এখনও পুরোপুরি নয়। আজ সারাদিন চেষ্টা চালিয়ে যাব। ব্লিডিংটা পুরোপুরি বন্ধ করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। সেটা করতে পারলেই ফিফটি পারসেন্ট কাজ হয়ে যাবে। তখন বলতে পারব আশা আছে।
সন্ধের আগে হাসপাতাল থেকে যাচ্ছি না। অনেক আশা এ নিয়ে থাকব। জ্যোৎস্নাকে কি বলতে পারি মোহনবাঁশি একটু ভালো আছে? বুঝতেই পারছ কিরকম প্রচণ্ড উদ্বেগে কটাদিন তার কাটছে–
ডাক্তার চট্টরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দ্বিধার সুরে বললেন, আচ্ছা, বলবেন।
শেখরনাথ বললেন, এখন তাহলে আমরা উঠি। তুমি নিশ্চয়ই মোহনবাঁশিকে দেখতে যাবে?
হ্যাঁ।
সবাই চেম্বারের বাইরে বেরিয়ে এল। ডাক্তার চট্টরাজ সিঁড়ি ভেঙে তেতলায় চলে গেলেন। বিনয়কে সঙ্গে করে শেখরনাথ গেলেন জ্যোৎস্নাদের কাছে। লম্বা অলিন্দের একপাশে ছেলেমেয়েদের নিয়ে জড়সড় হয়ে বসে ছিল জ্যোৎস্না। সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। দুচোখে অনন্ত প্রশ্ন।
শেখরনাথ হাত তুলে তাকে বললেন, দুশ্চিন্তা কোরো না। ডাক্তারবাবু বলেছেন মোহনর্বাশির বিপদ কেটে এসেছে। সে সুস্থ হয়ে উঠবে। তবে আরও কিছুদিন তাকে হাসপাতালে থাকতে হবে।
জ্যোৎস্নার দুচোখে উৎকণ্ঠা এবং আশা আলোআঁধারির মতো ফুটে উঠতে থাকে। ব্যগ্রভাবে সে বলে, ডাক্তারবাবু ভরসা দিছে তো বাবা? শেখরনাথের মুখে শোনার পরও যেন পুরোপুরি ভরসা পাচ্ছে না সে।
বিনয়ের দিকে আঙুল বাড়িয়ে শেখরনাথ বললেন, ও তো আমার সঙ্গেই ছিল। ডাক্তারবাবু কী বলেছেন, ওকেই জিগ্যেস করে দেখ।
জ্যোৎস্নার হঠাৎ খেয়াল হল শেখরনাথের মতো শুভাকাঙ্ক্ষী আপনজন এই আন্দামান দ্বীপে তাদের আর কেউ নেই। সে ডাক্তার চট্টরাজ সম্পর্কে যে প্রশ্নটা করেছে তার মধ্যে খানিকটা অবিশ্বাস রয়েছে। ওটা করা ঠিক হয়নি৷ শেখরনাথের পায়ের দিকে ঝুঁকে ব্যাকুলভাবে বলে, কেওরে (কারওকে) জিগাইতে অইব না। আমারে মাফ কইরা দ্যান। বোঝেনই তো বাবা, হার (তার অর্থাৎ মোহনবাঁশির) লইগা মনখান বড় উতলা। কী কইতে যে কী কইয়া ফালাই (ফেলি)! মাথা আমার ঠিক থাকে না।
ঠিক আছে, ঠিক আছে জ্যোৎস্নার দুহাত ধরে টেনে তুলে তাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন শেখরনাথ। বললেন, তোমাদের তো মোহনবাঁশির কাছে এবেলা যেতে দেবে না। ওবেলা অবস্থা বুঝে দেখতে দিতে পারেন। এতটা সময় কী করবে?
বিহুলের মতো জ্যোৎস্না বলল, কী করুম!
এক কাজ কর, আমাদের সঙ্গে গাড়ি আছে। তুমি বিশ্বজিতের বাংলায় চলে যাও। সকালে কী চাট্টি খেয়ে এসেছ! দুপুরে পেট ভরে খেয়ে ওখানে বিশ্রাম কর। বিকেলে ফের গাড়ি গিয়ে তোমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসবে।
কালও হাসপাতাল ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি জ্যোৎস্না। আজও হল না। বলল, আমরা এখানেই থাকুম৷
জ্যোৎস্নার মনোভাবটা বোঝেন শেখরনাথ। স্বামীর সঙ্গে দেখা না হলে হাসপাতালে তার কাছাকাছি থাকা যাবে, এটুকুই তার সান্ত্বনা। তিনি আর জোর করলেন না। একটু কী ভেবে বললেন, তোমরা তাহলে এখানেই বসে থাকে। আমরা একটু ঘুরে আসি।
কহন (কখন) আইবেন?
দুপুরে। তোমাদের খাবার নিয়ে আসব।
জ্যোৎস্না আর কোনও প্রশ্ন করল না।
শেখরনাথ বিনয়কে বললেন, চল, নিচে নামা যাক—
বিনয় বলল, কাকা, আপনি বলেছিলেন, সেলুলার জেলটা ভালো করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবেন। আজ আপনার কি অন্য কোনও কাজ আছে?
না, নেই। আজ তোমাকে যতটা পারি দেখাব। কিন্তু এই কুখ্যাত জেলখানার বিরাট ইতিহাস। কত বিপ্লবী কত খুনি দস্যু সারা ভারত থেকে এখানে দ্বীপান্তরের সাজা নিয়ে এসেছিল। সে কি একদিনে শোনানো যায়। চল, যতটা পারি–
.
নিচের বিশাল চত্বরে নেমে শেখরনাথ উলটো দিকের লম্বা তেতলা উইংটা দেখিয়ে বললেন, আজ ওখানে যাব। তার আগে চারপাশ দেখাই৷
মোহনবাঁশিকে নিয়ে জেফ্রি পয়েন্ট থেকে আসতেই হাসপাতালে বিনয়ের চোখে পড়েছিল ভূমিকম্পে এবং জাপানি বোমায় দুটো উইং ধংস হয়ে যাবার পর বাকি যে পাঁচটা মস্ত মস্ত উইং এখনও দাঁড়িয়ে আছে, হাসপাতালটা বাদ দিলে তার প্রতিটি তলায় সারি সারি কুঠুরি বা সেল। প্রতিটি সেলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের কত যে বর্বর নির্যাতনের নীরব কাহিনি। এর কিছু কিছু বিবরণ নানা বইতে পড়েছে বিনয় কিন্তু একজন বিপ্লবী যিনি তার জীবনের অতি মূল্যবান অনেকগুলো বছর এই ভয়ংকর নরককুণ্ডে কাটিয়েছেন তার মুখে শোনাটা বিরল অভিজ্ঞতা। আন্দামানে এসে শেখরনাথের সঙ্গে দেখা হওয়াটাকে বিরাট সৌভাগ্য বলেই মনে হয় বিনয়ের।
শেখরনাথ বললেন, হাসপাতালের সামনে যে মস্ত চত্বরটায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, ইংরেজ রাজত্বে এখানে কী ছিল জানো?
বিনয় মাথা নাড়তে থাকে।–জানে না।
শেখরনাথ জানালেন, এই বিস্তৃত ফাঁকা জমিতে ছিল টিনের লম্বা লম্বা ছাউনির তলায় ঘানিঘর।
জেলখানায় ঘানিঘর! বিনয় বেশ অবাকই হল।
হা হা, সারি সারি ঘানি বসানো হয়েছিল। ঘানি টানা দেখেছ কখনও?
দেশে থাকতে কলুদের বাড়িতে দেখেছি। বলদ দিয়ে টানানো হত।
আর এখানে টানানো হত কয়েদিদের দিয়ে। বলে একটু হাসলেন।
বিনয় জিগ্যেস করল, আপনার মতো বিপ্লবীদের দিয়েও?
শেখরনাথের হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল।সবাইকে দিয়েই। কেউ বাদ নয়। আর বিপ্লবী বলে গুরুঠাকুর নাকি যে তাদের মাথায় করে রাখতে হবে? ইংরেজদের রাগ তো রেভোলিউশনারিদের ওপর সবচেয়ে বেশি। তারা সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে ওদের তাড়িয়ে ইন্ডিয়া স্বাধীন করতে চায়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।