অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী কারও বরাদ্দ দশ ঘা বেত, কারও পনেরো, কারও পঁচিশ। পঁচিশ অবধি পৌঁছবার আগেই বেশিরভাগ কয়েদি সেন্সলেস হয়ে যেত। তখন তার মাথায় জলটল দিয়ে ব্রান ফিরিয়ে পিঠে ওষুধ লাগিয়ে তার সেলে পাঠিয়ে দেওয়া হত। এইভাবেই সেলুলার জেলে বিভীষিকার রাজত্ব চালিয়ে যেত।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, অত্যাচারের এটা হল সামান্য নমুনা। পরে যখন ব্লকে ব্লকে ঘুরে তোমাকে কুঠুরিগুলো দেখাব তখন, আরও অনেক কিছু জানতে পারবে।
বিনয় কী বলতে যাচ্ছিল, বলা হল না, নিজেকে সামলে নিল।
শেখরনাথ তাকে লক্ষ করছিলেন। কপাল কুঁচকে মজার একটা ভঙ্গি করলেন। বললেন, কী বলতে চাও–আমাকে টিকটিকিতে চড়ানো হয়েছিল কি না, তাই তো?
বিনয় চুপ করে রইল।
শেখরনাথ বললেন, বার ছয়েক আমাকে তোলা হয়েছিল। সেলুলার জেলে আসব আর বেত খাব না, তাই কখনও হয়? বলে পেছন ফিরে পাঞ্জাবিটা উঁচুতে তুলে পিঠটা দেখিয়ে দিলেন। সারা পিঠ জুড়ে অগুনতি আড়াআড়ি কালো কালো দাগ। গভীর ক্ষত শুকিয়ে গেলে যেমন হয় সেইরকম।
স্বাধীনতা সংগ্রামীকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে এসে কী অসহনীয় নির্যাতন সইতে হয়েছে তার একটি ঝলক দেখে শিউরে ওঠে বিনয়। এইসময় দূর থেকে কেউ ডেকে ওঠে, ভাইসাব, ভাইসাব।
৩.০৬ শেখরনাথ ঘুরে দাঁড়ালেন
শেখরনাথ ঘুরে দাঁড়ালেন। বিনয়ও। একটা লম্বা-চওড়া লোক–শেখরনাথের চেয়ে ছোটই হবে, ষাটের নিচে বয়স, কাঁচাপাকা চুল চামড়া ঘেঁষে ছোট ছোট করে ছাঁটা, তামাটে রং, এই বয়সেও বেশ তাগড়াই, পরনে ঢোলা ফুলপ্যান্ট আর হাফহাতা শার্ট, পায়ে পুরু সোলের চপ্পল, হাতে কালো কারে বাঁধা গুচ্ছের তাবিজ আর মাদুলি–বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে।
শেখরনাথ তাকে দেখে খুশিই হলেন। গলার স্বর উঁচুতে তুলে বললেন, আরে বৈজু, তুই? এখানে?
লোকটা অর্থাৎ বৈজু ততক্ষণে কাছে চলে এসেছে। এবার তাকে আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। গোলাকার সরল মুখ, পুরু ঠোঁট, ওপরের মাড়িটা একটু উঁচু তাই কয়েকটা দাঁত সবসময় বেরিয়ে থাকে। বলল, হ্যাঁ ভাইসাব৷ বলে ঝুঁকে ভক্তিভরে শেখরনাথের পা ছুঁয়ে হাতটা মাথায় ঠেকাল।
তুই আমার খবর পেলি কী করে?
বৈজু জানায়, কিছুক্ষণ আগে রাহা সাব অর্থাৎ বিশ্বজিৎ রাহার সঙ্গে আদালতের কাছে তার দেখা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছেন, জেফ্রি পয়েন্টের নতুন রিফিউজি সেটলমেন্টে জারোয়ারা একজন উদ্বাস্তুকে তির মেরেছে; বেহুশ অবস্থায় তাকে নিয়ে শেখরনাথ পোর্ট ব্লেয়ারে এসেছেন। লোকটাকে হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে। হাসপাতালে এলে শেখরনাথের সঙ্গে দেখা হবে। তাই দৌড়তে দৌড়তে সে চলে এসেছে। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও দেখা না পেয়ে কী ভেবে এধারে আসতেই শেখরনাথের দেখা পায়।
বৈজু বলল, বহোৎ রোজ বাদ আপনার সাথ দেখা হল। তবিয়ৎ ঠিক হ্যায় তো ভাইসাব?
শেখরনাথ আস্তে মাথা নাড়লেন। তার শরীর স্বাস্থ্য ঠিকই আছে।
বৈজু বলতে লাগল, দেখা হবে কী করে? আপনি করোজ আর পোর্ট ব্লেয়ারে থাকেন? জাজিরায় জাজিরায় (দ্বীপে দ্বীপে) ঘুরে বেড়ান। এখন রিফিউজিদের নিয়ে পড়েছেন। পচাশ ষাট মিল দূরে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে নয়া নয়া সেটলমেন্ট দেখছেন। আপনার সব খবর কানে আসে।
শেখরনাথের মুখে হালকা হাসি লেগেই ছিল। বললেন, জেল থেকে বেকার হয়ে পড়েছি। কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে তো। সময় কাটবে কী করে?
পোর্ট ব্লেয়ারে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে বিনয় একটা ব্যাপার লক্ষ করেছে। সবাই এখানে হিন্দি-উর্দু মেশানো ভাষায় কথা বলে। বাঙালি ছাড়া অন্যদের সঙ্গে শেখরনাথ এবং বিশ্বজিৎ ওই ভাষাটাই বলে থাকেন। বিনয় শুনেছে, আঠারোশো সাতান্নয় মিউটিনির পর যে বিদ্রোহী সিপাহিদের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল তাদের শতকরা নব্বই ভাগই উত্তরপ্রদেশের লোক। ওদের ভাষাটাই পরে এখানে চালু হয়ে যায়। বর্মী হোক, কারেন হোক, শিখ, পাঠান বা মারাঠি যারাই মিউটিনির পরবর্তীকালে কালাপানির সাজা খাটতে এসেছিল তাদের মুখের বুলি ওটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈজু বলল, সময় কাটানোর জন্যে নয়, মানুষকে আপনি প্যার করেন, তাই তাদের কোনও তখলিফ হলে পাশে গিয়ে দাঁড়ান। সময় কেটে যায়।
শেখরনাথ উত্তর দিলেন না।
একটু চুপচাপ।
তারপর বৈজু বলল, আপনার দেখা যখন পেয়েছি তখন আর ছাড়ছি না। পুরো দো সাল আমাদের কোঠিতে যাননি। কবে আসবেন বলুন–
শেখরনাথ বললেন, তুই তো জেনেই গেছিস, একজন রিফিউজিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। বিপদ অনেকটা কেটে এসেছে। তবু আরও কয়েকটা দিন তাকে হাসপাতালে থাকতে হবে। যতদিন না সে পুরো সুস্থ হয়ে উঠছে, কোথাও যেতে পারব না।
ঠিক যায়, ঠিক হ্যায়। ভালো হয়ে উঠলেই যাবেন। সোমবারী আপনার কথা দো-এক রোজ পরপরই বলে। বলে, আপনি আমাদের বিলকুল ভুলে গেছেন।
একটু ভেবে শেখরনাথ বললেন, জেফ্রি পয়েন্টে ফেরার আগে তোদের ওখানে একবার নিশ্চয়ই যাব। সোমবারীকে বলে দিস। সে ভালো আছে তো?
হ্যাঁ। ভগোয়ান রামজি কিষুণজির কিরপায় (কৃপায়) আচ্ছাই হ্যায়। বৈজু বলল, আমি তা হলে এখন চলি ভাইসাব। এবারডিন মার্কিটে কিছু কেনাকাটা করতে হবে। ঘরে চাল ডাল ফুরিয়ে এসেছে।
আচ্ছা, যা
এতক্ষণ শেখরনাথের সঙ্গেই কথা বলে গেছে বৈজু। তার পাশে যে বিনয় দাঁড়িয়ে আছে, সেভাবে খেয়ালই করেনি। পা বাড়াতে গিয়ে তার চোখ এসে পড়ল বিনয়ের ওপর। বলল, এই বাবুসাবকে তো পহচানতে পারলাম না। নয়া মালুম হচ্ছে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের লোকজন প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। বিনয়কে সে আগে কখনও দেখেনি, তাই এই কৌতূহল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।