সঙ্গে সঙ্গে কয়েদিদের লাইনটা পেটি অফিসার আর টিন্ডালরা যেখানে চাপাটিটাপাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে এগিয়ে চলল। পেটি অফিসাররা প্রতিটি কয়েদির থালায় চারটে করে চাপাটি দিতে লাগল। চাপাটি নিয়ে তারা এগিয়ে গেল পাশের দিকে। সেখানে রয়েছে সবজির বালতিগুলো। প্রত্যেকের থালায় দুহাতা করে সবজি দেওয়া হল, তারপর সবার গেলাসে গেলাসে জল।
আমাদের অবশ্য কিউতে দাঁড়াতে হল না। যে ব্রিটিশ অফিসাররা আমাদের নিয়ে এসেছিল তাদের একজন ইন্ডিয়ান। অফিসারটিকে ডেকে বলল, এই ২৪১, ২৪২, ২৪৩ নম্বর কয়েদি আজ নতুন এসেছে, এদের আজ লাইনে দাঁড়াবার দরকার নেই। ওদের খাবার আনিয়ে দাও
শশব্যস্ত ভারতীয় অফিসারটি একজন পেটি অফিসারকে ডেকে আমাদের হাত থেকে থালা-গেলাস নিয়ে চাপাটি-সবজি এবং জল আনিয়ে দিল। এবার ব্রিটিশ অফিসারটি ইন্ডিয়ানটিকে বলল, এরা ড্রেডেড ক্রিমিনাল, টেরোরিস্ট। হায়ার অথরিটির অর্ডার, এদের পায়ে বেড়ি লাগিয়ে সলিটারি সেলে রাখতে হবে। কাল এদের টিকটিকিতে চড়িয়ে দশ ঘা করে বেতের বাড়ি। আন্ডারস্ট্যান্ড?
তক্ষুনি জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল ইন্ডিয়ানটি। –ইয়েস স্যার। ব্রিটিশ অফিসারটি বলল, এই ব্লকের দোতলায় সলিটারি সেল আছে। পেটি অফিসারদের চাবি আর লোহার বেড়ি আনতে বল। এখনই ওদের ঢোকানো হবে।
ইন্ডিয়ানটি পেটি অফিসারদের ডাকল না, নিজেই দৌড়ে গিয়ে কোত্থেকে, যেন চাবির গোছা আর লোহার বেড়ি নিয়ে এল। ব্রিটিশ অফিসারটি বলল, এবার চল। একজন পেটি অফিসারকে সঙ্গে নাও।
আমাদের পাহারা দিয়ে এই তিন নম্বর ব্লকের দোতলায় নিয়ে আসা হল। মুকুন্দ, রাজনাথ আর আমাকে পাশাপাশি রাখা হয়নি। আমার জন্যে ঠিক হল সিসোস্ট্রেস বের দিকের শেষ সেলটা। তারপর পঁচিশ-তিরিশটা সেল-এর পর দোতলার মাঝামাঝি জায়গায় একটা সেল মুকুন্দর আর রাজনাথের সেলটা ওধারের শেষ প্রান্তে।
ইন্ডিয়ান অফিসারটি আমার সেলের তালা খুলে দিল। তার নির্দেশে পেটি অফিসার, পায়ে লোহার বেড়ি পরাল। ব্রিটিশ অফিসারটি পেটি অফিসারকে বলল, এক বালতি পানি আর টাট্টির জন্য প্যান এনে দে। আমাকে বলল, কাল সুবেহ হাত মুখ ধোওয়া, টাট্টি– সব কাম এই পানি দিয়ে সারতে হবে। দুপ্রহরে আর এক বালতি পানি মিলবে গোসলের জন্যে; আউর থোড়া পিনেকো পানি।
আমাকে সেলের ভেতর ঢোকানো হল। পাঁচ মিনিটের ভেতর জল, পায়খানার প্যান চলে এল। সামনের চত্বরে যে থালায় চাপাটি-টাপাটি দেওয়া হয়েছিল সেই খাবারের থালাটাও একধারে রাখল পেটি অফিসারটা। মেঝেতে একটা রোঁয়াওলা কম্বল আর তেলচিটে বালিশও রয়েছে। আমার জন্যে উত্তম। রাজশয্যা। সেগুলো থেকে বোটকা দুর্গন্ধ উঠে আসছিল। আমার আগে আরও কত কয়েদি– বাঙালি, মারাঠি, শিখ, বর্মী— যে ওটার ওপর শুয়ে রাত কাটিয়েছে, কে জানে। আমার গা গুলিয়ে উঠল।
ব্রিটিশ অফিসার, পেটি অফিসার, ইন্ডিয়ান অফিসার এবং আর্মড গার্ডরা আর দাঁড়াল না। বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে রাজনাথ আর মুকুন্দকে নিয়ে চলে গেল।
দশ ফুট লম্বা আট ফুট চওড়া ছোট্ট কুঠুরির দুপাশে নিরেট দেওয়াল। পেছনের দেওয়ালে অনেকটা উঁচুতে ঘুলঘুলির চেয়ে একটু বড় জানলা, তার গায়ে লোহার মজবুত শিক বসানো। সামনের দিকে দরজা। সেই দরজায় গরাদ লাগানো। দরজাটার একধারে বেশ খানিকটা দূরে এমন কায়দায় তালা দেবার বন্দোবস্ত যে ভেতরের কয়েদি যদি কোনওভাবে চাবি জোগাড় করতে পারে, কিছুতেই গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে সেই তালা খুলতে পারবে না। অবশ্য ভেতর থেকে পেছনের জানলা বা সামনের দরজার ফাঁক দিয়ে আকাশের একটা অংশ দেখা যায়। বহুদূর অবধি সেসোস্ট্রেস উপসাগর এবং ছোট ছোট কয়েকটা দ্বীপও চোখে পড়ে। এখন এই যে ব্লকের সামনে খোলা চত্বরটা দেখা যাচ্ছে সেখানে সেই আমলে ছিল লম্বা লম্বা শেড। সেইসব শেডের তলায় সারি সারি ঘানিঘর। ঘানিঘরের কী মহিমা, পরে টের পেয়েছিলাম।
যাই হোক, কুঠুরিতে তো ঢুকলাম। মৃত্যুকে ভয় পেতাম না। পেলে কখনওই বিপ্লবের পথে পা বাড়ালাম না। কিন্তু পায়ে বেড়ি দিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে। এই আশি বর্গফুট এলাকায় সঙ্গে খাওয়া ঘুম পায়খানা পেচ্ছাপ– এসব ভাবতেই আতঙ্কে সারা শরীর হিম হয়ে যাচ্ছে। মনে হয়েছিল বাকি জীবন তো অনেকগুলো বছর, দুচার দিনও কাটবে কি না, কে জানে।
মনে পড়ে কম্বল পেতে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসেছিলাম। তারপর দরজার কাছে এসে গরাদ ধরে বাইরে তাকালাম। নিচের চত্বরে তখনও কয়েদিদের খাবার দেওয়া হচ্ছে।
একসময় সন্ধে নেমে গেল। মাঝখানের উঁচু ওয়াচটাওয়ারটা থেকে সাত দিকে যে সাতটা ব্লক বেরিয়ে গেছে, সর্বত্র অজস্র আলো জ্বলে উঠল। এমনকী সেলুলার জেলের শত শত কুঠুরিতেও।
সব কয়েদিকে খাবার দেওয়া শেষ হলে তারা থালা এবং জল। নিয়ে পেটি অফিসার আর আর্মড পুলিশের পাহারায় অনেকে গেল ব্লকের একতলায়, একদল দোতলায়, বাকি সবাই তেতলায়। চত্বরের ওধারে কোনাকুনি যে ব্লকটা দেখা যাচ্ছিল সেখানেও কয়েদিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কয়েদিদের সেলে ঢুকিয়ে পেটি অফিসাররা তালা লাগিয়ে দিল। প্রতিটি কয়েদির জন্য একটা করে সেল।
আমাদের ব্লকের দোতলাতেও দুড়দাড় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে হইচই। বুঝতে পারছি, বাঁ দিকের সিঁড়ি দিয়ে কয়েদিরা উঠে আসছে। পুলিশ অফিসার, পেটি অফিসাররা চিৎকার করে বাছা বাছা খিস্তি দিতে দিতে তাদের থামাতে চাইছিল।—হল্লা মাত কর রেন্ডিকা বচ্চেলোগ। নেহি তো হাড়ি তোড় দুঙ্গা। বিলকুল চোপ–

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।