এক সময় ফুঙ্গি চাউং বা বুদ্ধমন্দিরের কাছে এসে বাঁক ঘুরে জিপটা ডাইনে দৌড় শুরু করল। সামনে পাহাড়; তার ওধারের ঢালের মাঝামাঝি মিডল পয়েন্টে বিশ্বজিৎ রাহার বাংলো।
কদিন আগেই পূর্ণিমা ছিল। আকাশে ছিল পূর্ণ চাঁদের মায়া। সেই চাঁদ অনেকটা ক্ষয়ে গেলেও যেটুকু জ্যোৎস্না ঢালছে তাতে চরাচর যেন কোনও অপার্থিব রহস্যে ভরে আছে।
জিপের সবাই চুপচাপ। কেউ কোনও কথা বলছিল না। শুধু পেছনের সিট থেকে মোহনবাঁশির স্ত্রীর চাপা কান্নার ক্ষীণ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
এক সময় পাহাড় পেরিয়ে বিশ্বজিতের বাংলোর সামনে এসে জিপ থামল। বিনয়কে নিয়ে শেখরনাথ নেমে পড়লেন। তারপর মোহনবাঁশির স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নামিয়ে আনলেন। –এসো এসো আমার সঙ্গে।
কাঠের দোতলা বাড়ি। রাস্তা থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে শেখরনাথ গলার স্বর উঁচুতে তুললেন। গোপাল, কার্তিক, ভুবন–আমরা এসে গেছি।
বিনয় জানে ওই তিনজন বিশ্বজিতের কাজের লোক। ওদের আগে থেকে খবর দেওয়া ছিল। তারা দৌড়ে দোতলার সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়াল।
শেখরনাথ কার্তিককে জিগ্যেস করলেন, একটা ঘরে চারজনের মতো বিছানা-টিছানা ঠিক করে রাখতে বলেছিলাম। রেখেছিস তো?।
বাড়ি সাফ করা, ঘর গুছানো, বিছানা পাতা–এইসব কাজ কার্তিক করে। গোপাল তার সঙ্গে হাত লাগায়, তা ছাড়া নানা ফাইফরমাশও খাটে। কার্তিক বলল, হা, কাকা।
বিনয় আগেই লক্ষ করেছে যার সঙ্গেই শেখরনাথের দেখা হয়েছে, বাঙালি হলে তারা কাকা বলেছে, বাকিরা চাচা। এমনকী এই বাংলোর কাজের লোকেরাও তাই। বিশ্বজিতের কাকা, সেই সুবাদে তিনি আন্দামানের সব বাসিন্দারই কাকা।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, বিশু এসেছে?
না।
বিনয় আন্দাজ করে নিল চিফ কমিশনারের বাংলোয় মিটিং সারতে বিশ্বজিতের দেরি হচ্ছে। তাই এখনও তিনি ফিরতে পারেননি।
সবাই দোতলায় উঠে এল। এখানে বেতের সোফা-টোফা দিয়ে সাজানো মস্ত ড্রইং-রুমের তিন দিকে পাঁচখানা শোওয়ার। ঘর। এই বাংলোয় এক রাত কাটিয়ে গেছে বিনয়। এসব তার চেনা।
শেখরনাথ বললেন, কোন ঘরে ব্যবস্থা হয়েছে।
বাঁ পাশের কোণের ঘরটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল কার্তিক।
শেখরনাথ বললেন, ওটার লাগোয়া বাথরুম আছে। ওদের ওখানে নিয়ে যা। গরম জল করে দিস। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ওরা চান-টান সেরে নিক ভুবনকে বললেন, তোর রান্নাবান্না হয়ে গেছে?
ভুবন জানাল, দু-একটা পদ বাকি আছে।
তাড়াহুড়ো করতে হবে না। হাসপাতালে ওরা রুটি-তরকারি খেয়ে এসেছে। এই তো সন্ধে পার হল৷ কটা আর বাজে! ঘণ্টা দেড়-দুই পরে ওদের ভাত দিস।
কার্তিক মোহনবাঁশির স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোণের ঘরে চলে গেল। শেখরনাথ বিনয়কে সঙ্গে করে ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসলেন। ওঁরা আজকের সারাদিনের ঘটনাগুলো নিয়ে এলোমেলোভাবে কথা বলতে লাগলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে বিশ্বজিৎ ফিরে এলেন। তাঁর জিপে বিনয়রা হাসপাতাল থেকে এসেছিল। তিনি অন্য একটা গাড়িতে এসেছেন।
বিশ্বজিৎ সোজা বিনয়দের কাছে এসে বসলেন। জিগ্যেস করলেন, কাকা, মোহনবাঁশি কর্মকারের লেটেস্ট খবর কী? আমার অফিস থেকে হাসপাতালে গিয়ে কেমন দেখলেন?
শেখরনাথ যে ঘরটায় মোহনবাঁশির স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের পাঠানো হয়েছে সতর্কভাবে একবার সেদিকে তাকালেন। গলার স্বর যাতে সেখানে না পৌঁছায় সেভাবে প্রায় ফিস ফিস করে বললেন, দেখতে আর দিল কোথায়? ওকে এমার্জেন্সিতে রাখা হয়েছে। তারপর ডাক্তার চট্টরাজের সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে, সব জানিয়ে দিলেন।
দুর্ভাবনার রেখাগুলো ফুটে ওঠে বিশ্বজিতের চোখে-মুখে।
-খুব সমস্যা হল কাকা। লোকটাকে যদি বাঁচানো না যায়, জেফ্রি পয়েন্টে সেটলমেন্টে তার ভীষণ খারাপ রি-অ্যাকশন হবে। কিছুদিন আগে জারোয়ারা একবার হানা দেওয়ার পর উদ্বাস্তুরা এত ভয় পেয়ে যায় যে কিছুতেই আন্দামানে থাকতে চাইছিল না। তখন কেউ খুন-জখম হয়নি। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাদের রাখতে পারা গিয়েছিল। কিন্তু মোহনবাঁশির মৃত্যু হলে ওরা কী যে করবে ভেবে পাচ্ছি না। দেখা যাক, কার নিকোবর থেকে দুই সার্জন ফিরে আসার পর কী হয়। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
শেখরনাথের হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল। –দ্যাখ বিশু, জেফ্রি পয়েন্টের উত্তর দিকটায় জারোয়ারা থাকে। আমার ধারণা, ওধারের জঙ্গল কাটা পড়ছে বলে ওরা খেপে গেছে। ওদের তাড়িয়ে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন করাটা ঠিক হচ্ছে না।
একটু নীরবতা।
তারপর শেখরনাথই ফের শুরু করলেন, উত্তর দিকটা বাদ দিয়ে তারা বরং পুব দিকের জঙ্গলগুলো আরও বেশি করে রিক্লেম কর।
বিশ্বজিৎ চকিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু
কী হল?
গভর্নমেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে, উত্তর আর পুবের জঙ্গল সাফ করতে হবে। নইলে এত ভি পি ফ্যামিলিকে জমি দেওয়া যাবে কী করে?
শেখরনাথ বললেন, আমি কিন্তু তোর লোকেদের উত্তর দিকের জঙ্গল কাটতে বারণ করে এসেছি।
সে কী! কয়েক লহমা হতবাক তাকিয়ে থাকেন বিশ্বজিৎ। তারপর ভয়ে ভয়ে বললেন, এটা কিন্তু ঠিক করেননি কাকা।
তার মানে? বেশ রেগেই গেলেন শেখরনাথ। যারা ওখানকার আদি বাসিন্দা, জঙ্গল কেটে তাদের এলাকা ছোট করে দেওয়া হচ্ছে, এটা কি ঠিক কাজ? তোরা জানিস না অনেকটা জায়গা জুড়ে জারোয়ারা ঘুরে বেড়ায়?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।