সুধার আরও একটা দুর্ভাবনার কারণ হেমনাথ। তিনিও রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে-বহুদূরে। অন্য কোনও গ্রহে। নিত্য দাস-এর মধ্যে তাদের বাড়ি আসেনি, দাদুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে না। কাগজে রোজই খবর থাকে পূর্ব পাকিস্তানের হাল ক্রমশ আরও খারাপ হচ্ছে। হেমনাথের জন্য ভীষণ অস্থির হয়ে আছে। সুধা।
সে আরও জানিয়েছে, এর মধ্যে তার দাদাশ্বশুর দ্বারিক দত্তকে নিয়ে কম ভোগান্তি যায়নি। হঠাৎই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। এই বয়সে টাইফয়েড। স্পেশালিস্ট ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল। রাত জেগে হিরণ, সুধা আর উমাকে শুশ্রূষা করতে হয়েছে। প্রাণের আশা প্রায় ছিলই না। নেহাত আয়ুর জোরে দ্বারিক দত্ত এ যাত্রা সামলে উঠেছেন। একটা মারাত্মক ফঁড়া কেটে যাওয়ায় আপাতত স্বস্তি। সুধার জেঠিশাশুড়ি সরস্বতী যিনি বারো মাস কোনও না কোনও রোগে ভোগেন– ঈশ্বরের করুণায় ভালো আছেন।
এবার যুগলের কথা। সে এখন মুকুন্দপুর কলোনিরই নয়, ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটা জবরদখল কলোনিরও ছোটখাট নেতা। বিরোধী পার্টিগুলোর ডাকে উদ্বাস্তুদের নিয়ে এসে সে কলকাতায় মিছিল করে। ক্রমশ সে রাজনীতির মধ্যে ঢুকে পড়ছে। কলকাতায় এলে সে সুধাদের বাড়ি আসবেই। যুগল জানায় একবার তারা উদ্বাস্তু হয়ে এ দেশে এসেছে। সরকার যদি জোর করে উচ্ছেদ আইন পাশ করায়ও, জান গেলেও তারা কলোনির দখল ছাড়বে না। কোনওভাবেই দ্বিতীয়বার তারা বাস্তুহারা হবে না।
এসবের মধ্যে একটা সুখবরও দিয়েছে সুধা। অফিসে হিরণের একটা ভালো প্রোমোশনও হয়েছে। মাইনে বেড়ে গেছে। অনেকটাই।
সবশেষে একটা কথা জানতে চেয়েছে সুধা। বিনয় তার প্রথম চিঠিতে লিখেছিল আন্দামানে আসার পর তার জীবনে একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে। সেটা এমনই যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। ঘটনাটা কী, তা জানায়নি। শুধু লিখেছিল কলকাতায় ফিরে সে সবাইকে হতবাক করে দেবে।
সুধা লিখেছে, কবে বিনয় ফিরবে সে জন্য ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারবে না। হেঁয়ালি না করে বিনয় যেন সব খুলে বিশদভাবে জানায়। তাদের বাড়ির সবাই সে জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।
পড়া শেষ করল বিনয়। তার চিঠিতে ঝিনুক সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছিল সে। কিন্তু না, ঝিনুকের কথা এখন কিছুতেই সুধাকে জানানো যাবে না।
বিনয় ভেবেছিল, ঝিনুককে কলকাতায় নিয়ে গেলে একটা চমক লাগানো যাবে। কিন্তু আজ সেলুলার জেলের সামনের ঢালু রাস্তায় ঝিনুক তার সঙ্গে যেভাবে কথা বলেছে, যে ধরনের আচরণ করেছে, চিনেও না-চেনার ভান করেছে তাতে দমে গিয়েছিল সে। তার বিশ্বাস ছিল, একবার তারা মুখোমুখি দাঁড়ালে ঝিনুকের সব অভিমান, সব দুঃখ ঘুচে যাবে। সেই কোন কিশোর বয়স থেকে এই মেয়েটির সঙ্গে পাশাপাশি বড় হতে হতে তার ওপর বিপুল অধিকার জন্মে গিয়েছিল। অন্তত তেমনটাই তার ধারণা। কিন্তু এতকালের সম্পর্কটা আজ একরকম অস্বীকারই করেছে ঝিনুক
মনে মনে একটা ধাক্কা খেলেও বিনয় কিন্তু আশা ছাড়েনি। তার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়েছে৷ রস আইল্যান্ডে ঝিনুককে দেখার পর থেকেই সে স্থির করে রেখেছে মধ্য আন্দামানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করবে। জেফ্রি পয়েন্টে বর্মী–শেল কালেক্টর লা পোয়ের সঙ্গে তার কথাও হয়ে গেছে। বিনয় তাদের মোটরবোট সি-গাল-এ চেপে মিডল আন্দামানে চলে যাবে। লা পোয়ে সেখানকার সবকটা রিফিউজি সেটলমেন্ট চেনে। একবার। পৌঁছুতে পারলে লা পোয়ে ঠিক খুঁজে খুঁজে ঝিনুককে বার করে ফেলবে। বিনয় বলবে প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের বাড়ি থেকে। নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে একবারও তার কথা মনে পড়ল না ঝিনুকের? আত্মীয়-পরিজন, বিশেষ করে অবনীমোহন তার সঙ্গে যে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছেন, তার জন্য বিনয় কি দায়ী? সে যে কত কষ্ট পেয়েছে তা কি একবারও ভাবল না ঝিনুক?
ঝিনুককে বোঝাবে ঠিকই কিন্তু ঝিনুক কি শেষ পর্যন্ত কলকাতায় যেতে আদৌ রাজি হবে? যে বিশ্বাসের জোরে বিনয় তাকে নিয়ে যাবার কথা ভেবেছে তার ভিতটা যেন অনেকখানি ধসে পড়েছে। অদ্ভুত এক সংশয়ে তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে যেতে থাকে।
এর মধ্যেই চার নম্বর অর্থাৎ শেষ খামটা হাতে তুলে নিতেই বিনয়ের সারা শরীরে শিহরন খেলে গেল৷ শিহরন না বলে বিদ্যুৎপ্রবাহ বলা যেতে পারে। খামের ওপর গোটা গোটা অক্ষরে তার নাম লেখা। হাতের লেখাটা তার চেনা– ঝুমা।
এর আগেও ঝুমা চিঠি লিখেছে। কিন্তু রস আইল্যান্ডে ঝিনুককে দেখার পর সে চিঠির উত্তর দেয়নি বিনয়।
আশ্চর্য, আজও ঝিনুকের সঙ্গে সেলুলার জেলের সামনে দেখা হয়েছে। আর আজই কিনা ঝুমারও চিঠি এল। এই দুই নারী অদৃশ্য কোনও সুতোয় তার জীবনে বাঁধা রয়েছে। অন্ততকাল ধরে। সেই গিট যেন ছেঁড়া যায় না। কখনও ঝিনুক সামনে এসে দাঁড়ায়, কখনও ঝুমা। আচ্ছন্নের মতো, খানিকটা নিজের অজান্তেই যেন খাম খুলে চিঠিটা বার করল বিনয়। খুব ছোট্ট চিঠি। সামান্য কয়েকটি লাইন।
একটা মেয়ে প্রাণভরে তোমাকে ভালোবেসেছে। সে সারাদিন তোমার চিঠির আশায় অপেক্ষা করে থাকে। এই মহানগরে কত মানুষ তোমার চিঠি পায়। শুধু সেই মেয়েটা বাদ। তার অপরাধ কী?
লাইনগুলোর মাথায় কোনও সম্বোধন নেই, নিচে কারুর নামও না।
ঝুমার অভিমান, ঝুমার মানসিক যাতনা এর মধ্যেই তীব্র ব্যাকুলতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। কদিন আগেই এই মেয়েটাকে নিজের জীবন থেকে খারিজ করে দেবার কথা ভেবেছিল বিনয়। কিন্তু ঝিনুকের মতো সেও যেন শতপাকে তাকে জড়িয়ে রেখেছে। সরিয়ে দিতে গেলেও বুঝি বা তাকে সরানো যায় না। ঝিনুক আর ঝুমা, এই দুই নারী যেন তার অনিবার্য নিয়তি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।