‘একটা খবর জানা যেতে পারে?’
বিশ্বজিৎ জানতে চাইলেন।–’কী খবর?’
‘একটি মেয়ে, উনিশ কুড়ি বছর বয়স, আজ আমাদের সঙ্গে ‘রস’ আইল্যান্ডে এসেছে। সে ‘চলুঙ্গা’ জাহাজে মিডল আন্দামানে গেছে। ও কোন ফ্যামিলির সঙ্গে ওখানকার কোন সেটেলমেন্টে গেল, দয়া করে যদি একটু খোঁজ নেন—’
‘কী নাম মেয়েটির?
‘তাপসী লাহিড়ি। ডাকনাম ঝিনুক।’ বলেই হকচকিয়ে যায় বিনয়। ঝিনুকের নামটা গোপনই রাখতে চেয়েছিল সে। ভেবেছিল, মিডল আন্দামানে গিয়ে সেখানকার সেটেলমেন্টগুলোতে ঘুরে তাকে খুঁজে বার করবে। কিন্তু বিশ্বজিতের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিজের এই সংকল্পের কথাটা লহমার জন্য ভুলে গিয়েছিল বিনয়। নিজের অজান্তে ঝিনুকের নাম তার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে।
চলতে চলতে পলকহীন বিনয়ের দিকে তাকাতে থাকেন বিশ্বজিৎ। রীতিমতো অবাকই হন। বিস্ময়টা থিতিয়ে এলে হেসে হেসে বলেন, ‘আশ্চর্য!’
আশ্চর্যটা কী কারণে আন্দাজ করতে পারল না বিনয়। বিশ্বজিৎ এরপর কী বলবেন সেজন্য চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকে।
বিশ্বজিৎ লঘু সুরে এবার বললেন, ‘মহারাজা’ জাহাজে চারদিন একসঙ্গে কাটালেন। ‘রস’ আইল্যান্ডেও বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটিয়েছেন। মেয়েটি কোন ফ্যামিলির সঙ্গে এসেছে, তাকেই তো জিগ্যেস করতে পারতেন।‘ পারতপক্ষে মিথ্যে বলে না বিনয়। তেমন অভ্যাসই নেই। এখন অবলীলায় তাই বলতে হল।-’জাহাজে কি ‘রস’-এ ওকে লক্ষ করিনি। রিফিউজিরা থাকত শিপের খোলে। আমি আপার ডেকে। ও যখন ‘চলুঙ্গা’ জাহাজে মিডল আন্দামান যাচ্ছে তখন দেখতে পেলাম। কিন্তু ‘চলুঙ্গা’ অনেকটা দূরে চলে গেছে।‘
‘নামটাম যখন বলতে পারছেন, মেয়েটিকে ভালোই চেনেন মনে হচ্ছে।’
প্রচণ্ড অস্বস্তি হতে থাকে বিনয়ের। মুখ ফসকে যখন ঝিনুকের নামটা বেরিয়েই এসেছে কতরকম প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হবে, কে জানে। বিশ্বজিৎ প্রথমেই অবধারিত যা জানতে চাইবেন, এত পরিচিত মেয়েটি কোন পরিবারের সঙ্গে আন্দামানে এসেছে, বিনয় তার খবর রাখে না, সেটাই বিস্ময়কর। এই সুতো ধরে কথা যে উঠবে! গোপন ব্যাপারটা হয়তো আর রাখা যাবে না। বিনয় টের পেল, কপালে দানা দানা ঘাম জমেছে। ঝাপসা গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, চিনি।‘
বিশ্বজিৎ এ নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। বললেন, ‘আপনি যা জানতে চাইছেন, খুব সহজেই তা জানা যাবে। যে রিফিউজিরা আজ এসেছে, তাদের নাম, বয়স, তারা কোন কোন ফ্যামিলির মেম্বার, সেই ফ্যামিলিগুলোর হৈড় কারা, দেশ ইস্ট পাকিস্তানের কোন ডিস্ট্রিক্টে ছিল–ডিটেলে তার লিস্ট আমার অ্যাটাচি কেসে আছে। আমার ড্রাইভার অ্যাটাচিটা নিয়ে জিপে চলে গেছে। সেটা দেখে আপনাকে বলে দেব।’
এটা শুক্লপক্ষ। সূর্যাস্ত হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। চাঁদ উঠে আসছে। কারা যেন জাদুল্লস উপুড় করে রুপোলি জ্যোৎস্না ঢেলে দিতে শুরু করেছে সারা চরাচর জুড়ে।
খাড়াই ভেঙে টিলার মাথায় চলে এসেছিল বিনয়রা। এবার তাদের এ ধারের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে হবে। চড়াই বেয়ে ওঠাটা ভীষণ কষ্টের, কিন্তু উতরাই দিয়ে নামাটা অনেক আরামের।
বেশ খানিকটা দূরে টিম টিম করে প্রচুর আলো জ্বলছিল। বিশ্বজিৎ বললেন, ওই হল এবারডিন মার্কেট। আমাদের ডেস্টিনেশন।
১.৩ ব্যারাকের মতো দালান
তিন দিকে লম্বা লম্বা ব্যারাকের মতো দোতালা-তেতলা দালান ছাড়াও রয়েছে টিনের বা টালির চালের বেশ কিছু বাড়ি। বেশির ভাগ বাড়ির একতলায় নানা ধরনের দোকানপাট। মুদিখানা, ধোবিখানা, ওষুধের দোকান, জামাকাপড়ের দোকান, দাওয়াখানা, ছোটখাট হোটেল ইত্যাদি ইত্যাদি। বিজলিবাতি ছাড়াও কোনও কোনওটায় গ্যাসের আলোও জ্বলছে।
মস্ত মাঠটা বাজারের সামনের দিকে। সেখানে চল্লিশ-পঞ্চাশটা বাঁশের খুঁটি পুঁতে সেগুলোর গায়ে লম্বা ইলেকট্রিকের তার বেঁধে বাল্ব জ্বালানো হয়েছে। মাঠের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে বসার জন্য চট পাতা। একধারে কটা চেয়ার এবং সাদা ধবধবে চাদর দিয়ে ঢাকা একটা টেবিল।
প্রচুর লোকজন জমা হয়েছে এখানে। চেহারা দেখে বোঝা যায়। এদের কেউ শিখ, কেউ মাদ্রাজি, কেউ বর্মী, কেউ পাঠান এবং ভারতের নানা অঞ্চলের মানুষ। জনতা কিন্তু চটের ওপর বসেনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। চারপাশ থেকে অজস্র মাছির ভনভনানির মতো আওয়াজ আসছে।
এই মাঠে আজ কি মিটিং টিটিং কিছু আছে? যদি থাকেও তার সঙ্গে মেনল্যান্ড থেকে আসা উদ্বাস্তুদের কী সম্পর্ক? তাদের এখানে নিয়ে আসা হল কেন? বুঝতে না পেরে ধন্দে পড়ে যায় বিনয়। সে কিছু জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল, তার আগেই বিশ্বজিৎ বললেন, ‘যে মাঠটায় আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি তার সঙ্গে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের একটা গ্লোরিয়াস চ্যাপটার জড়িয়ে আছে।‘
আন্দামান সম্পর্কে নানা বইপত্র পড়েছে বিনয়। সে জানে আঠারোশো সাতান্নর মিউটিনির পর ইংরেজরা বহু সিপাহিকে গুলি করে বা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। অনেককে পোর্ট ব্লেয়ারে নির্বাসনে পাঠায়। তারপর বিশ শতকের গোড়ার দিকে। দেশের মুক্তির জন্য যখন সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু হল তখন বাংলা, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র এবং ভারতের অন্য সব প্রভিন্স থেকে বিপ্লবীদের ধরে ধরে বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপে নিয়ে আসা হয়। এবারডিন মার্কেটের সামনের মাঠটায় এমন কিছু কি ঘটেছিল যাতে বিদ্রোহী সিপাহি বা পরবর্তী কালের বিপ্লবীরা জড়িত ছিলেন? বিনয়ের তা জানা নেই।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।