এদিকে কেরানিটা মস্ত ঢাউস বাঁধানো খাতা বের করে আমাদের নাম এবং বাড়ির ঠিকানা পড়তে পড়তে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। শেখরনাথ রাহা, রাজনাথ চক্রবর্তী, মুকুন্দ বসাক ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমরা সেলুলার জেলে পৌঁছুবার আগেই আমাদের নামধাম কলকাতা থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেকের নাম ঠিকানা বলার সঙ্গে সঙ্গে একে একে ঘাড় কাত করে সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম। অর্থাৎ কেরানি হেঁকে হেঁকে যা বলছে সব সঠিক।
এবার শূকর-মুখ অফিসার অন্য কেরানিটিকে বলল, সনস বিচদের জেলের উর্দিটুর্দি দাও–
প্রথমবার গালাগালিটা শুনেও চুপ করে থেকেছি। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর পারা গেল না। সহ্য করার শক্তিটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। বললাম, বাবা-মা তুলে গালি দিচ্ছেন কেন?
রাজনাথ আর মুকুন্দও চিৎকার করে উঠেছে, উই প্রোটেক্ট। আমাদের বাবা-মাদের এভাবে নোংরা ভাষায় অপমান করতে পারেন না। আপনারা সিভিলাইজড নেশন বলে গর্ব করেন, এই তার নমুনা?
রাজনাথ গলার স্বর আরও কয়েক পর্দা চড়িয়ে বলল, ইউ মাস্ট অ্যাপোলোজাইস-ইউ মাস্ট অ্যাপোলোজাইস সে যেন উন্মাদ হয়ে গেছে। তার গালের কষ বেয়ে ফেনা বেরিয়ে আসতে লাগল। তোমার মা-বাবাকে যদি এভাবে উদ্ধার করি, কেমন লাগবে?
অফিসার প্রথমটা একেবারে থ হয়ে গেল। বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে এই সেলুলার জেলে এসে সবাই আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকে। কিন্তু তিন টেরোরিস্ট, বিশেষ করে রাজনাথের মতো একজন সদা লাপীর যে এমন সৃষ্টিছাড়া স্পর্ধা হতে পারে, কে ভাবতে পারে। উত্তেজনায় ক্রোধে মুখটা রক্তবর্ণ হয়ে উঠল অফিসারের। দুই চোখ থেকে আগুনের হলকা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। বাজ পড়ার মতো আওয়াজ করে চেঁচিয়ে উঠল, ব্লাডি ডগস, শাট আপা তারপর সেই কেরানিটিকে বলল, এই জানোয়ারগুলোকে পাশের ঘরে নিয়ে যাও। যে দুজন যুবক ব্রিটিশ অফিসার আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল তাদের বলল, পায়ে বেড়ি দিয়ে এদের সলিটারি সেলে রাখবে। আর কাল দুপুরে টিকটিকিতে চড়াবে। টেন ল্যাশেস ইচ।
টিকটিকি বস্তুটির কী মহিমা, তখনও জানি না। ল্যাশ শব্দটা অজানা নয়। সেটা হল কষাঘাত। শুনে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।
আমাদের পাশের ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। দুজোড়া করে নতুন উর্দি, সিলভারের থালা, গেলাস ইত্যাদি দিয়ে গলায় কালো কারে বাঁধা চৌকো লোহার পাত পরিয়ে দেওয়া হল। সেটায় খোদাই করে লেখা আছে– ২৪১। অর্থাৎ তখন থেকে আমি আর শেখরনাথ রাহা নই। আমার পরিচয় ২৪১। দুশো একচল্লিশ নম্বর কয়েদি। একই প্রক্রিয়ায় রাজনাথ হয়ে গেল ২৪২ এবং মুকুন্দ ২৪৩।
কেরানিটি তরুণ অফিসারদের কানে যাতে না যায়, এমনভাবে ফিস ফিস করল, পাশের কামরায় গ্রিনিজ সাহেবের সঙ্গে ওইরকম রাগারাগি না করলেই পারতেন।
ওই শুয়োর-মুখো অফিসারটির নাম যে গ্রিনিজ, সেই প্রথম জানা গেল। কেরানিকে বললাম, আমাদের কী বলে গালাগাল দিচ্ছিল, শুনেছেন তো?
কেরানিটি বলল, শুনেছি।
এসব শোনার পর কারও মাথার ঠিক থাকে, না থাকা উচিত?
কেরানিটি বলল, কী করবেন বলুন; ওরা রাজার জাত। যা বলবে মুখ বুজে সয়ে যেতে হবে।
বাঃ, চমৎকার! একজন ভারতীয় হিসেবে আরেকজন ভারতীয়কে চরম অপমান করছে, দেখেও প্রোটেস্ট করলেন না?
কেরানিটির মুখ কালো হয়ে গেল। ক্ষীণ, ভীরু গলায় বলল, কী করব বলুন! নৌকরি করি; প্রোটেস্ট করলে নৌকরিটা তো যাবেই। টেরোরিস্ট তকমা দিয়ে আমাকে ফাটকে ভরে দেবে। বাকি জীবনটা জেলের ঘানি ঘুরিয়ে কাটিয়ে দিতে হবে। আর আমার মা বাবা বউ বাচ্চা না খেতে পেয়ে মরে যাবে। একটু থেমে বলেছিল, আপনাদের জন্যে আমার খুব ভয় হচ্ছে।
সেই যুবক অফিসার দুটি নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল। হঠাৎ তাদের নজর এসে পড়ল আমাদের ওপর। একজন বলল, অত কী বক বক করছ? চল চল
কেরানিটার মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কী বিষয়ে আমাদের কথা হচ্ছিল যদি দুই অফিসার জানতে চায়, সে বিপদে পড়ে যাবে। কিন্তু অফিসাররা সে ব্যাপারে কৌতূহল দেখাল না। তারা আমাদের তিন রেভোলিউশনারিকে তাড়া দিয়ে নিয়ে চলল।
দুটো ব্লক পেরিয়ে এই তিন নম্বর ব্লকে আমাদের নিয়ে আসা হল। তখন সামনের চত্বরে লাইন দিয়ে অনেক পুরনো কয়েদি দাঁড়িয়ে আছে। সবার হাতে সিলভারের থালা এবং গেলাস। একধারে উঁচু টেবিলের ওপর কাঠের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কড়াতে পুরু পুরু চাপাটির স্তূপ আর বড় বড় সিলভারের বালতিতে সবজি। বিরাট দুটো ড্রামে খাওয়ার জলও রয়েছে। তিন জন পেটি অফিসার আর দুজন টিল্ডালকেও দেখা গেল। তারা খাদ্যবস্তুগুলো দেওয়ার জ্য হাতা এবং মগ নিয়ে অপেক্ষা করছে। এছাড়া রয়েছে বন্দুক হাতে এক দঙ্গল পুলিশ এবং একজন। ইন্ডিয়ান পুলিশ অফিসারও।
সূর্য তখন মাউন্ট হ্যারিয়েটের পেছন দিকে নেমে গেছে। তবে সন্ধে নামতে খানিকটা দেরি ছিল। দিনের শেষ ফিকে আলো চারদিকের পাহাড়, টিলা, উপসাগর আর বিশাল বিশাল মহাবৃক্ষের গায়ে আলগাভাবে লেগে আছে৷ সমুদ্রের ওপর দিয়ে। অজস্র সি-গাল পাখি ঝাঁকে ঝাকে পাড়ের গাছপালার দিকে উড়ে যাচ্ছে। সারাদিন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাছ শিকার করে খেয়েছে। পেট বোঝাই, রাতটা বিশ্রাম দরকার।
ইন্ডিয়ান সেই পুলিশ অফিসারটি– সে কোন প্রভিন্সের লোক কে জানে, কর্কশ স্বরে হুকুম দিল। –খানা চালু কর।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।