তাকে বোঝাবে কে?
প্রাইমারি দায়িত্ব আমার। তবে আপনিও সঙ্গে থাকবেন। আন্দামানের সবাই আপনাকে শ্রদ্ধা করে, বিশ্বাস করে। বলে ঘড়ি দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ডাক্তার চট্টরাজ।-এগারোটা বেজে গেছে। আর দেরি করা যাবে না। মোহনবাঁশির স্ত্রীকে এখানে ডাকা দরকার। আমি লোক পাঠাচ্ছি।
না না, কারওকে পাঠাতে হবে না। আমি ওকে নিয়ে আসছি। শেখরনাথ উঠে পড়লেন। একটু পরে মোহনবাঁশির বউকে সঙ্গে করে ফিরে এলেন। ছেলেমেয়েগুলো সঙ্গে এসেছিল। তারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, তোমার নাম কী? ডাক্তারের চেম্বারে তার ডাক পড়বে, ভাবতে পারেনি মেয়েমানুষটি। কেমন যেন হতচকিত সে। কোনওরকমে বলতে পারল, জোছছনা–
জ্যোৎস্না?
আস্তে মাথা নাড়ল শেখরনাথের বউ।
শেখরনাথ একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, বোসো
জ্যোৎস্না বসল না; শেখরনাথদের সামনে চেয়ারে বসতে তার সংকোচ হচ্ছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে জিগ্যেস করল, আমারে আনলেন ক্যান? মানুষটার কি কিছুহইচে? বাইচা আছে তো?
কিছু হয়নি। বেঁচে আছে। ডাক্তারবাবু তোমার সঙ্গে মোহনবাঁশির অপারেশনের ব্যাপারে কথা বলবেন। মন দিয়ে শোনো।
টেবিলের একটা কোন ধরে দাঁড়িয়ে রইল জ্যোৎস্না।
অপারেশন সম্পর্কে খানিক আগে ডাক্তার চট্টরাজ শেখরনাথকে যা যা বলেছিলেন, সে সব জানিয়ে দিলেন। জ্যোৎস্নাকে।
কিছুক্ষণ বিহ্বলের মতো তাকিয়ে রইল জ্যোৎস্না। তারপর শেখরনাথের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সারা শরীর তার কাঁপছে। ভাঙা। ভাঙা ভয়ার্ত সুরে সে বলল, কাটান ছিড়ান (কাটাছেঁড়া অর্থাৎ অপারেশন) কইরাও যদিন হেরে (তাকে) বাঁচান না যায়, হেইটা। (সেটা) কইরা কী অইব বাবা? শেখরনাথকে সে বাবা বলল।
বলেই দুহাত মুখ ঢেকে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল জ্যোৎস্না। সমানে কেঁদে চলেছে সে। কান্নাটা তার বুকের ভেতর থেকে যেন উথলে উথলে বেরিয়ে আসছে। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাতে আঁকাতে একটানা বলে চলেছে সে, মানুষটার মরণ অইব, আর আমি টিপসই দিমু? কিছুতেই না, কিছুতেই না। হের (তার) থিকা আপনেরা আমারে মাইরা ফেলান, মাইরা ফেলান
বন্ডে টিপসই দেবার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়াটা এমন হবে, ভাবা যায়নি। চেম্বারের সবাই হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকে।
কয়েক লহমা মাত্র। তারপর চেয়ার ঠেলে উঠে পড়েন শেখরনাথ। দুহাতে জ্যোৎস্নাকে টেনে তুলে একরকম জোর করেই চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললেন, কাঁদবে না, কাঁদবে না। আমার কথা শোনো। আমাকে বাবা বলেছ তো? আমার ওপর ভরসা রাখো। তোমাদের এতটুকু ক্ষতি হয় তাই কখনও আমি করব না।
শান্ত হতে খানিকটা সময় লাগল জ্যোৎস্নার। তারপর চোখের জল মুছে ভারী গলায় বলল, কী কইবেন কন–
শেখরনাথ এবার যা বললেন, তা এইরকম। মোহনবাঁশির অপারেশন না হলে মৃত্যু অনিবার্য। হাসপাতালে তাকে রাখা হবে না; আজই জেফ্রি পয়েন্টে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন ডাক্তার চট্টরাজ। অপারেশন হলে বাঁচার সম্ভাবনা আছে; ষোলো আনার মধ্যে আট আনা; মৃত্যুর আশঙ্কাও আট আনা। এখন জ্যোৎস্নাকেই ঠিক করতে হবে সে কী করবে। তার টিপসই ছাড়া। কোনও ভাবেই অপারেশন করা যাবে না। এটাই হাসপাতালের। নিয়ম।
জ্যোৎস্না বলল, আপনে যা কইবেন হেইটাই করুম।
না; আমি না। তোমাকেই ভাবতে হবে টিপসই দিতে রাজি আছ কিনা। তবে সময় কিন্তু হাতে বেশি নেই। যত দেরি করবে মোহনবাঁশির পক্ষে ততই ক্ষতি।
কিছুক্ষণ নতমুখে বসে রইল জ্যোৎস্না। বিনয় সারাক্ষণ এই চেম্বারে নীরব দর্শকের মতো সব শুনে যাচ্ছিল এবং দেখেও যাচ্ছে। সে লক্ষ করল জ্যোৎস্নার ভেতরে কোথাও যেন একটা যুদ্ধ চলছে। একসময় মুখ তুলে তাকাল সে৷ এই জ্যোৎস্না ভয়কাতর, ত্রস্ত, আতঙ্কগ্রস্ত জ্যোৎস্না নয়। অন্য কেউ। দৃঢ়, নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। বোঝা যাচ্ছে, সে মনস্থির করে ফেলেছে। বলল, কুনহানে(কোথায়)টিপসই দিতে অইব, দেখাইয়া দ্যান
ডাক্তার চট্টরাজ ফর্মের নানা জায়গা পূরণ করে রেখেছিলেন। নিচের দিকের একটা ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে বললেন, এখানে– একটা কালির প্যাড তিনি জ্যোৎস্নার দিকে এগিয়ে দিলেন।
টিপসই হয়ে গেলে দ্রুত উঠে পড়লেন ডাক্তার চট্টরাজ। শেখরনাথকে বললেন, আমি ওটিতে চলে যাচ্ছি কাকা। যতক্ষণ অপারেশন শেষ না হচ্ছে বিনয়বাবু আর আপনি আমার চেম্বারে বসতে পারেন। জ্যোৎস্না কর্মকার বাইরের বেঞ্চে গিয়ে বসুক।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, অপারেশনে কতক্ষণ লাগবে?
অপারেশন করতে কতটা সময় লাগবে?
এখনই বলতে পারছি না। তবে তিন চার ঘণ্টার কম নয়।
শেখরনাথ বললেন, আমরা এখানে থাকব না। জ্যোৎস্নাদের সঙ্গেই থাকব।
তার মনোভাবটা বুঝতে পারল বিনয়। জ্যোৎস্না এবং তার ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি থাকলে ওরা ভরসা পাবে।
ডাক্তার চট্টরাজ আর কিছু বললেন না। অপারেশন থিয়েটার তেতলায়। চেম্বার থেকে বেরিয়ে তিনি সেখানে চলে গেলেন। শেখরনাথও বসে থাকলেন না; বিনয় এবং জ্যোৎস্নাকে সঙ্গে করে বাইরের প্যাসেজে বেঞ্চিতে এসে বসলেন।
সময় কাটতে থাকে। এদিকে হাসপাতালের চত্বরে নতুন নতুন রোগী আসছে। সঙ্গে তাদের বাড়ির লোকজন। চারিদিক এখন সরগরম।
সূর্য সেলুলার জেলের মাথা ডিঙিয়ে পশ্চিম দিকে খানিকটা নেমে গেছে। হাসপাতালের এই লম্বা প্যাসেজ থেকে সেসোস্ট্রেস বের অনেকটা অংশ চোখে পড়ে। তেজি রোদে উপসাগরের জল ফেনিয়ে উঠে পাড়ের দিকে ধেয়ে আসছে। অশান্ত, উত্তাল ঢেউয়ের অবিরল গজরানি শোনা যাচ্ছে। দূরে-কাছে যতদূর চোখ যায় জেলেদের ছোট ছোট বোট। মাঝে মাঝে দু-চারটে লঞ্চ। হাসপাতাল থেকে সেগুলোকে দম-দেওয়া খেলনা জলযানের মতো দেখায়। তবে সবচেয়ে বেশি করে যা চোখে পড়ে তা হল ঝাঁকে ঝাঁকে সী-গাল৷

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।