ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, মনে হয় না। তবে রাত্তিরে অনেক চেষ্টা করেও জ্ঞান ফেরানো যায়নি৷ আসলে ফুসফুস থেকে তিরটা বার করা দরকার। ওটা বেশিক্ষণ বিধে থাকলে বিপদ হবে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ডাক্তার চট্টরাজই ফের শুরু করলেন, ইন্টার আইল্যান্ড শিপ সারভিসের যে জাহাজটা দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়ায় এখন সেটা নিকোবরে যাবার কথা নয়। কদিন আগে সুকুমার আর তাপস ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের জাহাজে গিয়েছিল। আজ। সকালে সেই জাহাজেই তাদের ফেরার কথা। ঘড়ি দেখে বললেন, দশটা বেজে গেল! কেন জাহাজটা আসছে না, বুঝতে পারছি না।
যে বিপ্লবী একদিন অসীম দুঃসাহসে বন্দুক-রিভলবার হাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিলেন, তার কাছে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে লেশমাত্র প্রভেদ ছিল না, একজন তুচ্ছ উদ্বাস্তুর জন্য তাকে এই মুহূর্তে ভীষণ বিচলিত দেখাচ্ছে। বললেন ধরা যাক, ওদের আসতে আরও দেরি হল, তখন একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, না করে থেমে গেলেন।
ডাক্তার চট্টরাজ আগে থেকেই খুব সম্ভব সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন। তখুনি উত্তর দিলেন, আর-এক ঘণ্টা দেখব। তারপর আমি একাই অপারেশনটা করব। হয়তো একটু রিস্ক নেওয়া হবে কিন্তু কিছু করার নেই।
বিনয় চুপচাপ বসে দুজনের কথা শুনছিল। লক্ষ করেছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে ডান পাশের জোড়া জানলার বাইরে বারবার তাকাচ্ছেন। দূরে, উতরাইয়ের নিচের দিকে সিসোস্ট্রেস বের এপারে একটা ছোট জেটি রয়েছে। একদিন এই জেটিতে নেমেই রস আইল্যান্ড থেকে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে মোটর বোট থেকে। ওখানে এসেই নেমেছিল সে। বনবিভাগের জাহাজ ওখানে এসে ভেড়ার কথা। কিন্তু না, জেটিটা একেবারে শুনশান। তিনটে লোক জেটির ওপর বসে বসে হাতপাখা নেড়ে গল্প করছে। খুব সম্ভব ওরা জাহাজ দপ্তরের খালাসি জাতীয় কর্মী। অলস সময়টা তারা এই ভাবেই খোশমেজাজে উড়িয়ে দিচ্ছে।
এগারোটা বাজতে যখন মিনিট কুড়ি বাকি, সেই সময় একজন। সিনিয়র ওটি নার্সকে ডাকিয়ে আনলেন ডাক্তার চট্টরাজ। কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তিনি, সেই সময় দুই যুবক প্রায় উর্ধশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে চেম্বারে এসে ঢুকল। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এসেছে, তাই একটু পাচ্ছিল।
ডাক্তার চট্টরাজের কপাল কুঁচকে গেল।– কী ব্যপার, তোমাদের এত দেরি হল? খবর পাঠালাম একটা ক্রিটিকাল কেস এসেছে। ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। একটু দায়িত্ববোধ থাকা উচিত।
বিনয় আন্দাজ করে নিল, এই দুজন ডাক্তার চট্টরাজের সহকারী। কঁচমাচু মুখে তারা জানাল, বনবিভাগের জাহাজ ঠিক সময়েই নিকোবর থেকে রওনা হয়েছিল। কিন্তু সিসোস্ট্রেস বের জেটিতে না ভিড়ে অনেকটা ঘুরে চ্যাথাম জেটিতে চলে যায়। তারা বারবার বলেছিল, তাদের যেন সিসেষ্ট্রেস বেতে নামিয়ে দেয়। কিন্তু জাহাজে কনজারভেটর অব ফরেস্টস ব্রজদুলাল মণ্ডল ছিলেন। নিকোবরে একটা জরুরি কাজে তাকে যেতে হয়েছিল। এদিকে আজই পোর্টব্লেয়ারে বেলা দশটায় তাদের একটা কনফারেন্স আছে। চ্যাথাম হয়ে গেলে ঠিক সময়ে তার কনফারেন্সে পৌঁছাতে সুবিধা হয়। তাই সেসোস্ট্রেস বেতে ওদের জাহাজ থামেনি। যাদের জাহাজ তাদের মর্জিমতো তো চলতে হবে।
ডাক্তার চট্টরাজ ওদের যুক্তিটা মেনে নিলেন। এ নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন না করে বললেন, অনেকটা পথ জাহাজে এসেছ কিন্তু এখন রেস্টের সময় নেই। ভেতরে গিয়ে তৈরি হয়ে নাও। পেশেন্টের নাম মোহনবাঁশি কর্মকার। তার ব্লাড, সুগার সব টেস্ট করা আছে। সিস্টার স্টেলার কাছে রিপোর্টগুলো আছে; দেখে নেবে। কেস হিস্ট্রিও লেখা আছে; পড়ে নিও। আমি এদিকের একটা কাজ সেরে আসছি।
দুই জুনিয়র ডাক্তার চলে গেল। ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, কাকা, অপারেশনের জন্যে মোহনবাঁশি কর্মকারের স্ত্রীর কনসেন্ট চাই। তাকে বন্ডে সই করতে হবে। লিখতে না জানলে তার টিপসই লাগবে।
শেখরনাথ অবাক। বললেন, তার কনসেন্ট লাগবে কেন?
এটা মারাত্মক ধরনের ক্রিটিকাল কেস। অপারেশনটা খুব ০১ ঝুঁকির ব্যাপার। পেশেন্টের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, এখানে স্ত্রী, তাকে। বন্ডে সই বা টিপসই দিতে হয়। এটাই নিয়ম। বলে একটু থামলেন ডাক্তার। তারপর ফের শুরু করলেন, মোহনবাঁশির স্ত্রী বন্ডে সই না করলে অপারেশন করা যাবে না।
তাহলে ব্যাপারটা ওকে বুঝিয়ে বলতে হবে।
হ্যাঁ।
একটু চিন্তা করে শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, তুমি ঝুঁকির কথা বললে। আমি ডাক্তার নই, তবু সেটা আন্দাজ করতে পারছি। জানতে চাইছি অপারেশন করলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, আমরা সব রকম প্রি-কশনারি ব্যবস্থা করেই অপারেশন করব। কিন্তু সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হল তিরটা যদি ফুসফুসের অনেকটা ভেতরে ঢুকে থাকে, আর সেটা খুলতে গিয়ে যদি রক্তপাত হয় অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম দেখা দেবে।
সেটা কী?
প্রচণ্ড শ্বাসজনিত কষ্ট। এমনকী শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ব্রিটিশ ভারতের প্রাক্তন বিপ্লবীটিকে বিচলিত দেখাল। তিনি বললেন, তার মানে তো মৃত্যু।
অস্পষ্টভাবে ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, হ্যাঁ। তারপর গলার স্বরটা পরিষ্কার করে নিলেন।–এই কথাগুলো পেশেন্টের স্ত্রীকে ভালো করে বোঝাতে হবে। তার রাজি হওয়া না-হওয়ার ওপর অপারেশন নির্ভর করছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।