হ্যাঁ, চল—
বিনয় নীরবে একটা চেয়ারে বসে ছিল। মোহনবাঁশি যমের ঘর থেকে ফিরে এসে কথা বলতে পারছে, এটা বিরাট সুখবর। তার বউ ছেলেমেয়েদের পক্ষে তো বটেই, আন্দামানের উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের পক্ষেও। লোকটা মরে গেলে জেফ্রি পয়েন্টের রিফিউজিদের সেই বিজন অরণ্যে ধরে রাখা যেত না। তারা কলকাতায় ফিরে যাবার জন্য তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়ত। আর এই খবরটা কোনওভাবে কলকাতায় পৌঁছে গেলে সেখান থেকে আর উদ্বাস্তু আনা সম্ভব হত না। এত বড় একটা পরিকল্পনা, এত মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেস্তে যেত। বিনয়ের কী ভালো যে লাগছিল। সে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের সঙ্গে যেন সাতপাকে জড়িয়ে গেছে। এদের ভালো হলে তার অপার আনন্দ, এদের অনিষ্ট হলে সেটা যেন তার নিজস্ব ক্ষতি।
তেতলার কেবিনেই রাখা হয়েছিল মোহনবাঁশিকে। এ কদিন সে ছিল অচৈতন্য, চোখ বোজা। আজও আচ্ছন্নতার ঘোর পুরোপুরি কাটেনি। তবে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে।
জারোয়াদের তির মোহনবাঁশির বুকে বেঁধার পর থেকে জ্যোৎস্না যেন উন্মাদের মতো হয়ে গিয়েছিল। কখনও অঝোরে কাঁদত, কখনও বা নিঝুম বসে থাকত।
আজ মোহনবাঁশিকে তাকাতে দেখে বিপুল আবেগে আনন্দে জ্যোৎস্না তার উপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, সেই সঙ্গে সমানে ফুঁপিয়ে চলেছে। ডাক্তার চট্টরাজ তার দুহাত ধরে ফেললেন, না, না, ওর কাছে যেও না; দূর থেকে একটু কথা বল—
জ্যোৎস্নার চোখ বেয়ে অঝোরে জল ঝরছে। সে বলল, অহন কেমুন লাগতে আছে তুমার?
নির্জীব, ভঙ্গুর একটু হাসি আবছাভাবে ফুটে ওঠে মোহনবাঁশির মুখে। –ভালা। এই যাত্রা বাইচা গেলাম।
ডাক্তার চট্টরাজ তাড়া দিলেন।—-দেখা হয়েছে, কথা বলেছ। আর নয়। সবাই নিচে চল—
আমারে হের কাছে আরেট্টু থাকতে দ্যান ডাক্তারবাবু৷ কতদিন মানুষটা কথা কইতে পারে নাই। বেহুঁশ হইয়া আছিল–জ্যোৎস্না কাকুতি মিনতি করতে লাগল।
না। বেশি কথা বললে মোহনবাঁশির ক্ষতি হবে। এখন চল। বিকেলে আবার তোমাদের ওর কাছে নিয়ে আসব।
দোতলায় নেমে একবার জ্যোৎস্না ডাক্তার চট্টারাজের পায়ে পড়ে, একবার শেখরনাথের। এমনকী বিনয়ের পায়েও। সমানে অধীরভাবে বলে যেতে থাকে, আপনেরা ভগমান। মানুষটারে বাঁচাইয়া দিলেন। আপনেগো দয়া কুনুদিন ভুলুম না। কৃতজ্ঞতা জানাতে একটি অশিক্ষিত, সরল রমণী আর কী-ই বা করতে পারে।
শেখরনাথ জ্যোৎস্নার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে সদয় কণ্ঠে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে। দেখলে তো মোহনবাঁশি আজ দু-চারটে কথা বলেছে। দেখবে ওবেলা আরও বেশিক্ষণ বলতে পারবে। সব ভয় কেটে গেছে। তোমরা শান্ত হয়ে এখানে বসে থাকো। আমরা একটু ঘুরে আসি। দুপুরে তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসব।
জ্যোৎস্না আস্তে মাথা হেলিয়ে দেয়। –আইচ্ছা
শেখরনাথ এবার বিনয়ের দিকে তাকালেন। –চল, তোমাকে নিয়ে তিন নম্বর ব্লকটায় যাওয়া যাক। কাল তোমাকে সেলুলার জেলে আমার অভিজ্ঞতার কথা সামান্য একটু শুনিয়েছিলাম। আজ তারপর থেকে কিছুটা শোনাব। এত বছরের এত অজস্র ঘটনা তো দু-একদিনে বলে শেষ করা যায় না। রোজ জেলখানা দেখাতে দেখাতে কিছু কিছু শুনিয়ে যাব। তাহলে ব্রিটিশ আমলের এই সেলুলার জেল, যাকে বলা যায় ইস্টার্ন ওয়ার্ডের বাস্তিল, সম্বন্ধে তোমার মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে যাবে।
হাসপাতালের ব্লকটা পেছনে ফেলে শেখরনাথের সঙ্গে জনমানবহীন তিন নম্বর বিশাল বিল্ডিংটায় পৌঁছে গেল বিনয়।
সামনের আগাছায় ভরা মস্ত চত্বরটা পেরিয়ে কয়েকটা স্টেপ ভেঙে ওপরের টানা অলিন্দে উঠে এল দুজনে।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, কাল কোন অবধি যেন শুনেছিলে?
বিনয় মনে করিয়ে দিল। সেলুলার জেলের জেলর বিপ্লবী রাজনাথ চক্রবর্তীকে শাসিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই জেলখানার ভেতর কয়েদিদের, বিশেষ করে টেরোরিস্টদের শায়েস্তা করার জুন্য তিনটে ফাঁসিঘর আছে। একজন জুনিয়র অফিসারকে বলেছিলেন, সেগুলো শেখরনাথদের দেখিয়ে দিতে। তারপর তার চেম্বার থেকে সবাইকে বের করে দিয়েছিলেন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। এদিকে এসো–তালাবন্ধ কুঠুরির পর কুঠুরির পাশ দিয়ে উত্তর দিকের শেষ মাথায় বিনয়কে নিয়ে এলেন শেখরনাথ। এখান থেকে কোনাকুনি সমুদ্র চোখে পড়ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি শুরু করলেন, জেলরের চেম্বার থেকে সেই দুই জুনিয়র পুলিশ অফিসার জেলের অন্য একটা অফিসে নিয়ে গিয়েছিল। ফেউয়ের মতো আর্মড গার্ডরাও আমাদের পিছু পিছু গেছে।
সেখানে যে অফিসারটি ছিলেন তার আকৃতি জেলরের মতো বিপুল না হলেও তাগড়াই মজবুত চেহারা। মুখটা বুনো শুয়োরের মতো। চুলের মাঝখান দিয়ে সিথি। কুতকুতে চোখের চাউনি এত তীব্র যে তার দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। রাজনাথের মতো দুঃসাহসিক ছেলেও একবার তার দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল।
এই চেম্বারে অফিসারটি ছাড়া আরও দুজন কেরানি ধরনের কর্মচারী ছিল। তারা ভারতীয়। তাদের একজনকে ঘোঁত ঘোঁত করে অফিসার বললেন, রেকর্ড বুক দেখে এই বাস্টার্ডদের নাম ঠিকানা মিলিয়ে নাও।
এর আগে রেগুলেশন অ্যাক্ট থ্রি আর বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-এ বারকয়েক ধরা পড়ে আলিপুর জেল, দমদম জেল, মেদিনীপুর জেল– এমনি নানা কয়েদখানায় কয়েকবছর কাটিয়েছি কিন্তু কোনও জেলর বা ডেপুটি জেলর আমাদের বেজন্মা বলে গালাগাল দেয়নি। শরীরের সব রক্ত মাথায় উঠে টগবগ করে ফুটছিল। দাঁতে দাঁত চেপে কোনওরকমে প্রচণ্ড ক্রোধটা সামলাচ্ছিলাম।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।