বিনয় তার ঘরে চলে এসেছিল। দুই দেওয়ালে জোরালো আলো জ্বলছে। তেজি আলোয় ভরে আছে ঘরটা।
গোপালের কাজে খুঁত নেই। খাটের পাশে জগ ভর্তি জল এবং কাচের ঝকঝকে গেলাস রেখেছে। তাছাড়া এলাচ-লবঙ্গ ভর্তি একটা ছোট কৌটোও। এখন মশারি খাটিয়ে বিছানার চারপাশে পরিপাটি করে গুঁজে দিচ্ছে।
শিয়রের দিকে খোলা জোড়া জানলা। তার পাশে পড়াশোনার জন্য ছোট টেবিল এবং চেয়ার। বিনয় চেয়ারে বসে তড়িৎ গতিতে গোপালের হাত চালানো দেখছিল। সেই সকালের দিকে জেফ্রি পয়েন্ট থেকে মোহনবাঁশিকে ট্রাকে চাপিয়ে তারা চলে এসেছে। সারাদিন শরীরের ওপর প্রচণ্ড ধকল গেছে। স্নানের পর পেটে ভাত পড়তেই অসীম ক্লান্তিতে দুচোখ জুড়ে আসছিল। গোপাল তার কাজ শেষ করা মাত্র সে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়বে।
বিশ্বজিৎ ঘরে এসে ঢুকলেন। তার হাতে পুরু ব্রাউন কাগজের একটা প্যাকেট। একটু অবাক হয়েই উঠে দাঁড়াল বিনয়। খানিক আগেই খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে তিনি শুতে চলে গিয়েছিলেন। হঠাৎ কী এমন হল যে এ সময় তাকে আসতে হয়েছে!
বিশ্বজিৎ বললেন, নানা কথায় একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। কলকাতা থেকে কাল আপনার কয়েকটা চিঠি এসেছে। এর ভেতর সব রেখে দিয়েছি। ভেবেছিলাম জেফ্রি পয়েন্টে পাঠিয়ে দেব। ভালোই হল আপনি পোর্টব্লেয়ারে চলে এসেছেন। এই নিন। প্যাকেটটা বিনয়ের হাতে দিলেন।
গোপালের মশারি গোঁজা হয়ে গিয়েছিল। সে চলে গেল। বিশ্বজিৎ কিন্তু গেলেন না। ঘরে বাড়তি একটা চেয়ার রয়েছে সেটা টেনে এনে বসতে বসতে বললেন, কী হল, দাঁড়িয়ে কেন? বসুন। আপনার সঙ্গে জরুরি একটা কথা আছে। আর্জিও বলতে পারেন।
বিনয়ের বিস্ময় বাড়ছিলই। এতক্ষণ ড্রইংরুমে বসে কত আলোচনা হয়েছে। একসঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে তারা খেয়েছে। তখনও কিছু কথাবার্তা যে হয়নি তা নয়। তারপরও বিশ্বজিতের কী এমন কথা থাকতে পারে, সে ভেবে পেল না। তাছাড়া আর্জি শব্দ কেমন ধন্দের মতো মনে হচ্ছে। ধীরে ধীরে বসে পড়ল বিনয়। কোনও প্রশ্ন করল না।
বিশ্বজিৎ বললেন, মোহনবাঁশি কর্মকারের ব্যাপারটা খুবই আনফরচুনেট ঘটনা। আপনি নিজে তার প্রত্যক্ষদর্শী। আমার বিশেষ অনুরোধ এই নিয়ে কোনও রিপোর্ট কলকাতায় পাঠাবেন না। বিনয় চমকে উঠল। –এ কী বলছেন! আমি একজন সাংবাদিক। এখানে যা ঘটছে, নিজের চোখে যা যা দেখছি তা লেখার জন্যেই তো আমাকে আন্দামানে পাঠানো হয়েছে। সঠিক তথ্য পাঠকের কাছে তুলে না ধরাটা তো অন্যায়। ডিসঅনেষ্টি।
বিশ্বজিৎ প্রায় অনুনয়ের সুরে বললেন, আপনি যা বললেন তা হান্ড্রেড পারসেন্ট ট্র। কিন্তু বেঙ্গল, বিশেষ করে উদ্বাস্তুদের স্বার্থে দয়া করে এই ইনসিডেন্টটার কথা লিখবেন না। তিনি বোঝাতে লাগলেন, কলকাতায় উদ্বাস্তুদের নিয়ে মারমুখি আন্দোলন চলছে, এই রিপোর্টটা বেরুলে পার্টিগুলো মারাত্মক একটা অস্ত্র হাতে পেয়ে যাবে। রিফিউজিরাও ভীষণ ভয় পাবে। আন্দামানের জাহাজে তাদের তোলা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এদিকে জঙ্গলের ফাঁকা জমিগুলোতে মোপলাদের বসানোর ভাবনাচিন্তা চলছে। সেটা বিপজ্জনক ব্যাপার।
কত ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন এই দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। পুরোদমে বিশাল কর্মকাণ্ড চলছে। উদ্বাস্তুরা না তাদের নতুন করে বাঁচার সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করে ফেলে। একটা ঘটনা যদিও সেটা খুবই মর্মান্তিক গোপন করলে যদি হাজার হাজার মানুষের কল্যাণ হয় সেটা বিরাট ব্যাপার। আন্দামান নামে এই জিয়নকাঠিটি কখনওই ছাড়া ঠিক হবে না।
বিশ্বজিৎ আরও বললেন, জেফ্রি পয়েন্টে জারোয়ারা আর যাতে হামলা চালাতে না পারে সে জন্য সিকিউরিটি বন্দোবস্ত আরও জোরদার করা হবে। তাছাড়া আরও কিছু কিছু ব্যবস্থার কথাও ভাবা হবে।
শুনতে শুনতে অভিভূত হয়ে পড়েছিল বিনয়। বিশ্বজিৎকে যত দেখছে তার শ্রদ্ধা যেন ততই বেড়ে যাচ্ছে। এই মানুষটির লেশ মাত্র স্বার্থ নেই। তিনি অজস্র টাকা মাইনে পান, প্রচুর পার্কস, সেই সঙ্গে বিপুল ক্ষমতা। রিফিউজিরা যদি না আসে, ফাঁকা জমিতে যদি মোপলাদের বসিয়ে দেওয়া হয় তাতে তার এতটুকু ক্ষতি হবে না। বরং যেভাবে পুনর্বাসনের কাজে জঙ্গলে জঙ্গলে ছোটাছুটি করেন, যেভাবে দিন রাত পরিশ্রম করেন তার কিছুই করতে হবে না। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ফুরফুরে হালকা মেজাজে তিনি বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবেন। অথচ উদ্বাস্তুদের জন্য তার কী অফুরান মমতা, তার জন্য তিনি কত ভাবেন। নিঃস্বার্থ এই মানুষটি বহুজন হিতে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব সঁপে দিয়েছেন।
বিনয় কয়েক লহমা তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গাঢ় গলায় বলল, ঠিক আছে, মোহনবাঁশির কথা লিখব না।
বিশ্বজিৎ উঠে পড়লেন। কৃতজ্ঞ সুরে বললেন, অনেক ধন্যবাদ। আমি চলি। আপনি শুয়ে পড়ুন।
তিনি চলে যাবার পরও বসে রইল বিনয়। এখন চারিদিক নিঝুম। শুধু সিসোস্ট্রেস বের ঢেউগুলো অবিরল ঝাঁপিয়ে পড়ছে পাড়ের পাথরের চাইগুলোর ওপর। দূর সমুদ্র থেকে ঝেড়ো হাওয়া উঠে এসে পোর্টব্লেয়ারের সবগুলো বিশাল বিশাল গাছের ঝুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে চলেছে। ঢেউ আর বাতাসের আওয়াজ ছাড়া কোথাও অন্য কোনও শব্দ নেই।
এক সময় উঠে পড়তে যাচ্ছিল বিনয়। তখনই খেয়াল হল হাতের ভেতর চিঠির প্যাকেটটা ধরা রয়েছে। না, এখন আর শোওয়া হবে না। প্যাকেটটা টেবিলে রেখে চিঠিগুলো বার করল সে৷ গুনে দেখল মোট চারটে সবই খামের চিঠি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।