যোৎস্না খুব খুশি। স্বামী বাঁচবে কী বাঁচবে না–এই নিয়ে তীব্র আশঙ্কায় কটা দিন তার কেটেছে। খেতে পারত না, ঘুমোতে পারত না। সারাক্ষণ কাঁদত। কখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, কখনও নিঃশব্দে চোখ থেকে অবিরল জল ঝরে যেত। তার মুখে আজ হাসি ফুটেছে। সে বুঝতে পেরেছে, আর কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ মোহনবাঁশিকে নিয়ে সে জেফ্রি পয়েন্টের রিফিউজি সেটলমেন্টে ফিরে যেতে পারবে।
মোহনবাঁশির বেডের পাশ থেকে এক সময় জ্যোৎস্নাদের দোতলায় নামিয়ে এনে অপেক্ষা করতে বললেন শেখরনাথ। মোহনবাঁশি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পর এখানেই সকালে নটায় এসে সন্ধে অব্দি বসে থাকে জ্যোৎস্না এবং তার ছেলেমেয়েরা। দুপুরে এখানেই তাদের জন্য ভাত-তরকারি মাছটাছ এনে দেন শেখরনাথ। তারপর বিকেলে ভিজিটিং আওয়ার্সে আরও একবার মোহনবাঁশিকে দেখিয়ে তাদের নিয়ে ভাইপোর বাংলোয় ফিরে যান।
জ্যোৎস্নাদের বসিয়ে রেখে বিনয়কে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়লেন শেখরনাথ। তিনি জানেন, সেলুলার জেলে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা কীভাবে ক্ষয় হয়ে গেছে, কতটা ভয়াবহ ছিল তার সেই নরকসের অভিজ্ঞতা তা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে বিনয়। পুরনো দুঃস্বপ্নের সেই স্মৃতিকথা কাল শুরু করেছিলেন। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা!
হাঁটতে হাঁটতে আজও তারা তিন নম্বর ব্লকে চলে এলেন! আজ আর একতলায় নয়; সোজা দোতলায়। শেষ প্রান্তের যে সেলটায় তাকে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে তার গা ঘেঁষে অলিন্দের যে রেলিংটা রয়েছে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। এখান থেকে হাজার দুয়েক ফিট নিচে সিসোস্ট্রেস উপসাগর, যেটা দূর সমুদ্রের দিকে চলে গেছে। সেখানে অগুনতি সিগাল উড়ছিল।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, কাল কোন পর্যন্ত যেন বলেছিলাম? পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল তার। ও, হ্যাঁ। পাশের সেলে বৈজুকে ঢুকিয়ে দিয়ে পেটি অফিসার আসলাম খান চলে গেল। তাই তো?
বিনয় মাথা নাড়ল। হ্যাঁ৷।
.
শেখরনাথ বলতে লাগলেন। আমার সেলটা তো দেখতে পাচ্ছ। পেছনের জানলা এত উঁচুতে যে বাইরের কিছুই দেখা যায় না। দুধারে সলিড ওয়াল। সামনের দিকের দরজার গরাদের ফাঁক দিয়ে বাইরের যা একটু-আধটু চোখে পড়ে। আমি গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সন্ধে আগেই নেমে গিয়েছিল। সেলুলার জেলের সব কয়েদিকে আগেই যার যার কুঠুরিতে ঢোকানো হয়েছিল। তবে সামনের চত্বরে পুলিশের টহলদারি চলছে। দূরে ওয়াচ টাওয়ারের চুড়ো থেকে যেন হাজারটা চোখ মেলে প্রতিটি সেল লক্ষ করছে রাতের প্রহরী। বিকেলের দিকের যখন কয়েদিদের খাবার দেওয়া হচ্ছিল তখনকার ব্যস্ততা হইচই আর নেই। ক্রমশ সব ঝিমিয়ে আসছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি, দাঁড়িয়েই আছি। সেলের এক কোণে খাবার রয়েছে কিন্তু খিদে বা তেষ্টার বোধটাই নেই। দু-চার টুকরো চাপাটি মুখে দিয়ে জল-টল খেয়ে যে শুয়ে পড়ব তেমন ইচ্ছাটাই কেউ যেন হরণ করে নিয়েছে।
রাত বাড়তে থাকে। ক্রমশ বিশাল কয়েদখানা আরও, আরও নিঝুম হয়ে যায়। শুধু কাছের বা দূরের অলিন্দগুলো থেকে সেন্ট্রিদের বুটের আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। আমাদের ব্লকেও তার ব্যতিক্রম নেই। দোতলায় একজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ রাইফেল হাতে অলিন্দের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত একবার গিয়ে আবার ফিরে আসছে। সমস্ত রাতই বুঝিবা এমনটা চলবে।
আমার খুব হাসি পাচ্ছিল। ওয়াচ টাওয়ারে নজরদার, খোলা চত্বরে পাহারাদার, প্রতিটি ব্লকের অলিন্দে পুলিশের টহলমহা পরাক্রান্ত ইংরেজ, যাদের পৃথিবী জোড়া সাম্রাজ্যে নাকি সূর্যাস্ত হয় না, মাত্র কয়েকশো কয়েদি, বিশেষ করে কয়েকটি বিপ্লবী তাদের ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছে। নিরস্ত্র তালাবন্দি পায়ে বেড়ি লাগানো কজন বিপ্লবী বা অন্য কয়েদিরা কখন কী করে বসে সে জন্য দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তাই পাহারাদারির এত নিচ্ছিদ্র আয়োজন। আসলে ব্রিটিশ জাতটাকে সেদিন মনে হয়েছিল অত্যন্ত ভীরু।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।