শেখরনাথ বললেন, ও আমার ভাতিজা (ভাইপো) বলতে পারিস। কলকাতায় থাকে। ওখানে আখবরে কাজ করে। পত্রকার। আন্দামানের নয়া সেটলমেন্ট আর পুরনো পেনাল কলোনি দেখতে এসেছে। এসব নিয়ে ওদের কাগজে লিখবে।
শেখরনাথ তাকে ভাইপো বলে পরিচয় দিয়েছেন, তার মানে খুব কাছে টেনে নিয়েছেন। এটা বিনয়ের পক্ষে বিরাট এক মর্যাদা। বুকের ভেতরটা আবেগে যেন উথালপাতাল হতে লাগল।
একে পত্রকার অর্থাৎ সাংবাদিক, তার ওপর শেখরনাথের ভাইপো। সসম্ভ্রমে বৈজু কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, নমস্তে বাবুসাব। আপনি কত রোজ আন্দামানে থাকবেন?
বিনয় প্রতি-নমস্কার করে জানায়, বেশ কিছুদিন তাকে থাকতে হবে। জঙ্গল নির্মূল করে উদ্বাস্তুদের যেসব নয়া বসত গড়ে উঠছে, সেগুলো তো আছেই, যে কয়েদিরা একদিন কালাপানির মেয়াদ খাটতে এসেছিল সারা ভারতবর্ষ এবং বার্মা থেকে দীর্ঘ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে, এখানকার বড় বড় দ্বীপগুলোতে ঘুরে তাদের কলোনিগুলো দেখতে তো সময় লাগবেই।
বৈজুর চোখ আবার শেখরনাথের দিকে ঘুরে গিয়েছিল। সে তাঁকে বলল, ভাইসাব যেদিন আমাদের কোঠিতে যাবেন, ভাতিজাকেও নিয়ে যাবেন। আমরা বহোৎ খুশ হব।
আস্তে মাথা নাড়লেন শেখরনাথ। বিনয়কে অবশ্যই নিয়ে যাবেন।
বৈজু আর দাঁড়াল না; যেমন লম্বা লম্বা পা ফেলে এসেছিল হুবহু সেইভাবেই চলে গেল।
লোকটাকে বেশ ভালো লেগে গিয়েছিল বিনয়ের। ভারী বিনয়ী। নম্র ব্যবহার, কথাবার্তা চমৎকার। শেখরনাথকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। সেটা অবশ্য এই দ্বীপপুঞ্জের সবাই করে থাকে। নিজের চোখে তা দেখেছে বিনয়।
শেখরনাথ বিনয়কে জিগ্যেস করলেন, বৈজুকে কেমন মনে হল তোমার?
যা মনে হয়েছে, অকপটে জানিয়ে দিল বিনয়। শেখরনাথ একটু হাসলেন।–অথচ জানো, বৈজু একসময় ড্রেডেড ক্রিমিনাল ছিল। আমি যে বছর সেলুলার জেলে আসি সেই বছর তিন তিনটে মার্ডার করে একই দিনে সেও এসেছিল। এমনকী খিদিরপুর থেকে একই জাহাজে। এস এস মহারাজা। তাকে রাখা হয়েছিল আমার ঠিক পাশের সেলে।
বিনয় অবাক। বৈজুর মতো সরল ভালোমানুষ তিন তিনটে মার্ডার করতে পারে, এ যেন ভাবাই যায় না। সে জিগ্যেস করে, খুন করেছিল কেন?
তা জানি না। আন্দামানে যেসব এক্স-কনভিক্ট দেখতে পাবে, তাদের সবার গায়ে দু-চারটে মার্ডারের হিস্ট্রি জুড়ে আছে। কে কী কারণে খুন করেছে তা জানা একটা পুরো জীবনেও সম্ভব হবে না।
বৈজু সম্বন্ধে ভীষণ আগ্রহ বোধ করছিল বিনয়। কয়েকদিন আগে জেফ্রি পয়েন্টে একজন রিফিউজি সৃষ্টিধরের দশ মাসের পোয়াতি বউ যখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, যে কোনও সময় তার। পেট থেকে বাচ্চা বেরিয়ে আসতে পারে দাইয়ের খোঁজে তিনটে পাহাড় পেরিয়ে অন্য একটা রিফিউজি সেটলমেন্টে শেখরনাথের সঙ্গে বিনয়ও গিয়েছিল। পথে পড়েছিল ব্রিটিশ আমলের একটা পেনাল কলোনি। সেখানে রঘুবীর আর তার স্ত্রী। মা ফুনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন শেখরনাথ। একদিন রঘুবীররাও দ্বীপান্তরী সাজা মাথায় নিয়ে আন্দামানে এসেছে। কিন্তু শরীরে যে অপরাধের রক্তধারা বইত তা কবেই শোধন হয়ে গেছে। এখন তারা পরিপূর্ণ সংসারী মানুষ। সুখী গৃহস্থ। এই দ্বীপে বছরের পর বছর কাটিয়ে জীবন থেকে ভয়ংকর, গ্লানিকর অতীতকে ওরা মুছে দিয়েছে। বিনয় ঠিক করেছিল পেনাল কলোনি সম্পর্কে জানতে ওদের কাছে চলে যাবে। কিন্তু কবে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ফিরে সেখানে যাওয়া সম্ভব হবে, জানা নেই। হাতের কাছে যখন বৈজুকে পাওয়া গেছে, সুযোগটা কোনও ভাবেই ছাড়বে না সে। শেখরনাথের সঙ্গে তাদের কোঠিতে চলে যাবে। তার খুব কৌতূহল হচ্ছিল রঘুবীর কীভাবে মা ফুনকে বা বৈজু কীভাবে সোমবারীকে বিয়ে করেছিল, তা জানতেই হবে। মেনল্যান্ড থেকে আট নশো মাইল দূরে বহু বছর আগে তাদের যৌবনে বৈজু কোন পদ্ধতিতে তাদের স্ত্রীদের জোগাড় করেছিল সেটা বিনয়ের কাছে মস্ত ধাঁধা।
শেখরনাথ বললেন, চল, ডানপাশের ব্লকটায় ঢোকা যাক। এখানেই আমার জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে গেছে।
আগাছা আর বুনো ঘাসে ভরা মস্ত চত্বরটা। পাঁচটা পাথরের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলেন শেখরনাথরা। হাসপাতালের ব্লকটার মতো এটাও অবিকল একই রকমের। একতলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি সারি সারি কুঠুরি বা সেল। প্রতিটি সেলের সামনে লোহার মোটা মোটা শিক বসানো নিচু দরজা। দরজাগুলোতে মস্ত মস্ত মজবুত তালা ঝুলছে। প্রতিটি সেল সাত ফিটের মতো লম্বা, চওড়া ছফিটের বেশি হবে না। সামনে দরজা, পেছনে ঘুলঘুলির চেয়ে সামান্য বড় জানলা; সেগুলোতেও মোটা শিক গেঁথে দেওয়া। সেলগুলোর সামনে দিয়ে চওড়া, টানা বারান্দা চলে গেছে। বারান্দার একপাশে সেল, অন্যপাশে রেলিং। পঁচিশ-তিরিশ ফিট পর পর ওপরে ওঠা বা নিচের চত্বরে নামার জন্য সিঁড়ি।
সুবিশাল তিনতলা ব্লকটা একেবারে নিঝুম। কেউ কোথাও নেই। যে ব্লকটায় হাসপাতাল সেখানে একটা বের্ডও খালি নেই। সব বেডেই পেশেন্ট। তাছাড়া ডাক্তার, নার্স, ক্লাস-ফোর স্টাফের কর্মী এবং রোগীদের ভিজিটরে সর্বক্ষণ এলাকাটা গমগম করে। কিন্তু এই পরিত্যক্ত ব্লকটা এত নির্জন, এত স্তব্ধ যে গা ছম ছম করে।
দীর্ঘ বারান্দা দিয়ে বিনয়কে পাশে নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে দূরে আট-দশ তলা হাইটের উঁচু ওয়াচ টাওয়ার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন শেখরনাথ। বললেন, ওটা একবার লক্ষ কর।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।