টেবিলের এধারে কয়েকটা আরামদায়ক চেয়ার। সেগুতে আপাতত ফাঁকা। স্যালুটের জবাবে কোনওরকম প্রতিক্রিয়া দে গেল না। তিন অফিসারের দিকে ফিরেও তাকালেন না জেলর। তাঁর চোখ দুটো আমাদের মুখের ওপর স্থির হয়ে আছে। এমন চাউনি আগে কখনও দেখিনি। মনে হচ্ছিল হাড়মাংস ভেদ করে আমাদের বুকের ভেতর অবধি দেখে নিচ্ছে।
চোখের পাতা পড়ছিল না লোকটার। আমাদের শিরদাঁড়ার ভেতর দিয়ে অদ্ভুত এক কনকনে শিহরণ খেলে যাচ্ছিল। অনেকক্ষণ পর জেলর বললেন, ওয়েলকাম টু সেলুলার জেল। মনে রেখো, ইন্ডিয়ায় এর চেয়ে বড় নরক আর কোথাও নেই। এটা অ্যাবসোলিউটলি আমার রাজ্য। এখানে কোনওরকম বজ্জাতি আমি বরদাস্ত করি না।
আমরা কোনও উত্তর দিলাম না।
জেলর বলতে লাগলেন, তোমাদের মতো টেররিস্টরা স্বাধীনতার খোয়াব ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডে ফেলে এখানে আসে।
আমাদের মধ্যে চরম দুঃসাহসী ছিল রাজনাথ চক্রবর্তী। ফরিদপুরের ছেলে। একুশ-বাইশের বেশি বয়স হবে না। সে হঠাৎ বলে উঠল, আমরা টেররিস্ট নয়, ফ্রিডম ফাইটার।
আমার সমস্ত অস্তিত্ব আমূল কেঁপে গিয়েছিল। আমরা কেউ ভীরু, কাপুরুষ নই। কিন্তু ওই হিংস্র বুলগের মুখের ওপর কেউ ওভাবে বলতে পারে কল্পনা করতে পারিনি। চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করলাম, জেলরের লাল মুখটা গনগনে হয়ে উঠেছে। বারুদের স্কুপে যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে রাজনাথ। সেই মুহূর্তে যেন বিস্ফোরণ ঘটে যাবে। আমার বুকের ধুকধুকুনি থেমে গিয়েছিল। কিন্তু না, তেমন কিছুই হল না। জেলর যেন বেশ আমোদই বোধ করলেন। চোখ ছোট করে ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ফ্রিডম ফাইটার! তোমাকে কেউ বলেনি ইংরেজ রাজত্বে কোনও নেটিভের মুখ থেকে ফ্রিডম শব্দটা বেরুনো ক্রাইম!
রাজনাথ চুপ করে থেকেছে, জবাব দেয়নি।
জেলর বলেই যাচ্ছিলেন, তোমার বয়স কম, এখনও তেজ একটু-আধটু থেকে গেছে। কালাপানি কী বস্তু তুমি জানো না। শান্তশিষ্ট হয়ে থাকলে কোনও সমস্যাই নেই৷ আনন্দে বাকি জীবনটা জেলখানার সেলে কাটিয়ে দাও।
রাজনাথ পলকহীন জেলরের তাকানো, কথা বলার ভঙ্গি, রি। থুতনি এবং ঠোঁটের নড়াচড়া লক্ষ করছিল। বলল, বাকি জীবন কাটানোর মতো ধৈর্য আমার নেই জেলর সাব। তারআগেই ইন্ডিয়া স্বাধীন হয়ে যাবে।
জেলরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। পৃথিবীজোড়া মহান ব্রিটিশ এম্পায়ারে কোনও কলোনি কোনওদিন স্বাধীন হয়নি; হবেও না। তুমি কেন, তোমার পর হানড্রেড জেনারেশন পার হয়ে গেলেও ইন্ডিয়া ইংল্যান্ডের বুটের তলায় থেকে যাবে। আগেও বলেছি, এখনও বলছি, গোলমাল পাকাবার চেষ্টা কোরো না। আমাদের। ডানপাশে যে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারটি দাঁড়িয়ে আছে তাকে বললেন, এই নোংরা পোকাগুলোকে নিয়ে যাও। দু-একদিনের মধ্যে সেলুলার জেলে যে তিনটি ফাঁসিঘর আছে ওদের দেখিয়ে দিও। ফের তার চোখজোড়া রাজনাথের দিকে ফিরে এল। — বুঝলে ছোকরা, এই জেলখানা তৈরি হবার পর তোমার মতো কয়েকশো বেয়াদপ কয়েদিকে এখানে ফাঁসিতে চড়ানো হয়েছে। বি কেয়ারফুল। নাউ স্টিফেন গো– বলে আঙুল তুলে দরজা দেখিয়ে দিল।
.
প্রায় এক নিঃশ্বাসে পুরনো দিনের কথা বলতে বলতে একটু হাঁপিয়ে পড়েছিলেন শেখরনাথ। অফুরান কৌতূহল নিয়ে শুনে যাচ্ছিল বিনয়। উনিশশো আটাশ সালের সেলুলার জেলের টুকরো টুকরো ছবি অদৃশ্য সিনেমার পর্দায় যেন ফুটে উঠছিল। মোহনবাঁশির স্ত্রী ছেলেমেয়েদের এক নম্বর ব্লকে হাসপাতালের বারান্দায় বসিয়ে তারা নির্জন তিন নম্বর ব্লকে চলে এসেছিল। একতলার টানা বারান্দা ধরে দোতলার দিকে যেতে যেতে কখন যে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, খেয়াল নেই।
বিনয় বলল, তারপর?
ফের শুরু করতে গিয়ে হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ চলে গেল শেখরনাথের। সূর্য মাথার উপর উঠে এসেছে। আঁ আঁ করছে রোদ। তিন নম্বর এবং চার নম্বর ব্লকের ফাঁক দিয়ে সিসোস্ট্রেস উপসাগরের লম্বা একটা ফালি চোখে পড়ে। রোদে ঝলকাচ্ছে সমুদ্রের উঁচু উঁচু ঢেউগুলো। সেখান থেকে তীব্র ঝাঁঝ।
হঠাৎ শেখরনাথের মনে পড়ল, মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়েদের দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তার নিজেরও খিদে পেয়েছে। নিশ্চয় বিনয়েরও। ব্যস্তভাবে বললেন, আজ আর না; খাবার কিনতে এবারডিন মার্কেটে যেতে হবে। কাল আবার এখানে আসব। তখন পুরনো দিনের আরও ইতিহাস শোনাব।
বিনয় আর কিছু বলল না। সিঁড়ি দিয়ে নিচের চত্বরে নেমে হাসপাতালের দিকে এগিয়ে চলল।
৩.০৭ আবার হাসপাতাল
পরদিন সকালে স্নানটান সেরে কিছু খেয়ে জ্যোৎস্না এবং তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে আবার হাসপাতাল।
আজ মোহনবাঁশি অনেকটা ভালো। নাক থেকে অক্সিজেনের নল সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে স্যালাইন চলছে। বিপদ প্রায় কেটেই গেছে।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, পুরোপুরি চিন্তামুক্ত। হাসিমুখে শেখরনাথকে বললেন, কাকা, মোহনবাঁশি বেঁচে গেল। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে। আরও একটা উইক তাকে হাসপাতালে রাখব। তারপর ছুটি।
শেখরনাথ বললেন, এক উইক কেন, যতদিন তাকে রাখা দরকার ততদিন থাকবে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।
আজ দু-একটা কথা বলতে পারছে। ওর স্ত্রী ছেলেমেয়েরা নিশ্চয় এসেছে?
হ্যাঁ
চলুন, ওদের সঙ্গে মোহনবাঁশির দেখা করিয়ে দিই। স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারলে তার দুশ্চিন্তা কাটবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।