কীরকম।
পশ্চিমবাংলার বাইরে এটা সেকেন্ড বেঙ্গল হয়ে উঠুক চিফ কমিশনর খুব সম্ভব তা চান না।
চকিতে সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। রস আইল্যান্ড থেকে উদ্বাস্তুদের নিয়ে এবারডিন মার্কেটের সামনের মাঠে চলে এসেছিল বিভাস আর নিরঞ্জন। সঙ্গে ছিল বিনয় আর বিশ্বজিৎও। সেখানে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে চিফ কমিশনারকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তিনি তাদের আন্দামানে স্বাগত জানিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলেছিলেন। তার মুখ থেকে অবিরল। মধু ঝরে পড়ছিল। শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল বিনয়। মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধাও হয়েছিল খুব। পরে এই নিয়ে যখন বিশ্বজিতের সঙ্গে কথা হয়, রহস্যময় হেসে তিনি বলেছেন, লোকটার দুটো মুখ। আজ বোঝা গেল একটা মুখ দিয়ে তিনি উদ্বাস্তুদের জন্য অপার সহানুভূতি ঢেলে দেন। কিন্তু আড়ালে যে। মুখটা রয়েছে সেটা ভীষণ চতুর। ফন্দিবাজ। উদ্বাস্তুরা হাজারে হাজারে এলে এই বিশাল দ্বীপপুঞ্জ বাঙালিদের দখলে চলে যাবে। সেটা তার কাম্য নয়। এই দ্বিতীয় মুখটা সম্পর্কে সেদিন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বিশ্বজিৎ।
এদিকে রীতিমতো চিন্তিত দেখাল শেখরনাথকে। বললেন, এটা ভীষণ দুর্ভাবনার কথা। মোপলাদের সম্বন্ধে আমার কোনওরকম বিদ্বেষ নেই। কিন্তু প্রায়োরিটি অবশ্যই বাঙালি উদ্বাস্তুদের রিহ্যাবিলিটেশন। ওয়েস্ট বেঙ্গল তো উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ বা বম্বে প্রেসিডেন্সির মতো বিশাল স্টেট নয়। এত উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন দেওয়ার মতো জমি-জায়গা সেখানে কোথায়? আন্দামান হাতছাড়া হয়ে গেলে মহা সর্বনাশ।
বিশ্বজিৎ উত্তর দিলেন না।
বিপ্লবী কাকা এবং আন্দামানের বড় অফিসার তার ভাইপোর কথা নিঃশব্দে শুনে যাচ্ছিল বিনয়। প্রচুর অর্থ ঢেলে অরণ্য নির্মূল করে যে জমি পাওয়া যাচ্ছে, উদ্বাস্তুরা না এলে তার একটা ব্যবস্থা যে করা হবে এমন জনরব কিছুদিন ধরে হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেভাবে কান দেয়নি বিনয়। কিন্তু স্বয়ং চিফ কমিশনার আজ যখন মোপলাদের কথা বিশ্বজিৎকে বলেছেন, তাতে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে বিনয়। চিফ কমিশনার হলেন। আন্দামান-নিকোবরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তিনি যদি মনে করেন, ফাঁকা জায়গায় মোপলাদের বসাবেন, কেন্দ্রীয়। সরকার তার প্রস্তাব উড়িয় দেবে না; যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শুনবে।
শেখরনাথের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা-ক্ষোভ-অসন্তোষ ফুটে উঠছিল। তিনি থামেননি। আমি তো দু-চারদিনের মধ্যে চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। তাকে জাবোয়াদের কথা তো বলবই, মোপলাদের প্রসঙ্গও তুলব। বলব, এখানকার তিনটে বড় দ্বীপ সাউথ, নর্থ আর মিডল আন্দামানে শুধু বাঙালি রিফিউজিদের রিহ্যাবিলেটেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই প্রোজেক্টে কিছুতেই অন্য কারুকে বসানো চলবে না। আন্দামানে আরও দুশোরও বেশি দ্বীপ আছে। তার কয়েকটায় সুইট ওয়াটার পাওয়া যায়, জমিও ফার্টাইল। গভর্নমেন্ট ইচ্ছা করলে মোপলাদের সেসব জায়গায় নিয়ে বসাক।
শুনতে শুনতে আঁতকে উঠলেন বিশ্বজিৎ। না না কাকা, চিফ কমিশনারকে মোপলাদের কথা একেবারেই বলবেন না। এ বাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। চিফ কমিশনার তার মনোভাব জানিয়েছেন শুধু। যদি তাকে এসব বলতে যান। ডেফিনিটলি ভাববেন আমিই আপনাকে এসব বলেছি। একজন সাব-অর্ডিনেট অফিসার হিসেবে এটা মারাত্মক বিশ্বাসভঙ্গ। এরপর হয়তো আমাকে কোনও গোপন মিটিংয়ে ডাকবেন না। উদ্বাস্তুদের জন্যে স্বাধীনভাবে যে কাজটুকু করতে পারছি তাও করতে দেবেন না; আমার ক্ষমতা ছেটে পেটোয়া অন্য কারুকে। দায়িত্ব দিয়ে দেবেন। রিফিউজিদের সম্পর্কে তার কতটা সহানুভূতি থাকবে কে জানে। এই প্রোজেক্ট তো লোহালক্কড়, মেশিন-টেশিন নিয়ে নয়। এর র মেটিরিয়াল হল উৎখাত হয়ে আসা, বিপন্ন মানুষ। জীবনে তাদের দাঁড় করিয়ে দিতে হলে ভালোবাসা, সহানুভূতি দরকার।
বিশ্বজিতের কথাগুলো যুক্তিসংগত মনে হল শেখরনাথের। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তিনি। তারপর বললেন, ঠিক আছে, মোপলাদের কথা তুলব না।
হঠাৎ বিনয় বলে উঠল, কাকা, আমার কিছু বলার আছে।
শেখরনাথ তার দিকে ঘুরে বসলেন। –বেশ তো। বল—
এখানকার সেটলমেন্টের ব্যাপারে অন্য দিকেও কিন্তু ভীষণ প্রবলেম রয়েছে।
কীরকম?
কলকাতায় সরকার বিরোধী পার্টিগুলো উদ্বাস্তুদের নিয়ে, আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমেছে। রোজই সেখানে গোলমাল হচ্ছে। পুলিশের লাঠি, গুলি-টুলিও চলছে।
হ্যাঁ, জানি। শেখরনাথ বললেন, মেনল্যান্ড থেকে কাগজগুলো আসে, তার মধ্যে তোমাদের নতুন ভারতও আছে, সেগুলোতে এসব খবর থাকে। আত্মঘাতী মুভমেন্ট। এই হঠকারী পলিটিকসের দাম কিন্তু একদিন দিতে হবে।
এরপর কেউ আর কিছু বলল না। ড্রইংরুমের আবহাওয়া কেমন এক নৈরাশ্য এবং উৎকণ্ঠায় ভরে যেতে লাগল।
৩.০৩ উপসাগরের মুখোমুখি
এখন অনেক রাত।
ভুবনরা ঘণ্টা দুয়েক আগে মোহনবাঁশির স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে খাইয়ে দিয়েছিল। তারা এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিনয়, শেখরনাথ এবং বিশ্বজিতেরও স্নান-খাওয়া হয়ে গেছে।
এই বাংলোয় উপসাগরের মুখোমুখি পরপর তিনটে বেডরুম৷ একেবারে পশ্চিম দিকের ঘরটায় সেদিন রাত কাটিয়ে গিয়েছিল বিনয়। আজও সেখানেই তার জন্য বিছানা করে দেওয়া হয়েছে। ওটা এই বাংলোর গেস্ট রুম। ঠিক হয়েছে বিনয় যখনই পোর্ট ব্লেয়ারে আসবে এখানেই থাকবে। তার পাশের ঘরটা শেখরনাথের আর পুব দিকের শেষ ঘরটা বিশ্বজিতের।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।