ঢোক গিলে বিশ্বজিৎ বললেন, গভর্নমেন্ট এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের পক্ষে এর বাইরে যাওয়া সম্ভব নয় কাকা। ওপর থেকে যে নিয়ম বেঁধে দেবে সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমাদের তা না মেনে উপায় নেই।
এর ফলে জারোয়ারা কিন্তু আরও বেশি হোস্টাইল হয়ে উঠবে। ওদের ডিসটার্ব করা উচিত নয়।
বিশ্বজিৎ চুপ করে রইলেন।
স্থির দৃষ্টিতে ভাইপোকে লক্ষ করতে করতে শেখরনাথ বললেন, তোরা যে নিরুপায় তা বুঝতে পারছি। তোদের ওপর যে হুকুম জারি করা হয়েছে সেটা তামিল করতে তোরা বাধ্য। কিন্তু আমি গভর্নমেন্টের চাকর নই। আন্দামান-নিকোবরের হর্তাকর্তা বিধাতা হলেন চিফ কমিশনার। আমি দু-একদিনের মধ্যে তার সঙ্গে দেখা করে বলব, জেফ্রি পয়েন্টের উত্তর দিকের জঙ্গল কাটা বন্ধ করা হোক।
বিশ্বজিৎ তাঁর বিপ্লবী কাকাটিকে খুব ভালোই চেনেন। ভীষণ একরোখা। প্রচণ্ড জেদি। কোনও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। যা সংগত মনে করেন সেটাই করবেন। একবার যখন গো ধরেছেন চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করবেন, তাকে কোনওভাবেই ঠেকানো যাবে না। চিফ কমিশনার ওঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে যথেষ্ট সম্মান করেন কিন্তু তাঁর কথা কতটা মানবেন, বিশ্বজিৎ সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন। বরং যথেষ্ট সন্দিহান। কেননা একবার সরকারি স্তরে অনেক বিচার-বিবেচনা আর ভাবনা-চিন্তার পর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেখান থেকে পিছিয়ে আসা মুশকিল। বিশ্বজিৎ বললেন, আপনার যখন মনে হয়েছে, দেখা করুন।
এবার শেখরনাথ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন। তোর সঙ্গে আরেকটা খুব জরুরি কথা আছে।
উৎসুক চোখে তাকালেন বিশ্বজিৎ।
জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তু সৃষ্টিধরের বউয়ের বাচ্চা হওয়ার উদ্বেগজনক ঘটনাটার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে শেখরনাথ বললেন, আমি ওখানে ছিলাম তাই সমস্যাটার মোটামুটি সুরাহা হয়েছে। ডাক্তার নেই, ওষুধ-বিষুধ নেই, নার্স নেই। জেফ্রি পয়েন্ট থেকে তিনটে পাহাড় পেরিয়ে যে রিফিউজি সেটলমেন্ট বসানো হয়েছে সেখান থেকে একজন দাইকে নিয়ে এসে ব্যাপারটা সামাল দেওয়া গেছে। এভাবে তো চলতে পারে না। এতগুলো মানুষকে তোরা জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গেছিস। তাদের অসুখ-বিসুখ আছে, অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে, বিষাক্ত কানখাজুরা যে কোনও সময় কামড়াতে পারে। এদের জন্যে ইমিডিয়েটলি ওখানে একটা হেন্থ সেন্টার খোলা দরকার। চবিশ ঘন্টার জন্যে ডাক্তার, কমপাউন্ডার থাকা চাই। নইলে রোগীদের চিকিৎসার জন্যে পঞ্চাশ-ষাট মাইল দূরে পোর্টব্লেয়ারে আনতে হলে অনেকে রাস্তাতেই পরপারে চলে যাবে।
বিশ্বজিৎ বললেন, কাছাকাছি দু-তিনটে সেটলমেন্টের জন্যে একটা করে হেলথ সেন্টার খোলার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু এখনও ফান্ডের ব্যবস্থা হয়নি।
তামাশা নাকি! এতগুলো মানুষকে ঘোর জঙ্গলে এনে ফেলে। দিলাম। তারপর মরলে মর, বাঁচলে বাঁচো। এতগুলো মানুষের লাইফ নিয়ে ছেলেখেলা! গনগনে মুখে বললেন শেখরনাথ।
একেবারে কাচুমাচু হয়ে গেলেন বিশ্বজিৎ। কাকা, আপনি ভাববেন না, খুব তাড়াতাড়িই সব হয়ে যাবে।
দেখা যাক। শেখরনাথ বলতে লাগলেন, সারা ভারতবর্ষ আজ যে স্বাধীনতার সুখ-ভোগ করছে তা এই মানুষগুলোর চরম স্যাক্রিফাইসের জন্যে। এটা সব সময় মনে রাখিস। ওয়েস্ট বেঙ্গলে, ত্রিপুরায়, আসামে বা অন্য কোথায় রিফিউজিদের জন্যে কী করা হচ্ছে, আমার পক্ষে নিজের চোখে তা দেখা সম্ভব নয়। শুনছি সর্বস্ব খুইয়ে যে লোকগুলো এপারে চলে এসেছে ওই সব জায়গায় তাদের হাল খুব শোচনীয়। সে যাক, আন্দামানে এদের জন্যে দায়সারা কিছু করে হাত ধুয়ে ফেললে আমি কিন্তু ছাড়ব না। তোমাদের চিফ কমিশনারকে জানিয়ে দিও, এই পোর্টব্লেয়ার শহরে তার অফিসের সামনে মুভমেন্ট শুরু করে দেব।
বিশ্বজিৎ চমকে উঠলেন। না না কাকা, মুভমেন্টের কথা একদম ভাববেন না। তাতে আন্দামান সেটলমেন্টের ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাবে। এই দ্বীপে রিফিউজিরা আসতেই চাইবে না। একটু থেমে বললেন, এত বড় রিহ্যাবিলিটেশনের কাজ এই দ্বীপে কেন, সারা দেশেই আগে কখনও হয়নি। শুরুতে অনেক ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। আমরা সব ঠিক করে নেব।
শেখরনাথ একটু নরম হলেন। দেখা যাক। তারপর জিগ্যেস। করলেন, চিফ কমিশনারের বাংলোয় রিফিউজিদের নিয়ে কী মিটিং হল তোদের?
আপনি তো আগেই শুনেছেন, মাস দেড়েকের ভেতর আরও আড়াইশো ভি পি ফ্যামিলিকে আন্দামানে নিয়ে আসা। হবে। তাদের বেশির ভাগকেই পাঠানো হবে মিডল আন্দামানে। একশোর মতো ফ্যামিলিকে নিয়ে যাওয়া হবে জেফ্রি পয়েন্টে। বিশ্বজিৎ জানাতে লাগলেন, এতগুলো পরিবারকে সাত একর করে দিতে হলে সাড়ে সতেরোশো একর জমি দরকার। মিডল আন্দামানে জঙ্গল কেটে সাতশো একরের মতো জমি বার করা হয়েছে। সেখানে আরও জমি দরকার। তাই জঙ্গল কাটা থেমে নেই। জেফ্রি পয়েন্টে যে জমি আছে তার ওপর অরণ্য নির্মূল করে আরও তিনশো সাড়ে তিনশো একর জমি চাই। মিটিংয়ে এইসব জমি সম্বন্ধে সবিস্তার জানতে চেয়েছেন চিফ কমিশনার। কীভাবে তা ডিস্ট্রিবিউট করা হবে তা নিয়ে আলোচনাও হয়েছে।
শেখরনাথ কোনও প্রশ্ন করলেন না।
বিশ্বজিৎ বলতে লাগলেন, তবে একটা দুশ্চিন্তার ব্যাপার আছে কাকা।
কী?
স্বাধীনতার পর আন্দামানে রিহ্যাবিলিটেশন প্রোজেক্ট শুধুমাত্র বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু যে উদ্বাস্তুরা কলকাতা থেকে আসতে চাইবে না তাদের জন্যে ঠিক করে রাখা জমি অনন্তকাল ফেলে রাখা হবে না। কিছুদিন। অপেক্ষা করে সে সব মোপলাদের দেওয়ার কথা ভাবা হবে। আসল ব্যাপারটা অন্য জায়গায়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।