আধঘণ্টার মতো হাঁটার পর আমরা সেলুলার জেলের গেটের সামনে চলে এলাম। বাংলাদেশে আরও দু-চারটে জেলে কিছুদিন থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কিন্তু ভয়ংকর চেহারার মজবুত লোহার ফটক আগে কখনও দেখিনি। তিরিশ-চল্লিশ জনের একটা পুলিশ বাহিনী সেখানে রাইফেল হাতে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। কঠোর, নিষ্ঠুর মুখ। মনে হয় পাথরে তৈরি। দু-চারজন ইংরেজ অফিসারও চোখে পড়ল। বিপ্লবীদের সঙ্গে জীবনমৃত্যুর মাঝখানের তফাতটা এক চুলও নয়, তবু এদের তদারকিতে বাকি জীবন কাটাতে হবে ভাবতেই বুকের ভেতরটা আমূল কেঁপে গেল। নির্মম দৃষ্টিতে তারা আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে একটা কথাও নেই। যে বাহিনীটা জেটি থেকে আমাদের নিয়ে এসেছিল, গেটের একজন অফিসার তাকে ভেতরে যাবার জন্যে হাত নেড়ে ইশারা করল।
গেট পেরিয়ে সেলুলার জেলে পা রাখলাম। ভেতরে চত্বরে তখন অনেক পুরনো কয়েদি লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবার গলায় কালো মোটা সুতোয় লোহার চৌকো ফলক ঝুলছে। দু ইঞ্চির মতো লম্বা, দেড় ইঞ্চির মতো চওড়া, একই মাপের। প্রতিটি ফলক। সেগুলোতে নম্বর খোদাই করা রয়েছে। এক, দুই, তিন, চার…। দাড়ি পাগড়ি দেখে কে শিখ, কে মুসলমান আন্দাজ করা যাচ্ছিল। মোঙ্গোলিয়ান মুখ দেখে বর্মি আর কারেনদের চিনতে পারছিলাম। অন্য সবাই কারা কোন প্রভিন্স থেকে এসেছে বোঝা যায়নি। তবে এদের সঙ্গে বাকি জীবন যখন কাটাতে হবে তখন নিশ্চয়ই চিনতে পারব। রাইফেল হাতে এক দঙ্গল পুলিশ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তাদের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল। তিন-চারজন ইংরেজ অফিসারও রয়েছে। একজন কয়েদি, তার গলায় ফলকে লেখা পেটি অফিসার স্কুলে যেমন রোল কল করা হয় সেইভাবে হেঁকে যাচ্ছিল, সাত-আট নে- দশ সঙ্গে সঙ্গে ওই সব নম্বরধারী কয়েদিরা হাজির বলেই লাইন থেকে বেরিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল। এই বিচিত্র রোল কলের কারণটা সেদিন বোধগম্য হয়নি, পরে বুঝতে পেরেছিলাম।
আমাদের দেখে পুরনো কয়েদিদের মধ্যে তুমুল চাঞ্চল্য দেখা দিল। তারা হই হই করে উঠল, নয়া মেহমান আ গিয়া রে, নয়া মেহমান আ গিয়া
কঁহাসে আয়া তুলোগ? বঙ্গালি, বিহারি, পাঠান, মারাঠি? কিতনা আদমিকো খতম কিয়া রে?
অর্থাৎ আমরা যারা সেলুলার জেলে প্রথম পা ফেললাম তারা ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডে কে কটা খুন করে এসেছি সেটাই তারা জানতে চাইছে। পরে জেনেছিলাম, যে যত বেশি হত্যা করেছে, কালাপানির এই জেলখানার বাসিন্দাদের চোখে তার কদর, তার কৌলীন্য অন্যদের তুলনায় শতগুণ বেশি।
এদিকে ইংরেজ অফিসাররা কোমরের খাপ থেকে পিস্তল বের করে কয়েদিদের দিকে তাক করে গর্জে উঠেছে, শাট আপ শালেলোগ পেটি অফিসার গলার স্বর আরও সাত পর্দা চড়িয়ে দিল। কুত্তাকা বাচ্চা, বিলকুল খামোস। মুহসে আওয়াজ নিকালে তো গলার নলিয়া ছিঁড়ে ফেলব। তারপর পুরনো কয়েদিদের বাপ-মা চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে একটানা কিছুক্ষণ বাছা বাছা খিস্তি চলল।
আমরা যারা নতুন আন্দামানে এলাম, জাহাজে এবং জাহাজ থেকে নামার পর যেমনটা করা হয়েছিল, জেলখানাতেও তার তফাত কিছু ঘটল না। অন্য কয়েদিদের পাহারা দিয়ে ডানপাশের। অন্য একটা ব্লকের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। আর আমাদের তিন বিপ্লবীকে পুলিশরা চারপাশ থেকে ঘিরে বাঁ-ধারের অন্য একটা ব্লকে আনাল। ইংরেজ গভর্নমেন্টের চোখে সশস্ত্র বিপ্লবীরা যে কতটা ভয়ংকর, কতখানি বিপজ্জনক, মহারাজা জাহাজে ওঠার সময় থেকেই টের পেয়েছিলাম। কলকাতা থেকে আটশো মাইল দূরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন আন্দামান দ্বীপে এসে দেখা গেল, হাল একই। যতই পৃথিবী নামে গ্রহটির সবচেয়ে শক্তিধর জাতি হিসেবে ওরা দম্ভে ফেটে পড়ুক, ভারতীয় বিপ্লবীদের ওরা মনে মনে যমের মতো ভয় পায়।
আমাদের যে ব্লকটার সামনে নিয়ে আসা হল সেখানেও খোলা চত্বরে পুরনো কয়েদিদের লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে রোল কল করা হচ্ছিল। চেনা দৃশ্য। একটু আগেই এমনটা দেখে এসেছি। এই কয়েদিরা কিন্তু কোনও আগ্রহ দেখাল না। আমাদের দিকে নিস্পৃহ চোখে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। ..
এধারের ব্লকটার পাশে একটা বড় দোতলা বিল্ডিং। সেটার চারপাশে রাইফেল হাতে পঁচিশ-তিরিশ জন সেন্ট্রি। এদের কেউ ভারতীয় নয়, সব ব্রিটিশ। পঁচিশ-তিরিশ হাত দূরে দূরে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
যারা পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছিল তাদের অপেক্ষা করতে বলে তিন ইংরেজ পুলিশ অফিসার আমাদের বলল, কাম অন
দোতলা বিল্ডিংটার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে ফুলে বাগান। মাঝখান দিয়ে সুরকির পথ সোজা বাড়িটায় গির থেমেছে। অফিসারদের সঙ্গে পথটা পেরিয়ে তিনটে স্টেপ ওপ উঠতেই দেখা গেল চওড়া বারান্দা। সেটার একধার দি দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। অফিসাররা আমাদের দোতলায় এক ঘরের দরজার সামনে এনে দাঁড় করাল। দরজার পাশে দেওয়ালে পেতলের চকচকে মস্ত ফলকে লেখা: জেল সেলুলার জেল। পোর্ট ব্লেয়ার।
দরজায় দামি পর্দা ঝুলছিল। বাইরে থেকে একজন অফিসা সসম্ভ্রমে বলল, মে উই কাম ইন স্যার
ভারী গমগমে স্বর ভেসে এল। কাম ইন–
পরদা ঠেলে তিন অফিসার আমাদের নিয়ে ভেতরে বুটে ঠুকে স্যালুট করল।
কামরাটা বিশাল। ভারী ভারী ক্যাবিনেট দিয়ে সাজানো। সিনি থেকে চার ব্লেডওয়ালা ফ্যান ঝুলছে। তাছাড়া হাতে টানা ম পাখাও আছে। পুরো মেঝে জুড়ে দামি পার্সিয়ান কাপে মাঝখানে মস্ত সেক্রেটারিয়েট গ্লাসটপ টেবিলের ওধা গদিমোড়া হাতলওলা চেয়ারে যিনি বসে আছেন তাঁর দিে তাকালে রক্ত হিম হয়ে যায়। বিপুল শরীরের ওপর বুলন্ডগে মতো প্রকাণ্ড একটা মুণ্ডু ঠেসে বসিয়ে দিলে যেমন দেখায়, হুব সেই রকম। চোখের তারা দুটো বাদামি। ছড়ানো চৌকো চোয়াল। বাঘের থাবার মতো দুটো হাত। পুরু ঠোঁট।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।