এলাকাটা ঘিরে আগে থেকেই জমায়েত হয়েছিল, তাদের মধ্যে হঠাৎ চাঞ্চল্য দেখা গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা ধবধবে ফিয়েট গাড়ি আর একটা জিপ এসে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে পড়ে। জিপ থেকে নেমে আসে তিন চারজন কনস্টেবল। ফিয়েট থেকে মাঝবয়সি একজন–বেশ সুপুরষ। চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা, মাথায় ব্যাকব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুল। চেহারায় প্রবল একটা ব্যক্তিত্ব রয়েছে। পরনে ঢোলা ট্রাউজার্স এবং শার্ট।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘চিফ কমিশনার এসে গেছেন। চলুন আমার সঙ্গে।’ বলে ব্যস্তভাবে এগিয়ে গেলেন। তার পাশাপাশি লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে লাগল বিনয়। প্রৌঢ়টি যে চিফ কমিশনার, আন্দাজ করে নিতে অসুবিধা হয় না।
চিফ কমিশনারের কাছে এসে সসম্ভ্রমে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আসুন স্যার–’ টেবিল চেয়ারগুলো যেখানে সাজানো রয়েছে। তাকে সেখানে নিয়ে গেলেন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল বিনয়।
ইংরেজিতেই কথা বলছিলেন বিশ্বজিৎরা। বোঝা গেল, চিফ কমিশনার অবাঙালি। তিনি চেয়ারে বসলেন না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উদ্বাস্তুদের উদ্দেশে যা বললেন, মোটামুটি এইরকম। ‘আন্দামানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। দেশভাগের পর সব কিছু হারিয়ে আপনারা ভারতে চলে এসেছিলেন। নিদারুণ কষ্ট আর দুর্ভোগের মধ্যে আপনাদের দিন কেটেছে। পশ্চিমবাংলা ছোট রাজ্য। সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেবার মতো যথেষ্ট জমি নেই। তাই বাংলার বাইরে উদ্বাস্তুদের পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানের এই দ্বীপে। কিন্তু আন্দামান সম্পর্কে ইন্ডিয়ান মেনল্যান্ডের মানুষের ভীষণ ভয়, অস্বস্তি। সংশয় কাটিয়ে আপনারা যে শেষ পর্যন্ত এখানে এসেছেন, এতে আপনাদের ভালোই হবে। আপনাদের জন্য প্রচুর জমি ঠিক করা আছে। এখানে সুখে শান্তিতে বাস করুন। আন্দামানের সব অফিসার আর কর্মী আপনাদের সমস্তরকম সাহায্য করবেন।’
পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কথাগুলো বাংলায় তরজমা করে দিতে লাগলেন বিশ্বজিৎ।
ভাষণ শেষ করে চিফ কমিশনার উদ্বাস্তুদের মধ্যে চলে গেলেন। নিরঞ্জন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘আপনেরা হলে উইঠা খাড়। চিফ কমিশনার সাহেব আপনেগো লগে আলাপ করবেন।
উদ্বাস্তুরা লহমায় উঠে দাঁড়াল। সবাই ত্রস্ত, সচকিত।
চিফ কমিশনারের সঙ্গে বিশ্বজিৎও এসেছিলেন। উদ্বাস্তুদের চোখমুখের চেহারা লক্ষ করে বললেন, ভয়ের কিছু নেই। আমি তো আছি। উনি যা জিগ্যেস করছেন তার জবাব দেবেন।
বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন চিফ কমিশনার। পূর্ব পাকিস্তানে কার বাড়ি কোথায় ছিল, কতদিন আগে দেশ থেকে চলে এসেছে, কলকাতায় কোথায় কাটিয়েছে, জাহাজে পোর্টব্লেয়ারে আসতে কোনওরকম কষ্ট হয়েছে কি না, ‘রস’ আইল্যান্ডে নেমে খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করেছে কি না ইত্যাদি।
বিশ্বজিতের ভূমিকাটা দোভাষীর। সমানে ইংরেজি থেকে বাংলা এবং বাংলা থেকে ইংরেজি করে যাচ্ছিলেন।
আলাপ-টালাপ হয়ে গেলে আবার সেই টেবিল চেয়ারগুলোর কাছে চলে এলেন চিফ কমিশনার। বিশ্বজিৎকে জিগ্যেস করলেন, ‘এদের কি কাল রিহ্যাবিলিটেশনের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে, না দু’একদিন ওরা পোর্টব্লেয়ারে থেকে যাবে?’
বিশ্বজিৎ জানালেন, ‘না স্যার। রাতটা এখানে কাটিয়ে কাল সকালে ডি.পি ফ্যামিলিগুলোকে নিয়ে যাওয়া হবে।’
‘দেখো, ওদের যেন কোনও অসুবিধে না হয়।’
‘হবে না। সব ব্যবস্থা করা আছে।’
‘গুড। আমি এখন যাচ্ছি–’
চিফ কমিশনার তার ফিয়েটের দিকে পা বাড়াতে যাবেন, হঠাৎ বিনয়ের কথা মনে পড়ে গেল বিশ্বজিতের। বলল, ‘স্যার, একজনের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দেব।
‘কে?’
বিশ্বজিৎ বিনয়কে ডেকে আলাপ করিয়ে দিলেন। চিফ কমিশনার রীতিমতো খুশি। বললেন, ‘আপনিই বোধহয় প্রথম সাংবাদিক যিনি আন্দামানের রিফিউজি সেটলমেন্ট দেখতে এলেন। মোস্ট ওয়েলকাম।‘ একটু থেমে ফের বলেন, ‘খবর পাচ্ছি রিফিউজিরা যাতে এখানে না আসে সে জন্যে কোনও কোনও পলিটিক্যাল পার্টি কলকাতায় অ্যাজিটেশন শুরু করেছে? কী চাইছে পার্টিগুলো? ওদের মুভমেন্ট কি বিরাট আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে?’
এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব জানা নেই বিনয়ের। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় এখন রিফিউজিদের নিয়ে কত যে মিছিল চোখে পড়ে! পার্কে পার্কে মিটিং। স্লোগানে স্লোগানে আকাশ চৌচির হয়ে যায়। নিজের চোখে বিনয় ক’মাস আগে মিশন রো’তে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে পুলিশের তুমুল লড়াই দেখেছে। বেপরোয়া লাঠি, টিয়ার গ্যাস, এমনকী গুলিও চালিয়েছে পুলিশ। উদ্বাস্তুরা মুখ বুজে বরদাস্ত করেনি; খোয়া ইট হাতের কাছে যা পেয়েছে তারাও পুলিশের দিকে তাক করে সমানে ছুঁড়ে গেছে।
অনেকে বলে কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য বামপন্থী দলগুলো উদ্বাস্তুদের মধ্যে ‘বেস’ তৈরি করার জন্য তাদের খেপিয়ে তুলছে। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী যাদের কোনও আশা নেই, ভবিষ্যৎ নেই, চোখের সামনে শুধুই অনন্ত তমসা, এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে ওরা নিজেদের শক্তি বাড়াতে চায়।
বিনয় অস্বস্তি বোধ করছিল। বলল, ‘পার্টিগুলোর মোটিভ কী, আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে নানা লোকে নানা কথা বলে।‘ কী বলে সেটা আর জানায় না।
চিফ কমিশনার এ ব্যাপারে আর কিছু জিগ্যেস করলেন না। একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।–’আপনি রিফিউজি সেটলমেন্টগুলোতে যান। ঘুরে ঘুরে দেখুন রিহ্যাবিলিটেশনের কাজ কীভাবে চলছে। ত্রুটি চোখে পড়লে নিশ্চয়ই লিখবেন। কনস্ট্রাকটিভ সমালোচনা সব সময় কাম্য। কিন্তু দয়া করে এমন কিছু লিখবেন না যাতে কলকাতায় আগুন লেগে যায়। তাহলে যা-ও রিফিওজি আসছে, সেটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। পুনর্বাসনের এত বড় একটা পরিকল্পনা যাতে বানচাল না হয়ে যায়। সেটা মাথায় রাখবেন। আচ্ছা, নমস্কার—’ ক’পা এগিয়ে তিনি তার গাড়িতে উঠে পড়েন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।