বিশ্বজিৎ বললেন, ‘সেকেন্ড গ্রেট ওয়ারের সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্দামানে এসেছিলেন। এই মাঠে তিনি আমাদের জাতীয় পতাকা তুলেছেন।‘
সারা শরীরে শিহরন অনুভব করে বিনয়। পরক্ষণে গভীর বিষাদে মন ভরে যায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক আর ফিরে আসেননি। কাগজে মাঝে মাঝেই খবর বেরয়, তিনি আসছেন, তিনি আসছেন। কিন্তু আসেন আর না। দেশের মানুষ বিপুল প্রত্যাশা আর অসীম উৎকণ্ঠা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। বিনয় তাদেরই একজন। হঠাৎ তার মনে হল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে এই তো সেদিন। মাত্র কয়েক বছর আগে। তখন কি বিশ্বজিৎ এই দ্বীপে ছিলেন? থাকা অসম্ভব নয়। উৎসুক সুরে জিগ্যেস করে, ‘আপনি কি নেতাজিকে দেখেছেন?’
‘না। আমি স্বাধীনতার পর পোর্ট ব্লেয়ারে এসেছি।‘ বিশ্বজিৎ বললেন, ‘তবে আমার কাকা তাকে দেখেছেন।‘
সব কেমন যেন গুলিয়ে গেল। রীতিমতো অবাকই হল বিনয়। বলল, ‘আপনার কাকা! তিনি কীভাবে—’
তাকে শেষ করতে দিলেন না বিশ্বজিৎ। ‘কাকা নাইনটিন টোয়েন্টিতে আন্দামানে এসেছিলেন। সেই থেকে এখানেই আছেন।‘
নাইনটিন টোয়েন্টি। অর্থাৎ সেটা ইংরেজ আমল। বিশ্বজিতের কাকা সম্পর্কে কৌতূহল প্রবল হয়ে ওঠে বিনয়ের। সে জানতে চায়, উনি কি ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের কোনও সারভিস নিয়ে এই আইল্যান্ডে এসেছিলেন?
‘একেবারে উলটো।‘ বিশ্বজিৎ হাসলেন।–’ইংরেজদের গোলামি করার কথা তিনি কল্পনাও করতে পারতেন না। বরং এ দেশ থেকে তাদের উৎখাত করাই ছিল তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। কাকা ছিলেন একজন সশস্ত্র বিপ্লবী–ইংরেজরা বলত টেররিস্ট।‘
বিশ্বজিৎ বিশদভাবে জানালেন তাঁর কাকা শেখরনাথ কর এবং আরও কয়েকজন বিপ্লবী উনিশশো আঠারোয় বিহারে একটি মেল ট্রেনে হানা দিয়েছিলেন। কানপুর থেকে একটা বগিতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ট্রেনটা কলকাতায় যাচ্ছিল। শেখরনাথদের উদ্দেশ্য, অস্ত্রগুলো লুট করা।
বগিটা পাহারা দিয়ে আনছিল পুলিশের বড়সড় একটা বাহিনী আর দু’জন জঁদরেল ব্রিটিশ অফিসার। দু’পক্ষের গোলাগুলিতে তিনজন বিপ্লবী মারা যান, কয়েকজন মারাত্মক জখম হন। ওদিকে একজন ব্রিটিশ অফিসার আর তিনজন কনস্টেবলেরও মৃত্যু হয়, চার-পাঁচজন কনস্টেবলেরও গুরুতর চোট লাগে। তখন মধ্যরাত। অন্য কামরাগুলোতে যাত্রীরা ঘুমাচ্ছিল। গুলির আওয়াজে তারা জেগে ওঠে। আতঙ্কে হইচই করতে করতে ট্রেনের অ্যালার্ম চেন টেনে দেয়। শেখরনাথ এবং তার পাঁচ সঙ্গীর হাতে পায়ে গুলি লেগেছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল সারা গা। সেই অবস্থাতেই ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে যান।
অন্ধকারে তিন বিপ্লবী দৌড়তে দৌড়তে বিহারের এক অজ দেহাতে লুকিয়ে ছিলেন কিন্তু পুলিশ গন্ধ শুঁকে শুঁকে সেখানে পৌঁছে যায়। ধরা পড়ার পর কিছুদিন অকথ্য নির্যাতন চলে। তারপর বিচার। আইনকানুন ইংরেজদের, আদালত ইংরেজের, বিচারক ইংরেজ। ফলে যা হবার তা-ই হল। দুই বিপ্লবীর ফাঁসি হয়ে গেল আর শেখরনাথকে পাঠানো হল সেলুলার জেলে। বাকি। জীবন এখানেই তাকে কাটাতে হবে। সেলুলার জেলের সলিটারি সেলে কয়েক বছর আটকে রাখার পর তাকে জেলখানার বাইরে আনা হয়। তখন পোর্টব্লেয়ারে পাহাড় কেটে নতুন নতুন রাস্তা বানাচ্ছে পি.ডব্লু.ডি, শেখরনাথকে সেখানে হিসাব রাখার কাজ দেওয়া হয়। কারাগারের নির্জন কুঠুরি থেকে একটুখানি মুক্তি পেলেন ঠিকই, কিন্তু মেনল্যান্ডে যে পালিয়ে আসবেন তার উপায় নেই। চারদিকে গভীর জঙ্গল আর সমুদ্র। জঙ্গলে রয়েছে হিংস্র আদিবাসীরা, সমুদ্রে তাদের চেয়েও ভয়ংকর ঝাঁকে ঝাকে হাঙর। যেদিকেই যান, পালানো অসম্ভব। ধীরে ধীরে আন্দামানকে ভালোবেসে ফেললেন শেখরনাথ, আশ্চর্য এক মায়ায় জড়িয়ে গেলেন বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপমালার সঙ্গে। স্বাধীনতার পর ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডে ফিরে যেতে পারতেন। যাওয়া হয়নি।
অবাক বিস্ময়ে শুনে যাচ্ছিল বিনয়। যেন এক অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর কাহিনি। জগদীশ গুহঠাকুরতা বারবার বলে দিয়েছিলেন, শুধুমাত্র উদ্বাস্তু পুনর্বাসন নয়, আন্দামনের সমস্ত দিক নিয়ে তাকে লেখা পাঠাতে হবে। বিশেষ করে জোর দিতে হবে। সেলুলার জেলের ওপর। কুখ্যাত এই জেলখানায় জীবনের বহু মূল্যবান সময় কাটিয়ে দিয়েছেন শেখরনাথ। তার কাছ থেকে ব্রিটিশ আমলে এই বন্দিশালায় কী ধরনের নির্মম উৎপীড়ন চালানো হত, সেসব তথ্য জানা যাবে।
বিনয় ব্যগ্র হয়ে ওঠে।-কাকার সঙ্গে আলাপ করতে চাই। ওঁকে কোথায় পাওয়া যাবে?
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘নিশ্চয়ই আলাপ হবে। তবে আপাতত উনি পোর্টব্লেয়ারে নেই, লিটল আন্দামানে গেছেন। দু’চার দিনের ভেতর ফিরে আসবেন।‘
‘আজ যে উদ্বাস্তুরা এসেছে আমি তো তাদের সঙ্গে পুনর্বাসনের জায়গায় চলে যাব। কাকার সঙ্গে দেখা হবে কী করে? বিনয়ের গলায় হতাশা ফুটে বেরয়।
তার মনোভাবটা আঁচ করে নিয়ে বিশ্বজিৎ বললেন, কাকা এখন উদ্বাস্তুদের মধ্যে কাজ করছেন। আপনি যেখানে যাচ্ছেন, লিটল আন্দামান থেকে ফিরেই তিনি সেখানে চলে যাবেন।
আরও অনেক প্রশ্ন ছিল বিনয়ের, কিন্তু সেসব করা হল না।
‘বইয়া (বসে) পড়েন, বইয়া পড়েন।’ ওদিকে তুমুল হাঁকাহাঁকি করে চটের আসনের ওপর বসিয়ে দিতে লাগল নিরঞ্জন আর বিভাস। সভাটভা যা-ই হোক তা যে উদ্বাস্তুদের জন্যই, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে। তবে উদ্দেশ্য ধরা যাচ্ছেনা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।