জ্যোৎস্না উপসাগরের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে। টিপসই দেবার আগের মুহূর্তে তার যে মনোবল দেখা গিয়েছিল তা ক্রমশ যেন ভেঙে পড়ছে। মাঝে মাঝে বিড় বিড় করে চাপা গলায় সে বলে যাচ্ছে, কী কুক্ষণে যে আন্দারমানে আইছিলাম। কত মাইনষে (মানুষ) নিষেধ করছিল যাইও না। পাট্টির বাবুরা আইয়া কইছিল যাইও না। তভু জমিন পামু এই ভরসায় চইলা আইলাম। অহন আমার সর্বস্ব যাইতে বইছে৷
পাশে বসে সমানে তাকে সাহস দিয়ে যাচ্ছেন শেখরনাথ। ডাক্তার চট্টরাজ খুব বড় ডাক্তার। ধন্বন্তরি। কত মানুষ যে তিনি বাঁচিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তার কথা যেন শুনতেই পায় না জ্যোৎস্না।
মোহনবাঁশির ছেলেমেয়েরা বিশ্বজিতের বাংলো থেকে বেরোবার পর একটি কথাও বলেনি। চুপচাপ বোবার মতো তারা বসে আছে।
একসময় বিনয়কে নিয়ে উঠে পড়লেন শেখরনাথ। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসে বললেন, সেই কখন ওরা দুটি ভাত খেয়ে এসেছে। বেলা হেলতে শুরু করেছে; নিশ্চয়ই ওদের খিদে পেয়ে গেছে। এক কাজ কর গাড়ি নিয়ে এবারডিন মার্কেটে চলে যাও। ওখানে অনেক হোটেল আর খাবারের দোকান আছে। তুমি সবার মতো রুটি তরকারি মিষ্টি নিয়ে এসো। পকেট থেকে টাকা বার করে দিতে দিতে বলতে লাগলেন, আমি জ্যোৎস্নাদের কাছেই থাকি। দুজনে একসঙ্গে চলে গেলে ওরা দিশেহারা হয়ে পড়বে।
যে গাড়িতে সবাই হাসপাতালে এসেছিল সেটা একধারে দাঁড়িয়ে আছে। বিনয় আধঘণ্টার ভেতর রুটি টুটি কিনে ফিরে এল।
মোহনবাঁশির ছেলেমেয়েরা তবু একটু আধটু খেল। কিন্তু জ্যোৎস্নাকে কোনওভাবেই খাওয়ানো গেল না।
শেখরনাথ বারবার বোঝাতে লাগলেন, না খেলে নাড়ি চুঁইয়ে যাবে। ডাক্তাররা তো মোহনবাঁশিকে দেখছেন। সে যাতে সুস্থহয়ে ওঠে সেই চেষ্টা করছেন। নিজেকে কষ্ট দিয়ে কী লাভ তোমার?
ব্যাকুলভাবে জ্যোৎস্না বলতে লাগল, আমারে খাওনের কথা কইয়েন না বাবা। গলা দিয়া কিছু নামব না।
.
আরও ঘণ্টা দুই পর সূর্য যখন মাউন্ট হ্যারিয়েটের দিকে হেলতে শুরু করেছে, সেই সময় ডাক্তার চট্টরাজ তেতলা থেকে নেমে এলেন।
শেখরনাথের সঙ্গে বিনয় জ্যোৎস্নারাও ব্যগ্রভাবে উঠে দাঁড়াল। ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, অপারেশন হয়ে গেছে।
৩.০৫ ডাক্তার চট্টরাজ
ডাক্তার চট্টরাজকে ভীষণ ক্লান্ত এবং বিধস্ত দেখাচ্ছিল। কপালে দানা দানা ঘাম জমেছে। আন্দাজ করা যায় তার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে।
কেউ কিছু বলার আগেই রুদ্ধশ্বাসে জ্যোৎস্না জিগ্যেস করল, হ্যায় (সে) বাইচা আছে তো? কণ্ঠস্বরে তীব্র ব্যাকুলতা। পোর্টব্লেয়ারে আসার পর এই প্রশ্নটা যে সে কতবার করেছে।
ডাক্তার,চট্টরাজ উত্তর দিতে গিয়ে একটু থমকে গেলেন। তারপর যেন দ্বিধা কাটিয়ে উঠে বললেন, সেই রকমই আশা করছি।
জ্যোৎস্না বলল, ডাক্তারবাবু; আমারে হের (তার) কাছে লইয়া যান৷
এখন নিয়ে যাওয়া যাবে না।
দয়া করেন ডাক্তারবাবু, হেরে (তাকে) একবার খালি দেখুম। আপনের পায়ে ধরি
জ্যোৎস্না ডাক্তার চট্টরাজের পায়ের দিকে ঝুঁকতে যাচ্ছিল, বিব্রতভাবে তার হাতদুটো ধরে বললেন, না না, তুমি বোসো। অপারেশনের পর তোমার স্বামীকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। সে ঘুমোচ্ছে।
কিন্তু কে কার কথা শোনে। হাতজোড় করে সে সমানে বলে যেতে লাগল, মোহনবাঁশির কাছে তাকে নিয়ে যেতেই হবে।
শেখরনাথ আর বিনয় একদৃষ্টে ডাক্তার চট্টরাজকে লক্ষ করছিল। দুজনেরই মনে হচ্ছিল, অপারেশনটা হয়ে গেলেও কোথায় যেন সমস্যা রয়েছে। শেখরনাথ কী ভেবে জ্যোৎস্নাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে বসতে বলে ডাক্তার চট্টরাজকে বললেন, চল, তোমার চেম্বারে যাওয়া যাক–
ডাক্তার চট্টরাজ খুব সম্ভব এটাই চাইছিলেন। ব্যস্তভাবে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ চলুন–
চেম্বারে গিয়ে শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, তোমার মুখচোখ দেখে কেমন যেন লাগছে। অপারেশনটা কি সাকসেসফুল হয়নি?
নিশ্চয়ই হয়েছে। ডাক্তার চট্টরাজ চকিত হয়ে উঠলেন। তবে কেসটা তো ভীষণ ক্রিটিক্যাল। একটা প্রবলেম দেখা দিয়েছে। সেটা মোহনবাঁশির স্ত্রীর সামনে বলতে চাইনি।
কী প্রবলেম? শেখরনাথকে চিন্তিত দেখাল।
অনেক কষ্টে খুব সাবধানে আমরা তিরটা বার করতে পেরেছি। কিন্তু যে ভয়টা হচ্ছিল সেটা ঘটেছে।
কী সেটা?
ফুসফুস থেকে খানিকটা ব্লিডিং হয়েছে। এখনও হচ্ছে। আপনাকে আগেই বলেছিলাম, রক্ত বেরোনোটা ভালো নয়।
মুখটা থমথমে হয়ে গেল শেখরনাথের। কোনও প্রশ্ন না করে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, রক্ত বেরোনোর ফলে পেশেন্টের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, ফ্যাটাল কিছু হয়ে যাবে না তো?
বাহাত্তর ঘণ্টা না গেলে সেটা বলা যাবে না। তবে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে, সেই সঙ্গে ব্লাডও। এখন দেখা যাক।
অনেকক্ষণ নীরবতা।
তারপর শেখরনাথ বললেন, র্জোৎস্না ভীষণ উতলা হয়ে আছে। ওকে নিয়ে গিয়ে কি একবার মোহনবাঁশিকে দেখিয়ে আনা যায়?
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, সেটা ঠিক হবে না। পেশেন্টের নাকে অক্সিজেনের নল, বেডের পাশে ব্লাড় আর অন্য সব ওষুধের বোতল ঝুলছে। এসব দেখলে মোহনবাঁশির স্ত্রী খুব নার্ভাস হয়ে পড়বে।
তবু– বাকিটা শেষ না করে থেমে গেলেন শেখরনাথ।
বেশ, আপনি যখন বলছেন তাই হবে। কিন্তু দূর থেকে দেখাব। এমন একটা দৃশ্য দেখলে কান্নাকাটি করবে, স্বামীকে আঁকড়ে ধরতে চাইবে। আপনাকে কিন্তু সেটা সামলাতে হবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।