প্ৰথম খামটা খুলতেই নতুন ভারত-এর চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ির চিঠি বেরিয়ে পড়ল। তাঁর চিঠিতে ফেনানো ব্যাপার থাকে না। কাজের কথাগুলো গুছিয়ে সংক্ষেপে লিখে পাঠান।
প্রসাদদা আগের চিঠির মতোই এবারও লিখেছেন বিনয়ের রিপোর্টগুলো পাঠকদের মধ্যে তুমুল সাড়া জাগিয়েছে। তবে লেখার সঙ্গে আন্দামানের রিফিউজি সেটলমেন্ট, সেখানকার মানুষজন, এবং অন্যান্য বাসিন্দা, বিশেষ করে পেনাল কলোনির লোকজন, সেলুলার জেল, রস আইল্যান্ড ইত্যাদি এলাকায় যারা থাকে তাদের ফোটো থাকাটা ভীষণ জরুরি। তাছাড়া আন্দামানের আদিম জনজাতি জারোয়া, ওঙ্গে এবং গ্রেট আন্দামানিজদের ছবি যেভবে হোক জোগাড় করে পাঠাতে হবে। মনে রাখা দরকার খবরের কাগজে চার কলম একটা প্রতিবেদনের চাইতে প্রাসঙ্গিক একটা ভালো ফোটো পাঠকের কাছে বিরাট ছাপ রাখে। রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দেয়। আপাতত আন্দামান থেকেই একটা ক্যামেরা জোগাড় করে কাজ চালিয়ে নিক। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অফিস থেকে ক্যামেরা পাঠানো হচ্ছে।
প্রসাদদা লিখেছেন, আগের চিঠিতে তিনি যা জানিয়েছিলেন, কলকাতার অবস্থা এখন তার চেয়ে অনেক বেশি অগ্নিগর্ভ। হাজরা.পার্ক, শ্ৰদ্ধানন্দ পার্ক, দেশবন্ধু বা দেশপ্রিয় পার্ক– সর্বত্র রোজ উদ্বাস্তুদের নিয়ে মিটিং চলছে। তার ওপর রয়েছে মিছিল। মহানগরের উত্তর বা দক্ষিণ কিংবা পুব, যেদিকেই যাওয়া যাক বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিছিল শুরু হয়ে যায়। মিছিলে মিছিলে যান চলাচল ঘণ্টার পর ঘণ্টা থমকে যায়। শহরের নাভিশ্বাস উঠতে থাকে।
এদিকে জবরদখল কলোনিগুলো থেকে উদ্বাস্তুদের তুলে দেবার জন্য জমি মালিকদের চাপে পশ্চিমবঙ্গ সরকার উচ্ছেদ বিল আনতে চলেছে। বিরোধী দলগুলো কিছুতেই বিল পাশ করতে দেবে না। ফলে বিরাট সংঘাত অনিবার্য।
সীমান্তের ওপার থেকে উদ্বাস্তুরা যেমন আসছিল তেমনই আসছে। যে সব ছিন্নমূল মানুষ পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসামে গিয়েছিল উৎখাত হয়ে তারাও আসছে। তাদের আসাটা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।
শুধু উদ্বাস্তুদের নিয়ে আন্দোলনই নয়, ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টও দ্রুত বিরাট আকার নিচ্ছে। কলকাতার চারপাশে যত কলকারখানা, বিশেষ করে জুট মিল আর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটগুলোর কোনও না কোনওটায় রোজই প্রায় ডাকা হচ্ছে স্ট্রাইক, মালিকপক্ষ ঝুলিয়ে দিচ্ছে লক-আউটের নোটিস। উদ্বাস্তুদের মতো কারখানার শ্রমিকদেরও নিয়ে বেরুচ্ছে মিছিল। জওহরলাল নেহরু বলেছেন, কলকাতা এখন মিছিল নগরী– সিটি অব প্রশেসনস।
কলকাতার পরিস্থিতি জানানো হল। বিনয় যেন যত শিগগির পারে চার পাঁচটা প্রতিবেদন একসঙ্গে পাঠিয়ে দেয়।
প্রসাদদার আগের চিঠির বয়ান প্রায় একইরকম ছিল। তবে উদ্বাস্তুদের আন্দোলনটা আরও ঘোরালো হয়েছে। সেই সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্ট।
অন্যমনস্কর মতো চিঠিটা ভাঁজ করে খামে পুরতে পুরতে বিনয় আন্দাজ করতে চেষ্টা করল কলকাতা যেন একটা আগ্নেয়গিরির মাথায় বসে আছে।
এবার দুনম্বর চিঠি। সেটা সুনীতির। মাত্র কয়েকটা লাইন। তার মধ্যে নিজের যাবতীয় ক্ষোভ এবং অভিমান ঢেলে দিয়েছে। কারণও আছে। আন্দামানে আসার পর অনেককেই চিঠি লিখেছে, বিনয়। আনন্দকে লিখেছে বলে সুনীতিকে লেখার কথা ভাবেনি।
সুনীতি লিখেছে অতি অবশ্য বিনয় যেন তার চিঠির জবাব দেয়। বিনয়ের জন্যে সারাক্ষণ সে চিন্তায় থাকে। অথচ তার কথা ভাইয়ের মনে পড়ে না। এরপর লিখেছে— হেমনলিনী, আনন্দ, তার দেওর এবং জা দীপক আর মাধুরী সবাই ভালো আছে। পারিবারিক নানা ব্যস্ততার কারণে সুধাদের বাড়ি এর মধ্যে যাওয়া হয়নি। তবে সামনের রবিবারের পরের রবিবার সে আর আনন্দ অবশ্যই যাবে। সারাটা দিন তাদের সঙ্গে কাটিয়ে আসবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনেকের কথাই লিখেছে সুনীতি কিন্তু ঝুমা সম্পর্কে একেবারেই নীরব। ঝুমা নামে কোনও তরুণীকে সে চেনে বলেই মনে হয় না।
চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে বিনয়। আটশো মাইল দূরে বসে ঝুমা সম্পর্কে তার নতুন মনোভাবটা কি আঁচ করে ফেলেছে সুনীতিরা? বোঝা গেল না।
এক সময় তিন নম্বর খামটা খুলল বিনয়। সুধার চিঠি। খুদি খুদি অক্ষরে পাক্কা তিনটি পাতা বোঝাই। এর কমে সে চিঠি লিখতে পারে না।
বিনয় যে তার আগের চিঠির জবাব দিয়েছিল সেটা পেয়ে সুধা ভীষণ খুশি। তার আবদার, বিনয়ের যত কাজই থাক, সে যেন অবশ্যই, অবশ্যই সময় করে নিয়মিত তাকে চিঠি লেখে। সে তাদের একমাত্র ভাই। কলকাতায় তাদের নতুন বাড়িতে না থাকায় কত দুঃখ যে পেয়েছিল সুধা। এই কষ্ট তার ইহ জীবনে ঘুচবে না।
বিনয় উঠল গিয়ে কিনা একটা নোংরা বারোয়ারি মেসে। সেখানে রাজ্যের মানুষ, সারাক্ষণ হইচই, হট্টগোল৷ এই সব জায়গায় খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কোনওভাবেই মনের মতো হতে পারে না। আধো-অন্ধকার চাটাইয়ের ময়লা আসনে বসে কী যে খায় বিনয়! তবু একটু সান্ত্বনা, ইচ্ছা করলে যখন তখন শান্তিনিবাস মেসে গিয়ে তাকে দেখে আসা যায়। বিনয়ও আসতে পারে তাদের কাছে। ট্রামে বা বাসে বড়জোর মিনিট কুড়ি পঁচিশেকের ব্যাপার। কিন্তু কালাপানি পাড়ি দিয়ে আন্দামানের কোন ভয়ংকর বিজন অরণ্যে গিয়ে বসে আছে বিনয়। আতঙ্কে সারাক্ষণ সুধার বুক কাপে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।