ঠিক আছে।
এই সময় বিশ্বজিৎ চেম্বারে এসে ঢুকলেন।কিছুক্ষণ আগে কোর্টের হিয়ারিং শেষ হল। ড্রাইভারকে তাড়া দিয়ে দশ মিনিটের মধ্যে চলে এসেছি। অপারেশন কেমন হল? তিনি ডাক্তার চট্টরাজের দিকে তাকালেন।
ডাক্তার চট্টরাজ সব জানিয়ে দিলেন।
খুবই চিন্তাগ্রস্ত দেখাল বিশ্বজিৎকে। বললেন, যেভাবে হোক, লোকটাকে বাঁচাতেই হবে, নইলে আন্দামানের রিহ্যাবিলিটেশনে এর বিরাট ধাক্কা এসে লাগবে।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, আমার মনে আছে। আগেও অনেকবার বলেছেন। আমরা মোহনবাঁশির স্ত্রীকে নিয়ে পেশেন্টের কাছে যাচ্ছি। আপনি কি যাবেন?
নিশ্চয়ই।
চেম্বার থেকে বেরিয়ে জ্যোৎস্নাকে সঙ্গে নিয়ে শেখরনাথরা তেতলায় উঠতে লাগলেন। মোহনবাঁশির ছেলেমেয়েদের অবশ্য সঙ্গে নেওয়া হল না। তাদের বারবার বলা হল, দোতলার বেঞ্চে যেন বসে থাকে, অন্য কোথাও না যায়।
সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে শেখরনাথ জ্যোৎস্নাকে বোঝাতে লাগলেন, শরীরে ছুঁচ এবং নাকে নল ঢুকিয়ে মোহনবাঁশিকে নানারকম ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। সেসব দেখে সে যেন ভয় না পায়, কান্নাকাটি না করে।
জ্যোৎস্না ঘাড় কাত করে জানাল–তেমন কিছুই করবে না।
অপারেশনের পর তেতলার সমুদ্রের দিকে কাঁচ দিয়ে ঘেরা একটা কেবিনে রাখা হয়েছে মোহনবাঁশিকে। সে চিত হয়ে শুয়ে আছে। চোখদুটো বোজা। বোঝা যায় সম্পূর্ণ বেহুশ। ডাক্তার চট্টরাজ যেমন বলেছিলেন ঠিক তেমনি নল টল, অক্সিজেন সিলিন্ডার ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে।
দুই তরুণ ডাক্তার সুকুমার আর তাপস এবং একজন নার্স মোহনবাঁশির বেডের পাশে রয়েছে।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, আপনাদের এতজনকে কিন্তু কেবিনের ভেতর নেওয়া যাবে না।
শেখরনাথ বললেন, যাওয়ার দরকার কী? এখান থেকেই ভালো দেখা যাচ্ছে।
ডাক্তার চট্টরাজ দাঁড়ালেন না। কেবিনে ঢুকে নিচু গলায় সুকুমার এবং তাপসের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। নিশ্চয়ই রোগীর চিকিৎসা সম্পর্কে কোনও পরামর্শ দিচ্ছেন।
বিনয় জ্যোৎস্নার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। সে লক্ষ করল, জ্যোৎস্না পলকহীন বেডে শায়িত মোহনবাঁশিকে দেখছে। শেখরনাথ তাকে কাঁদতে বারণ করেছিলেন। সে শব্দ করে। কাঁদছে না ঠিকই, তবে চোখ জলে ভরে যাচ্ছে। ঠোঁট দুটো কাঁপছে থরথর করে।
শেখরনাথও জ্যোৎস্নার দিকে নজর রেখেছিলেন। চাপা, নরম গলায় বললেন, না না, চোখের জল ফেলো না। ডাক্তারবাবুরা চেষ্টার ত্রুটি করছেন না। চোখ মোছো–।
ধীরে ধীরে আঁচল তুলে চোখ মুছে ফেলল জ্যোৎস্না।
ডাক্তার চট্টরাজ কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, দেখানো হয়েছে। এবার আপনারা বাড়ি চলে যান কাকা। কাল আবার আসবেন।
শেখরনাথ বললেন, আচ্ছা
বিশ্বজিৎ জিগ্যেস করলেন, ওষুধ টোষুধ, ইঞ্জেকশন কিছু কিনে দিতে হবে?
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, আপাতত দরকার নেই। তেমন বুঝলে পরে জানাব।
এতক্ষণ নীরব ছিল। হঠাৎ ভাঙা ভাঙা, জড়ানো গলায় জ্যোৎস্না বলে উঠল, আমি বাড়িত যামু না।
সবাই অবাক। শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, যাবে না কেন?
আমারে পোলামাইয়া লইয়া হের (তার) কাছে থাকতে দ্যান।
অর্থাৎ জ্যোৎস্না চাইছে তাদের মোহনবাঁশির কেবিনে থাকতে দেওয়া হোক। একবার যখন স্বামীকে দেখতে পেয়েছে তাকে চোখের আড়াল করতে চায় না।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, বিরাট অপারেশন হয়েছে মোহনবাঁশির। এখনও জ্ঞান ফেরেনি। এই অবস্থায় এতজন তার কেবিনে থাকবে তাই হয় নাকি? হাসপাতালে এভাবে থাকার নিয়ম নেই।
জ্যোৎস্না শেখরনাথের দিকে তাকায়। আকুল স্বরে বলে, বাবা, আপনে আমার পোলামাইয়াগুলারে লইয়া যান। আমি হের (তার) ঘরের এক কিনারে চুপ কইরা বইয়া (বসে) থাকুম৷ কথা কমুনা,কাম না। আমারে দয়া করেন।
শেখরনাথ বললেন, ডাক্তারবাবু কী বলেছেন শুনলে তো। ওঁর পক্ষে হাসপাতালের নিয়ম ভাঙা সম্ভব নয়। চল জ্যোৎস্নার একটা হাত ধরে আস্তে আস্তে তেতলার ওয়ার্ড পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। বিনয় এবং বিশ্বজিৎ ওঁদের পাশাপাশি চলতে লাগলেন।
জ্যোৎস্না আর একটি কথাও বলল না। ঘাড় ঘুরিয়ে যতক্ষণ মোহনবাঁশির কেবিনটা চোখে পড়ে, দেখতে লাগল।
.
পরদিন সাড়ে নটায় আবার জ্যোৎস্নাদের নিয়ে হাসপাতালে এলেন শেখরনাথ। বিনয়ও এসেছে। উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের ব্যাপারে বিশ্বজিতের আজ পর পর বেশ কটা মিটিং আছে। তাছাড়া কিছুক্ষণের জন্য হলেও একবার কোর্টে যেতে হবে। তাই আজ আর তার পক্ষে হাসপাতালে আসা সম্ভব নয়। এবেলা তো বটেই, বিকেলের দিকেও আসতে পারবেন না।
কাল বাংলোয় ফেরার পর কিছু খেতে চায়নি জ্যোৎস্না। একরকম জোর করেই তাকে খাইয়েছেন শেখরনাথ আর বিশ্বজিৎ। শেখরনাথ বলেছেন, তুমি যদি না খেয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়, আমরা মুশকিলে পড়ে যাব। একদিকে মোহনবাঁশি, আরেকদিকে তুমি। তখন কাকে সামলাব? নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে। খাও–খাও বলছি। প্রায় ধমকই দিয়ে উঠেছিলেন।
আজ হাসপাতালে এসে সামান্য সুখবর পাওয়া গেল। বাইরের প্যাসেজের বেঞ্চিতে জ্যোৎস্নাদের বসিয়ে শেখরনাথ আর বিনয় ডাক্তার চট্টরাজের চেম্বারে চলে গিয়েছিল।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, ফুসফুসের ব্লিডিং অনেকটাই থামানো গেছে। তবে শ্বাসকষ্টটা একইরকম আছে। আপাতত আরও চব্বিশ ঘণ্টা অক্সিজেন চলবে। তারপর দেখা যাক।
শেখরনাথের মুখ দেখে মনে হল, মোহনবাঁশির ফুসফুসে। রক্তপাত কমে আসায় সামান্য হলেও তার মানসিক চাপ কেটেছে। উৎসুক সুরে জিগ্যেস করলেন, আউট অফ ডেঞ্জার বলা যায় কী?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।