ওয়াচ টাওয়ার আগেও চোখে পড়েছে বিনয়ের। তবু সেদিকে তাকাল সে৷ টাওয়ারটা মাঝখানে রেখে একসময় সেটার গা থেকে জেলখানার সাতটা তিনতলা উইং সাতদিকে সামান্য কোনাকুনি বেরিয়ে গেছে। সাতটার সবগুলোই টিকে নেই। জাপানি বোমায় একটা ভেঙে গিয়েছিল; একটা ভূমিকম্পে শেষ।
শেখরনাথ বললেন, ওই উঁচু ওয়াচ টাওয়ারটার একটা স্পেশাল ব্যাপার আছে।
কী ব্যাপার? বিনয় উৎসুক হল।
ওটার টপ ফ্লোর থেকে জেলখানার প্রায় প্রত্যেকটা সেল দেখা যায়। ইংরেজরা আর্কিটেকচারটা কেমন আটঘাট বেঁধে তৈরি করেছিল ভেবে দেখ। ব্রিটিশ পুলিশ অফিসাররা পালা করে। টাওয়ারটা থেকে দিনরাত কয়েদিদের ওপর নজরদারি করত। কেউ কোনও মতলব আঁটছে কি না সেটা বুঝতে চেষ্টা করত। তাছাড়া প্রতিটি ব্লকের সামনের খোলা চত্বরে অন্য সেন্ট্রিরা তো ছিলই। তাদের কেউ কেউ ব্রিটিশ, তবে বেশিরভাগই ইন্ডিয়ান।
বারান্দায় শেখরনাথ আর বিনয়ের পায়ের আওয়াজ ছাড়া কোথাও বিশেষ শব্দ নেই। তবে সামনের খোলা চত্বরের ঘাসবন। আর আগাছার জঙ্গল থেকে ঝিঁঝিদের একটানা কনসার্ট উঠে আসছে; মাঝে মাঝে কোনও গাছের ডালে কাঠঠোকরারা ধারালো ঠোঁটে সমানে তুরপুন চালাচ্ছে। ঠক ঠক ঠক ঠক।
বিনয় বলল, মাঝখানে উঁচু টাওয়ারটা থেকে পাহারাদারির কথাটা আমি দু-একটা বইয়ে পড়েছি।
শেখরনাথ বললেন, তাছাড়া, একতলা থেকে তেতলা অব্দি প্রতিটি ফ্লোরের বারান্দায় টহল দিত টিল্ডাল আর পেটি অফিসাররা। তাদেরও একটা বড় কাজ ছিল কয়েদিদের ওপর নজর রাখা। ব্রিটিশ কি ইন্ডিয়ান সেন্ট্রিদের তুলনায় এরা ছিল আরও মারাত্মক। পরে তাদের মহিমা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।
বিনয় জিগ্যেস করল, টিন্ডাল আর পেটি অফিসার কাদের বলা হত? নজরদারি ছাড়া তাদের কী কাজ ছিল?
শেখরনাথ জানালেন, পুরনো সাংঘাতিক কয়েদিদের ভেতর এদের বাছাই করে নেওয়া হত। যে যত ভয়াবহ বাছাইয়ের ব্যাপারে তাদের প্রেফারেন্স ছিল বেশি। এদের শতকরা নব্বই জন পাঠান কি জাঠ। এদের মতো নিষ্ঠুর অত্যাচারী ভূ-ভারতে খুব। কমই জন্মেছে। নতুন কয়েদিদের মধ্যে কেউ জেলের নিয়ম একচুল ভাঙলে ওদের দিয়ে প্রচণ্ড নির্যাতন চালানো হত। পেটি অফিসারদের মাইনে ছিল এক টাকা থেকে দেড় টাকা, টিন্ডালদের বারো থেকে চোদ্দো আনা। এর জন্যে তারা না পারত এমন অপকর্ম নেই। এইসব সাক্ষাৎ শয়তানের অবতারদের একমাত্র কাজ ছিল পদে পদে কয়েদিদের খুঁত ধরা। এতটুকু এদিক ওদিক চোখে পড়লে টিকটিকিতে চড়িয়ে বেতের বাড়ি। অবশ্য ব্রিটিশ ডেপুটি জেলারকে কার কতটা অপরাধ হয়েছে তার ফিরিস্তি দিতে হত। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কাকে কত ঘা বেতের বাড়ি বরাদ্দ করা হবে সেটা ঠিক করে দিত ওই ডেপুটি জেলার। তাছাড়া আরও নানারকম শাস্তির ব্যবস্থাও ছিল।
তালাবন্ধ সেলগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বিনয় বলল, কাকা, জেফ্রি পয়েন্টে আপনি একদিন বলেছিলেন নাইনটিন টোয়েন্টি এইট আপনি সেলুলার জেলে এসেছিলেন।
হ্যাঁ, বলেছিলাম তো। তোমার কি এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন আছে? চলার গতি থামাননি শেখরনাথ। বিনয়ের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে জিগ্যেস করলেন শেখরনাথ।
বিনয় বলল, প্রশ্ন ঠিক না, কৌতূহল।
বল, কী জানতে চাও
কত বছর এখানে কাটিয়েছেন?
উনিশ বছর। নাইনটিন টোয়েন্টি এইট থেকে ফর্টি সেভেন। দেশ স্বাধীন হবার পর মুক্তি পেয়েছিলাম।
যতদিন এখানে ছিলেন কীভাবে দিনগুলো কেটেছে, জেলখানার তখনকার পরিস্থিতি কেমন ছিল, কয়েদিরা বা জেলের কর্তারা আপনাদের মতো রাজবন্দি রেভোলিউশনারিদের কীরকম ব্যবহার করত, জানতে ইচ্ছা করে।
একটু চুপ করে রইলেন শেখরনাথ। তারপর একটু হেসে বললেন, শোনার যখন এত আগ্রহ, বলছি। তুমি তো স্টিমলিপ মহারাজায় রিফিউজিদের সঙ্গে আন্দামানে এসেছ।
হ্যাঁ
ওই জাহাজটা এই রুটে বহু বছর ধরে চলাচল করছে। আমিও ওই মহারাজাতেই আরও দুজন বিপ্লবীর– ইংরেজ–২ গভর্নমেন্টের ভাটায় টেরোরিস্ট–সঙ্গে কালাপানির সাজা নিয়ে এসেছিলাম। ওই জাহাজে একশো পঞ্চাশ জন খুনি ডাকাতকেও দ্বীপান্তরী পানিশমেন্ট খাটতে পাঠানো হয়েছিল। ইংরেজদের চোখে টেরোরিস্টরা অন্য সব ক্রিমিনালদের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর। অনেক বেশি বিপজ্জনক। আমাদের তিনজনকে রাখা হয়েছিল দোতলার ডেকে তিনটে পাশাপাশি কেবিনে। দরজার সামনে রাইফেল হাতে ইংরেজ সার্জেন্ট। রাতদিন পালা করে তিন শিফটে আমাদের পাহারা দিত। আমাদের পায়ে কিন্তু ডান্ডাবেড়ি ছ, লাগানো থাকত। ভাবো তো, হুগলি নদী পেরিয়ে, স্যান্ডহেড পেছনে ফেলে বে অফ বেঙ্গল-এ জাহাজ আসার পর কেবিনের দরজা জানলা হাট করে খুলে দিয়ে পাহারা তুলে নিলেও পালাব কোথায়? মুক্তির একমাত্র উপায় তো পায়ে বেড়ি নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়া। কিন্তু সেখানে ঝাঁকে ঝাকে হাঙর ঘুরে বেড়াচ্ছে। না, হাঙরেরা আমাদের নিয়ে ভোজসভা বসাক, এটা কি মেনে নেওয়া যায়? পৈতৃক প্রাণটা এভাবে খোয়াতে কেউ রাজি ছিলাম না। সে যাক গে আমাদের কেবিনের ধারেকাছে অন্য কয়েদিদের ঘেঁষতে দেওয়া হত না। তাদের রাখা হয়েছিল লোয়ার ডেকের তলায় জাহাজের খোলের ভেতর। সেখান থেকে ওদের উঠে আসতে দেওয়া হত না। আমাদের কাছাকাছি এলে যদি ওই কয়েদিদের রক্তে বিপ্লবের বিষ ঢুকে যায়– এমনটাই ছিল ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ভয়। বোঝো, পায়ে লোহার বেড়ি নিয়ে তিন নিরস্ত যুবক ইংরেজদের কাছে কতটা ভয়ংকর ছিলাম। শুনলে হাসি পায় না?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।