বিনয় আন্দাজ করে নিল শেখরনাথকেও ঘানি ঘোরাতে হয়েছে। একজন মানুষ জীবনে যাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের বন্ধনমুক্তি, যিনি চিরকুমার, নিজের সিদ্ধিতে পৌঁছতে যিনি সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন তাকে প্রচণ্ড নিগ্রহ ভোগ করতে হয়েছে, ভাবতেও মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায় তার।
শুনে খুব কষ্ট হল তো? আরে বাবা, প্রায় দুশো বছরের এত বড় একটা কলোনির অজস্র সম্পদ লুটপাট করে লন্ডনের জেল্লা যেখানে দিন দিন বাড়ানো হচ্ছে, সেখানে বাধা পড়লে ইংরেজ মুখ বুজে সহ্য করবে? ওই অত্যাচারটুকু রেভোলিউশনারিদের প্রাপ্য।
একটু চুপচাপ।
তারপর শেখরনাথ বললেন, দিনে নারকেল থেকে তেল বার-২ করতে হত। পাক্কা পনেরো সের। পেটি অফিসার নিজের হাতে মেপে নিত।
উৎসুক সুরে বিনয় জানতে চাইল, পেটি অফিসার কাদের বলে? জেলের স্টাফ?
শেখরনাথ বুঝিয়ে দিলেন। কয়েদিদের মধ্যে যাদের কয়েক বছর জেল খাটা হয়ে গেছে, যারা জেলারের তাবেদার, ইংরেজদের নামে যারা কথায় কথায় সেলাম ঠোকে, তাদের ভেতর থেকে অন্য কয়েদিদের ওপর নজরদারি করার জন্য কয়েকজনকে বেছে নেওয়া হত। জেলের হর্তাকর্তারা এদের, দুভাগে ভাগ করে দিয়েছিল। একেবারে নিচের স্তরের। নজরদারদের বলা হত টিল্ডাল, তার ওপরে পেটি অফিসার। টিন্ডালদের মাইনে দেওয়া হত মাসে দুটাকা, পেটি অফিসাররা পেত সোয়া তিন কি সাড়ে তিন টাকা। তখনকার দিনে এই টাকাটা খুব কম নয়, বিশেষ করে কালাপানির সাজা খাটতে আসা কোনও কয়েদির পক্ষে।
এইভাবে কয়েদিদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছিল। টিন্ডাল আর পেটি অফিসাররা বেশিরভাগই হত পাঠান। মানুষ যে এমন নিষ্ঠুর এবং বর্বর হতে পারে ভাবা যায় না। নতুন পদমর্যাদা পেয়ে তারা সারা সেলুলার জেল দাপিয়ে বেড়াত। সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থেকে সাধারণ কয়েদিদের খুঁত ধরতে চেষ্টা করত। ওদের শকুনের নজর, কিছু না কিছু একটা বার করে ফেলতই। তারপর নৃশংস নির্যাতন।
শেখরনাথ বললেন, সে টরচার তুমি কল্পনা করতে পারবে না বিনয়।
বিনয় রুদ্ধশ্বাসে শুনে যাচ্ছিল। জিগ্যেস করল, কী ধরনের টরচার?
সেলুলার জেলের ভেতর কয়েদিদের দিয়ে নানারকম পরিশ্রমের কাজ করানো হত। যেমন ধর ডিউটি ছিল সকাল সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে বারোটা। তারপর দুপুরের খাওয়া দাওয়ার জন্য একঘণ্টা গ্যাপ। ফের দেড়টা থেকে সন্ধে অব্দি হাড়ভাঙা খাটুনি। কয়েদিদের কারওকে ঘানি টানতে হত, কারওকে নারকেল ছোবড়া পিটিয়ে সরু সরু তার বার করতে হত, কারওকে কাঠ চেরাই করতে হত। যার পনেরো সের নারকেল তেল বার করার কথা টিন্ডাল কি পেটি অফিসার ওজন করে যদি দেখত আধপোয়া বা তিনপোয়া কম হয়েছে তার দুদিন রাতের খানা বন্ধ। যাকে নারকেল ছোবড়া থেকে আড়াই সের। তার বার করতে হবে তার কম হলে সেই কয়েদিরও একই সাজা। পর পর তিনদিন যদি কম হয় তখন টিকটিকিতে চড়ানো হত।
টিকটিকি কাকে বলে?
সামনের উইংটার পেছনে যে চত্বরটা রয়েছে সেখানে এখনও দুচারটি আছে। নিজের চোখে দেখলে বুঝতে পারবে। এসো আমার সঙ্গে
বিশাল তেতলা বিল্ডিংটার পাশ দিয়ে ওদিকে চলে এল দুজনে। এই এলাকাটা ভীষণ নির্জন। কোনও জনপ্রাণী চোখে পড়ছে না। এ ধারের মস্ত বিল্ডিংটা খাঁ খাঁ করছে। ইংরেজরা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সেলগুলোতে নতুন কয়েদি আর আসেনি। যদিও বা দুচারজন ছিল, স্বাধীনতার আগে আগেই খুব সম্ভব তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
চারিপাশ নিরেট এক শূন্যতা বিনয়কে যেন ঘিরে ধরতে থাকে।
এখানকার চত্বরটা হাসপাতালের চত্বরের মতো একই মাপের। তবে ওদিকটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কিন্তু এখানে বড় বড় ঘাস আর আগাছা জন্মেছে প্রচুর। এক কোণে কটা বেজি বেশ গুছিয়ে ঘর সংসার পেতেছিল। হঠাৎ উটকো, অবাঞ্ছিত দুটো লোককে দেখে তুমুল হইচই বাধিয়ে ছোটাছুটি করতে করতে তাদের অসন্তোষ জানাতে থাকে।
চত্বরের এক কোণে বিনয়কে নিয়ে যেতে যেতে শেখরনাথ বললেন, এখানেও তেলের ঘানির জন্য বড় শেড ছিল। ইংরেজরা যাবার আগে ভেঙে দিয়ে গেছে। পরে এই নিয়ে হুলস্থূল বাধে তাই বহু কুকীর্তির চিহ্ন লোপাট করে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও যা যা পাওয়া গেছে তাতে ভারতের মেনল্যান্ডের মানুষ শিউরে উঠেছে। সে যাক, এই যে ধারে
চত্বরের বাঁ প্রান্তে চারটে তেকোনা, ত্রিভুজের আকারের স্ট্যান্ড দাঁড় করানো রয়েছে। সামনের দিকে দুটো লোহার মজবুত পায়া, পেছন দিকে একটা। প্রায় সাত আট ফিটের মতো উঁচু। পায়াগুলোতে সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় জং ধরে গেলেও এখনও বেশ শক্তপোক্তই আছে। সামনের অংশের প্রায় পুরোটা জুড়ে পুরু কাঠের পাটাতন আটকানো।
শেখরনাথ বললেন, এই হল টিকটিকি। এতে চড়িয়েই কয়েদিদের বেত মেরে শায়েস্তা করা হত।
অবাক বিস্ময়ে স্ট্যান্ডগুলো দেখতে লাগল বিনয়।
শেখরনাথ কীভাবে বেতের বাড়ি মারা হত বিশদভাবে তা বুঝিয়ে দিলেন। কয়েদিকে উলঙ্গ করে পাটাতনে তার বুকটা ঠেসে হাতদুটো পেছনের লোহার পায়ার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা হত, আর পা দুটো বাঁধা হত স্ট্যান্ডের দুই পায়ার সঙ্গে যাতে কয়েদি নড়াচড়া করতে না পারে।
কখনও কখনও টিন্ডাল বা পেটি অফিসাররা বেত মারার মহান কর্তব্যটি পালন করত। তাছাড়া জেলর এটি করার জন্য অন্য পুরনো, ঘাগি কয়েদিদেরও কাজে লাগাত। কেননা রোজ কম করে তিরিশ চল্লিশ জনকে বেতানো হত। দু-চারজনের পক্ষে তা সম্ভব নয়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।