চিঠিটা ফের খামের ভেতর পুরে উঠে পড়ল বিনয়। সোজা গিয়ে দাঁড়াল খোলা জানলার পাশে।
সেই সন্ধে থেকে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল। এখন তা অনেক গাঢ় হয়েছে। কুয়াশার স্তর ভেদ করে ক্ষীণ চাঁদের যে আলোটুকু চুঁইয়ে চুঁইয়ে নেমে আসছে তাতে চরাচরের কোনও কিছুই স্পষ্ট নয়। দূরের দ্বীপগুলো একেবারে ঝাপসা। মাউন্ট হ্যারিয়েটের যে সাদা ক্রসটা আকাশের দিকে মাথা তুলে থাকে। সেটাও দেখা যাচ্ছে না। শুধু আগের মতোই ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দ আর তুমুল ঝোড়ো হাওয়া। বিনয় টের পেল তার বুকের ভেতর তেমনই কিছু চলছে। অবিরল।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। বিমূঢ়। বুদ্ধিভ্রষ্ট। তারপর কখন এসে শুয়ে পড়ল নিজেরই খেয়াল নেই।
.
পরদিন কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল বিনয়ের। এক টানা নয়, থেমে থেমে আর্ত, করুণ সুরে কেউ কেঁদে চলেছে।
৩.০৪ চোখে ঘুমের ঘোর
চোখে ঘুমের ঘোর লেগে আছে। বিনয় প্রথমটা বুঝতে পারল না কান্নার আওয়াজটা কোত্থেকে আসছে। ধড়মড় করে উঠে বসল সে। একটু খেয়াল করতেই সবটা স্পষ্ট হয়ে এল। এই বাংলোতেই কেউ কাঁদছে। কোনও বয়স্ক মেয়েমানুষ।
কাল রাতে সেলুলার জেলের হাসপাতাল থেকে মোহনবাঁশির স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসা হয়েছিল। নিশ্চয়ই তার স্ত্রীর কান্না। এই সকালবেলায় কী এমন ঘটতে পারে যে সে কেঁদে চলেছে।
বিছানা থেকে বাইরে নেমে এল বিনয়। ভেতর দিকের দরজা খোলা রয়েছে। সেটা পেরিয়ে বিশাল ড্রইং-কাম-ডাইনিং হল-এ আসতেই দেখা গেল মেঝের একধারে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদে চলেছে মোহনবাশির বউ। তার গায়ের সঙ্গে লেপটে আছে ছেলে-মেয়েরা। তারা অবশ্য কাঁদছে না। কেমন যেন জড়সড়, ভয়াতুর।
ওদিকে বিশ্বজিৎ এবং শেখরনাথও তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। ভুবন কার্তিক আর গোপালকেও দেখা যাচ্ছে।
বিনয় বিশ্বজিতের কাছে চলে এল। কৌতূহলের চেয়ে উৎকণ্ঠাই হচ্ছে তার বেশি। নিচু গলায় জিগ্যেস করল, কী হয়েছে, মহিলা এত কাঁদছে কেন? হাসপাতাল থেকে কোনও খারাপ খবর এসেছে?
বিশ্বজিৎ মাথা নাড়লেন।–না তো
তাহলে?
কী জানি–।
বিশ্বজিতের কথা শেষ হওয়ার আগেই শেখরনাথ মোহনবাঁশির স্ত্রীর কাছে চলে গেলেন। জানতে চাইলেন। কী হল তোমার? কেঁদো না, কেঁদো না।
কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ থেকে শাড়ির আঁচল সরাল মোহনবাঁশির বউ। চোখ দুটো ফোলা ফোলা, লাল, জলে ভর্তি। বোঝা যায় অনেকক্ষণ কাঁদছে সে।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, কান্নার কী হল?
ধরা ধরা, ভারী গলায় মোহনবাঁশির বউ বলল, আমার মনে জবর কু-ডাক ডাকতে আছে। সারা রাইত কাইল ঘুম হয় নাই। হ্যায় (সেটা) কি অহনও বাইচা রইছে?
তেমন কিছু হলে হাসপাতাল থেকে তোক চলে আসত। চিন্তা কোরো না। নরম, সহানুভূতির সুরে বললেন শেখরনাথ।
ব্যাকুলভাবে মোহনবাঁশির বউ বলল, আমাগো হাসপাতলে লইয়া চলেন
কিছুক্ষণ পরেই যাব। তোমরা চানটান করে খেয়ে নাও। আজ সারাদিন হাসপাতালেই থাকতে হবে।
.
ঘণ্টাখানেক বাদে মোহনবাঁশির বউছেলেমেয়ে এবং বিনয়কে নিয়ে একটা গাড়িতে বেরিয়ে পড়লেন শেখরনাথ। বিশ্বজিতের পক্ষে এবেলা যাওয়া সম্ভব নয়। পুনর্বাসন দপ্তরের অনেকটা দায়িত্ব তার কাঁধে। তা ছাড়া তিনি একজন ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটও তার কোর্টে নানারকম মামলা লেগেই থাকে। আজ একটা জটিল কেসের শুনানি আছে। সেসব ঝক্কি সামলাতে সামলাতে তিনটে বেজে যাবে। তারপর আদালত থেকে সোজা হাসপাতালে যাবেন।
সাড়ে নটার মতো বাজে। দিনটা বেশ ঝলমলে। ভোরের দিকে যে কুয়াশা পড়েছিল তা কেটে গিয়ে উজ্জ্বল রোদে ভেসে যাচ্ছে শহর পোর্টব্লেয়ার। রোদটা খুব একটা তেজি নয়, বেশ আরামদায়ক। কোথাও ছিটেফোঁটা মেঘও নেই। পরিষ্কার, ঝকঝকে নীলাকাশ। উপকূলের কিনার ঘেঁষে অজস্র পাখি উড়ছে। সবই সি-গাল।
কোনও দিকে লক্ষ ছিল না বিনয়ের। চড়াই-উতরাই ভেঙে যতই গাড়িটা হাসপাতালের দিকে এগচ্ছে ততই উৎকণ্ঠার মাত্রাটা বেড়েই চলেছে। নিকোবর থেকে সেই দুই ডাক্তার কি ফিরে আসতে পেরেছেন? চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার চট্টরাজ কাল জানিয়েছিলেন, এঁরা না এলে মোহনবাঁশির অপারেশন করাটা খুবই কঠিন হয়ে উঠবে। হয়তো করা সম্ভবই হবে না। তখন কী হবে?
গাড়িটা সেলুলার জেলের প্রকাণ্ড গেট পার হয়ে সোজা হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়াল।
দোতলায় উঠতেই দেখা গেল, এর মধ্যেই বেশ ভিড় জমেছে। নতুন রোগী তো আছেই, পুরানো রোগীদের সঙ্গে দেখা করতে তাদের বাড়ির লোকজনও হাজির।
লম্বা প্যাসেজে ভিজিটরদের জন্য যে সারি সারি বেঞ্চ পাতা রয়েছে সেখানে মোহনবাঁশির বউছেলেমেয়েদের বসিয়ে বিনয়কে সঙ্গে করে ডাক্তার চট্টরাজের চেম্বারে চলে এলেন শেখরনাথ।
ডাক্তার চট্টরাজ একাই রয়েছেন। কোনও পেশেন্টের এক্স-রে প্লেট খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। শেখরনাথদের বসার জন্য হাতের ইশারা করলেন।
প্লেটটা দেখা হলে সেটা টেবিলের একধারে নামিয়ে রেখে গম্ভীর মুখে বললেন, ভীষণ মুশকিল হয়ে গেল কাকা। তাকে বেশ চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে।
শেখরনাথ সামনের দিকে একটু ঝুঁকে জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার, নিকোবর থেকে তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জনরা কি এখনও আসেনি?
আস্তে মাথা নাড়লেন ডক্টর চট্টরাজ।
শেখরনাথের দুই চোখে উদ্বেগ ফুটে বেরয় জিগ্যেস করলেন, মোহনবাঁশির কন্ডিশন আজ কেমন? আরও ডেটারিওরেট করেছে?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।