সেটা ছিল খুব সম্ভব অক্টোবর মাস। মনসুনের দাপট আর নেই। পুজো শেষ হয়েছে তার কয়েকদিন আগে। সমুদ্র শান্ত থাকার কথা। কিন্তু বে অফ বেঙ্গল আর বে অফ বিস্কে সৃষ্টিছাড়া সমুদ্র। মনসুনই হোক বা বছরের অন্য যে কোনও সময়ই তোক, কখন যে খেপে উঠবে, আগে তার আঁচ পাওয়া যায় না। খিদিরপুর থেকে জাহাজ ছাড়ার পরের দিন বিকেলের দিকে উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে হঠাৎ কালো কালো পাহাড়ের মতো মেঘ ধেয়ে এসে সারা আকাশ ছেয়ে ফেলল। বঙ্গোপসাগর চোখের পলকে উন্মাদ হয়ে উঠেছে। তার ঘাড়ে যেন লক্ষ কোটি অশরীরী জিন কয়েদিদের ভর করেছে। পারাপারহীন, খোলা সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রায় একশো মাইল বেগে ঝোড়ো হাওয়া। বইতে লাগল। আট দশ মাইল জুড়ে ঢেউয়ের পর ঢেউ দেড়শো দুশ ফিট উঁচু হয়ে মোচার খোলার মতো মহারাজা। জাহাজটাকে একবার মহাশূন্যে তুলে পরক্ষণে পাতালে আছড়ে ফেলছে। ঝড়ের সঙ্গে শুরু হয়েছে তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির ঝাঁপটা তো আছেই, সেই সঙ্গে ঢেউগুলো প্রবল আক্রোশে একতলা দোতলা তেতলার ডেকের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই আওয়াজ করে বয়ে যাচ্ছে। শরৎচন্দ্রের লেখায় সাইক্লোনের কথা পড়েছি। সেটা যে কতখানি ভয়ংকর, সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম।
মনে হয়েছিল, আমাদের অদৃষ্টে আর সেলুলার জেলে বাকি জীবন কাটাবার সৌভাগ্য হবে না। তার আগেই অতবড় দশ বারো টনের বিশাল জাহাজটা কয়েদি এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন, ছোট বড় নানা অফিসার এবং কয়েক ডজন লস্করসুদ্ধ জলের তলায় ডুবে যাবে। যদি তাই হত, একরকম বেঁচে যেতাম। কিন্তু কপালে উনিশ বছর সেলুলার জেলের নরকযন্ত্রণা লেখা আছে, সেটা খণ্ডাবে কে?
অফুরান আগ্রহে শুনে যাচ্ছিল বিনয়। বলল, আমি যখন আসি তখনও সমুদ্রে সাইক্লোন হয়েছিল। সেটা কিন্তু মনসুনের সময় নয়।
শেখরনাথ বললেন, এটাই বে অফ বেঙ্গলের ক্যারেক্টার তার মতিগতি বোঝা ভার। কখন যে কী করে বসবে তার ঠিক ঠিকানা নেই। তারপর শোন। আগে দুচারবার লঞ্চে যে চড়িনি তা নয়। কিন্তু সেগুলো চলত নদীর ওপর দিয়ে। মাত্র দু-এক ঘণ্টার ব্যাপার। জাহাজে সমুদ্রযাত্রা আমার সেই প্রথম। সাইক্লোনের মধ্যে পড়াও প্রথম। কেবিনের পুরু কাচের জানলা জাহাজের গায়ে শক্ত করে ঠেসে আটকানো ছিল। সেটা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই ছিলাম। কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অন্ধকার। যেন কালো পিচে ঢাকা। এদিকে রোলিং আর পিচিংও শুরু হয়েছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন, অফিসার আর লস্কররা ছিল এক্সপার্ট। এবং দুঃসাহসীও। সাইক্লোনের মুখে কী করতে হয় তারা জানে। বিশাল বিশাল ঢেউ কাটিয়ে কাটিয়ে কখনও ওপরে উঠে, কখনও নিচে নেমে জাহাজ এগিয়েই চলছিল। কোন দিকে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। ভেবেছিলাম যে কোনও মুহূর্তে সলিল সমাধি ঘটে যাবে। মৃত্যু একেবারে অবধারিত। কিন্তু টের পাচ্ছিলাম বেঁচে আছি, বেঁচে আছি।
আন্দাজ ছসাত ঘণ্টা পর সাইক্লোনের তাণ্ডব কমে এল। সমুদ্র শান্ত হয়ে আসছে। উথালপাতাল ঢেউয়ে জাহাজের তুমুল দোলানিতে হাড়গোড় বোধহয় আস্ত ছিল না। কখন নির্জীব হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুম ভেঙে ছিল পরদিন সকালে। বঙ্গোপসাগর তখন ভারী শান্ত। আগের দিনের বিকেল থেকে কয়েকটা ঘণ্টা সেটা যে অলৌকিক এক মহাদানব হয়ে উঠেছিল, বোঝাই যায় না। গ্রামের কোনও নিরীহ জলাশয়ের মতো দিগন্ত জুড়ে সেটা পড়ে আছে। দিনের প্রথম নরম সোনালি রোদ ছোট ছোট ঢেউগুলোর ওপর ঝিলমিল করছে।
শুনতে শুনতে বিনয় অবাক। কলকাতা থেকে আসার সময় এমন অভিজ্ঞতাই হয়েছিল তারও। সাইক্লোনের সময় সমুদ্র বুঝি বা এইভাবেই জাহাজের যাত্রীদের সঙ্গে একইরকম মশকরা করে থাকে। সে জিগ্যেস করল, তারপর কী হল কাকা?
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, ফোর্থ ডে বিকেলে আমরা পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছলাম। চ্যাথাম জেটিতে তখন কলকাতা কি মাদ্রাজের জাহাজ এসে ভিড়ত। কখনও কখনও রস আইল্যান্ডের জেটিতে। কিন্তু সেইসময় কী একটা অসুবিধা হওয়ায় মহারাজা জাহাজ রস বা চ্যাথামে ভেড়েনি। রস-এর উলটো দিকে সিসোস্ট্রেস বের এধারে যে জেটিটা রয়েছে সেখানে এসে নোঙর ফেলেছিল। তখন এই জেটিটা ছিল অনেক বড়।
বিনয়ের মনে পড়ল সে যখন রিফিউজিদের সঙ্গে আন্দামান। আসে জাহাজ রস আইল্যান্ডে ভেড়ে। সেখান থেকে ছোট ছোট লঞ্চে তাদের তুলে কয়েকবারে সেসষ্ট্রেস বের এধারের জেটিতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
শেখরনাথ বলেছিলেন, সেই আটাশ সালে আমাদের তো জাহাজ থেকে নামানো হল। সঙ্গে অন্য কয়েদিদেরও। পায়ের বেড়ি অবশ্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের অভ্যর্থনার জন্য অনেক আগে থেকেই প্রচুর আর্মড পুলিশ মোতায়েন ছিল। পুলিশে পুলিশে জেটির চারপাশ ছয়লাপ। তারা দুটো দলে ভাগ হয়ে একটা দল সাধারণ কয়েদিদের ঘিরে ফেলল। আমাদের তিনজন রেভোলিউসনারির জন্যে রাজকীয় বন্দোবস্ত। শদেড়েক সাধারণ কয়েদির জন্যে চল্লিশ জন পুলিশ এবং একজন ব্রিটিশ অফিসার। আমাদের তিনটি প্রাণীর জন্য বারোজন পুলিশ এবং তিনজন ইংরেজ অফিসার। কতখানি মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল ভেবে দেখ। অন্য কয়েদিদের দুপাশে এবং পেছনে পুলিশ, সামনে অফিসার। আমাদেরও তাই। তবে একসঙ্গে অন্য কয়েদিদের সঙ্গে আমাদের আনা হয়নি। শোভাযাত্রা করে টিলার পর টিলা পেরিয়ে ওরা খানিকটা এগিয়ে যাবার পর, আমাদের যাত্রা শুরু হল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।